মানুষ কেন বেঁচে থাকে? এ প্রশ্নের বহু দার্শনিক উত্তর দেয়া সম্ভব। কিন্তু বেশির ভাগ সময় সে বেঁচে থাকে কেবল বাঁচার জন্য। এর বাইরে তার তেমন কিছু থাকে না। হ্যাঁ, কখনো সে পরিবারের জন্য বাঁচে, কখনো বাঁচে স্বপ্নকে সার্থক করার জন্য। তবু এর মধ্যে কোনো সময় তাকে কেবল জীবনটা বাঁচিয়ে রাখতে হয়। মানুষ হাজার বছর ধরে বেঁচে আছে, টিকে আছে নানা প্রতিকূল পরিবেশের বিপরীতে। কথায় বলে সার্ভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট। তবে এটা পুরো মানবজাতির জন্য বলা। এর বাইরে ব্যক্তি মানুষ নানা সময় বহু প্রতিকূল পরিবেশের বিপরীতে নিজেকে টিকিয়ে রাখে—কখনো স্বপ্নের আশায়, কখনো ঘরে ফেরার টানে। এ গল্পের নাজিবও বেঁচে ছিল এমনই কোনো কারণে।

কেরলের নাজিব সৌদি গিয়েছিল চাকরির সন্ধানে। বহু মানুষই যায়। সেও গিয়েছিল নিজের পরিবারকে একটু ভালো রাখার তাগিদে। সঙ্গে ছিল তার ভাই। কিন্তু এয়ারপোর্টে নেমে চাকরিদাতা কোম্পানির কোনো প্রতিনিধি খুঁজে পায় না নাজিব। অপেক্ষা করেও যখন কেউ আসে না, তারা সাহায্য নিতে চায় স্থানীয় এক ব্যক্তির। ভাষা বোঝে না কেউ কারো। এরই মধ্যে সে লোক নিজের গাড়িতে তুলে নেয় নাজিব ও তার ভাইকে। তারা ভেবেছিল একটা গতি হবে, কিন্তু তারা ভুল ভেবেছিল। দুই ভাইকে সে আরব নিয়ে যায় মরুভূমিতে। এরপর নাজিবের ভাইকে রেখে দেয় একটি আস্তানায়। নাজিব বা তার ভাই কেউ জানে না বিষয়টি কী, কিন্তু তারা কেবল বলে ‘আমাদের আলাদা করো না’।

কিন্তু আলাদা হতে হয়। নাজিব ও তার ভাইয়ের স্থান হয় মরুর বুকে দুটি আলাদা খোঁয়াড়ে। খোঁয়াড় বলাই ভালো, কেননা সেখানে মানুষের বসবাসের কোনো সুবিধা নেই। আরব ও মরু সম্পর্কে যাদের জানাশোনা আছে তারা জানবেন সেখানে মরুভূমিরই কোনো কোনো জায়গায় ছাগল চরানোর ব্যবস্থা করা হয়। লোকালয় থেকে বহু বহু দূরে ছাগল, উট ও ভেড়া চরানোর জায়গা থাকে। সেখানেই কাজ করে কিছু মানুষ। স্বাভাবিকভাবেই এমন সব পাণ্ডববর্জিত অঞ্চলে কেউ থাকতে চায় না। তাই অনেক সময় অপহরণ করে লোক আনা হয়। মরুভূমি থেকে তাদের বের হওয়ার আর কোনো উপায়ও থাকে না। নাজিবেরও সেই দশা হয়েছিল।

‘‌আদুজীবিতম’ বা ‘‌দ্য গোট লাইফ’-এর গল্পটা গল্প নয়, সত্যি। এ সিনেমার মূল গল্প নেয়া হয়েছে মালয়ালম লেখক বেনিয়ামিনের ‘‌দ্য গোট লাইফ’ উপন্যাস থেকে। উপন্যাস মালয়ালি এক অভিবাসীকে নিয়ে। সে কীভাবে সৌদি গিয়ে রাখালে পরিণত হয়, সে ঘটনা বলেছে গোট লাইফ। তবে এ রাখাল বাইবেল বা পুরাণের রাখাল নয়, যাকে স্রষ্টা নবুয়ত দেবেন বা যে জয় করবে মথুরা। এক সাধারণ মানুষ যে নিজের জীবন উন্নত করতে চেয়েছিল, কিন্তু তাকে একসময় ছাগলের সঙ্গে ভাগ করে পানি খেতে হয়।

