বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্র জগতে চিরস্মরণীয় এক নাম জহির রায়হান। মাত্র ৩৬ বছরের জীবনেই তিনি সৃষ্টি করে গেছেন কালজয়ী কথাসাহিত্য ও চলচ্চিত্র। এ অল্প সময় বেঁচে থাকা মানুষটি একাধারে সাংবাদিক, সম্পাদক, কথাসাহিত্যিক, চিত্রপরিচালক, প্রযোজক, চিত্রগ্রাহক, কাহিনীকার ও চিত্রনাট্য রচয়িতা, বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী, বীর ভাষাসংগ্রামী ও মুক্তিযোদ্ধা এ সবই একজন লোকের পরিচয়।
শৈশব ও শিক্ষা: স্বপ্নের শুরু
১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর মাজুপুরে জন্মগ্রহণ করেন জহির রায়হান। পিতার কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতার সুবাদে ছোটবেলাটা কাটে কলকাতায়। জন্মনাম আবু আবদাল মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ, ডাকনাম জাফর। ১৯৪০ সালে কলকাতা মডেল স্কুলে ভর্তি হয়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু করেন। পরে মিত্র ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা চালিয়ে যান। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় ফিরে আসেন। স্থানীয় আমিরাবাদ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
কিন্তু শৈশব থেকেই সাহিত্য ও লেখালেখির প্রতি টান, রাজনৈতিক সচেতনতা ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা তাকে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়ার দিকে নিয়ে যায়। কৈশোর থেকেই বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকতেন। সাংবাদিকতার মাধ্যমে সে সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের খবর তিনি জনগণের কাছে পৌঁছে দিতেন।
সাংবাদিকতা থেকে চলচ্চিত্রের পথে
১৯৫০ সালে ‘যুগের আলো’ পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু করেন। ১৯৫৬ সালে ‘প্রবাহ’ পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই সিনেমার প্রতি গভীর আকর্ষণ ছিল তার। ১৯৫৭ সালে উর্দু সিনেমা ‘জাগো হুয়া সাভেরা’-র সহকারী পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন।
১৯৬১ সালে ‘কখনো আসেনি’ সিনেমা দিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটান। ১৯৬৪ সালে নির্মাণ করেন দেশের প্রথম রঙিন সিনেমা ‘সংগম’। এছাড়া বাংলাদেশের প্রথম ইংরেজি ভাষার সিনেমা ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ প্রযোজনাও করেছেন। ব্যবসায়িক, অব্যবসায়িক ও প্রামাণ্যচিত্রসহ মোট ১২টি সিনেমা তার রচনা। ১৯৭০ সালের ‘জীবন থেকে নেওয়া’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের বেদনা ও বিজয়ের গল্প ফুটিয়ে তোলেন, যা তার সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচিত।
সাহিত্য: সমাজচেতনার প্রতিফলন
জহির রায়হানের সাহিত্যকর্ম কেবল বিনোদনের জন্য নয়। সমাজের বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা ও আত্মসচেতনতার বোধ জাগ্রত করে। ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসে ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার কৃষকের শোষণ ও কষ্টের চিত্র উঠে এসেছে। ‘বরফ গলা নদী’ উপন্যাসে শহরের নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সূক্ষ্ম জীবনচিত্র তুলে ধরেছেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন তাকে ‘আরেক ফাল্গুন’ ও ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ নামে দুটি উপন্যাস রচনায় অনুপ্রাণিত করে।
মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী জীবন
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জহির রায়হান কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। জীবন থেকে নেওয়া সিনেমার প্রদর্শনী থেকে প্রাপ্ত অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করেছিলেন। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি মিরপুরে সেনা ও পুলিশের সঙ্গে গিয়ে বিহারিদের গুলিতে নিহত হন বলে ধারণা করা হয়। পরের দিন মিরপুর দখলমুক্ত হলেও তার লাশ পাওয়া যায়নি, আজও তার অন্তর্ধান রহস্যময়।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
জহির রায়হানের প্রতিভা বিভিন্ন সময় স্বীকৃতি পেয়েছে। ১৯৬৪ সালে হাজার বছর ধরে উপন্যাসের জন্য আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৬৫ সালে ‘কাঁচের দেয়াল’ সিনেমার জন্য নিগার পুরস্কার, ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (মরণোত্তর), ১৯৭৭ সালে একুশে পদক (চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য, মরণোত্তর), ১৯৯২ সালে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (মরণোত্তর), ২০০৫ সালে হাজার বছর ধরে সিনেমার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ (মরণোত্তর) অসংখ্য সম্মাননা তার নামকে উজ্জ্বল করে রেখেছে।
চিরস্মরণীয় অবদান
শুধু তার সিনেমা বা সাহিত্যই নয়, স্বাধীনতার পক্ষে তার প্রচেষ্টা, সমাজ সচেতনতা ও শিল্পের প্রতি অবদান তাকে চিরকালের জন্য বাংলা সংস্কৃতির অঙ্গনে অম্লান করে রেখেছে। কেউ হয়তো মনে করে, ‘সবাই জহির রায়হানকে ভুলে গেছে।’ কিন্তু যে কারণে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, তার মতো মানুষের অবদান ভুলে যাওয়া কখনো সম্ভব নয়।