পানিতে চাঁদের প্রতিফলন, সেখানে মুখ রাখছে দাড়িগোঁফে ঢাকা এক মানুষ। এখান থেকেই সিনেমা শুরু হয়। এরপর নাজিবের আরবে আসার ঘটনা দেখি আমরা। সে গল্পই লেখার শুরুতে এসেছে। সিনেমার অর্ধেক পার করার পর ব্লেসি আবার দর্শককে নিয়ে আসেন প্রথম দৃশ্যে। ভেড়া ও ছাগলের মধ্যে দেখা যায় নাজিবকে। এক মুহূর্তে একটি দৃশ্য দিয়ে ব্লেসি দেখিয়ে দিয়েছেন ছাগলের জন্য রাখা পানি থেকে পানি পান করা নাজিব, একগাদা ভেড়া ও ছাগলের মধ্যে তার মুখ প্রমাণ করে সেও আর মানুষ নেই। তাকে নামানো হয়েছে ছাগলেরই কাতারে।

সিনেমাটি ব্লেসি ভেবেছেন ১৬ বছর আগে। সিনেমার কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে। নাজিবের মতো বহু কাঠখড় পুড়িয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন এটি। এরপর প্রযোজক হিসেবে যুক্ত হয়েছেন পৃথ্বীরাজও। দুজনই নিজেদের ঢেলে দিয়েছেন সিনেমায়। ক্যামেরার কাজ ও সিনেমাটোগ্রাফি এমন করেছেন তারা, বলা চলে ভারতীয় সিনেমায় আগে কেউ কখনো দেখেনি। দেনি ভিলেনোভের ‘‌ডুন’ যারা দেখেছেন, তারা বুঝবেন ওই সিনেমার মতোই ক্যামেরার কাজ ও মরু নির্মাণ করেছেন ব্লেসি। ডুনের আগে আদুজীবিতম এলে স্বর্ণাক্ষরেই হয়তো লেখা থাকত এর সিনেমাটোগ্রাফির কথা। আর এ অসাধারণ কাজটি করতে খরচ করেছেন মাত্র ৮২ কোটি রুপি।

আদুজীবিতমের মূল কুশীলব দুজন—ব্লেসি ও পৃথ্বীরাজ। ব্লেসি পরিচালনা করেছেন আর সুকুমার অভিনয়। নিজেকে বদলে ফেলেছেন তিনি পুরোপুরি। ‘‌আনারকলি’র হ্যান্ডসাম, ‘‌সালার’-এর শক্ত কিংবা ‘‌লুসিফার’-এর কুশলী পৃথ্বীরাজ নয়, তাকে দেখা গেছে এক ভঙ্গুর মানুষ হিসেবে। মরুর বুকে বসে সে স্মরণ করে পূর্বাশ্রম। তার প্রেম আসে স্বপ্নে। অথচ মরুর বুকে তার কেউ নেই।

সার্ভাইভাল ড্রামা হিসেবে আদুজীবিতম অসাধারণ। এ সিনেমা বারবার মনে করিয়ে দেয় গার্সিয়া মার্কেজের ‘‌স্টোরি অব আ শিপরেকড সেইলর’, কোলরিজের ‘‌অ্যানশিয়েন্ট মেরিনার’, ভারতে নির্মিথ ‘‌ট্র্যাপড’ ইত্যাদিকে। সিনেমাটোগ্রাফির পাশাপাশি এ সিনেমায় এআর রহমানের সংগীতও প্রভাব রেখেছে। বিজিএমের পাশাপাশি একটি দৃশ্যে বোতলের মুখে শিস দিয়ে ‘পেরিয়োনে’র সুর বাজায় খাদিরি। ব্লেসির পরিচালনা, রহমানের সুর ও পৃথ্বীরাজের অভিব্যক্তি এ সময় দর্শককে বোঝায়, আরো একটু আশাবাদ এখনো বাকি।