রণবীর কাপুর রেগে যাচ্ছেন, রণবীর কাপুর মারছেন। রণবীর কাপুর আরো রেগে যাচ্ছেন, রণবীর কাপুর একে ওকে তাকে আরো মারছেন। সহজ করে বললে, এই ছিল সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গার অ্যানিমেল সিনেমার রিভিউ। এ থিমের ওপরই সিনেমাটির গল্প। তবে প্রশ্ন হলো রণবীর কেন এত মারছেন। এর কারণ হিসেবে দেখা যায় সে তার বাবাকে নিজের আইডল মনে করে। বাবার ওপর হামলা হলে সে হামলাকারীদের খুঁজে খুঁজে মারতে থাকে। কিন্তু মজার ব্যাপার, রণবীর তার বাবাকে হিরো মনে করলেও বাবার সঙ্গে তার সদ্ভাব নেই। অবশ্য সন্দীপের সিনেমা অনুসারে, সদ্ভাব না থাকার কারণে রণবীরকে তার বাবা কখনো বুঝতে পারেননি, সময়ও দেননি।
সন্দীপ রেড্ডির সিনেমাটিতে রণবীর অভিনয় করেছেন রণবিজয় চরিত্রে। তার বাবা বলবীরের চরিত্রে ছিলেন অনীল কাপুর। এ বাবা ছেলের সম্পর্ক ও দ্বন্দ্ব নিয়েই সিনেমার মূল গল্প। রণবিজয় তার বাবাকে নিয়ে অবসেসড। কিন্তু বাবা তাকে সময় দেয় না। তার কথা শোনে না। বড় ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে আমজনতার খেটে খাওয়া বাবারা এমনই হয়। কিন্তু সে জায়গা থেকে রণবিজয় নিজেকে নিয়ে যায় অন্যদিকে। তার নিজের ভেতরে থাকা পশুত্বকে সে ‘বাবার অবহেলার কারণে’ হয়ে যাওয়া অবস্থা বলে। অবশ্য সেটা রণবিজয় নিজ মুখে বলেনি, পুরো সিনেমায় এটা বলেছেন সিনেমার গল্পকার ও পরিচালক সন্দীপ রেড্ডি।
আজকের জমানায় ‘ড্যাডি ইস্যু’ কথাটি খুবই পরিচিত। তবে এর ভেতরকার আরো অনেক বিষয় আছে। আদিতে গেলে অনেকে ইদিপাসের দ্বারস্থ হতে পারেন। ঠিক ইদিপাস নয়, সাফোক্লেসের কাছে যেতে হবে। ইদিপাসের গল্পটা তো তার লেখা। সেখানে ইদিপাসের বিষয়টা অনেকটাই ছিল নিয়তি নির্ধারিত। কিন্তু রণবিজয় নিজেকে নিজের মতো করে তৈরি করেছে। এর পেছনে অনেকে ফ্রয়েড বা ইয়ুংকেও টেনে আনছেন, কিন্তু পিতা-পুত্রের দ্বন্দ্ব সম্পর্কে তাদের দেয়া কোনো তত্ত্বের সঙ্গে সরাসরি মেলানো যায় না সন্দ্বীপের অ্যানিমেলকে। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে বলিউড এখনো সিনেমায় ভায়োলেন্স দেখেনি। তিনি কবির সিংয়ের পর আরেকটি সিনেমা নির্মাণ করবেন, যেখানে কবির সিংয়ের ১০ গুণ ভায়োলেন্স থাকবে। অ্যানিমেল দেখতে গিয়ে দর্শকের মনে হবে রেড্ডি নিজের সে কথা রাখতেই সিনেমাজুড়ে কেবল ভায়োলেন্সই রেখেছেন।
রেড্ডি মূলত দক্ষিণ ভারতীয় নির্মাতা। দক্ষিণ ভারতের সিনেমার গল্প নিয়ে প্রশংসা করা হয়। বলা হয় তারা সিনেমায় একটা ভালো গল্প দেন। গত তিন চার বছরে দক্ষিণকে বলিউডের তুলনায় এগিয়ে রাখা হচ্ছে গল্পের কারণে। কিন্তু সন্দীপের এ সিনেমায় গল্পের অভাব সবচেয়ে বেশি। দেখা যাচ্ছে রণবিজয় একটা দল তৈরি করছে, পরিকল্পনা করছে বাবার ওপর হামলার প্রতিশোধ নেবে, কিন্তু কাকে রেখে কাকে ধরবে, গল্প কোন দিক থেকে কোন দিকে যাচ্ছে সন্দীপের সেদিকে কোনো খেয়াল ছিল না। রোমান্স, অ্যাকশন, কমেডি সবকিছু রাখতে গিয়ে তিনি কোনোটাকেই একক হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেননি। ভায়োলেন্সের মধ্যে কমেডির টাইমিং ভালো হচ্ছিল, কিন্তু সেটাতেও খেই হারাচ্ছিলেন। রোমান্স আর ভায়োলেন্স পাশাপাশি থাকতেই পারে, কিন্তু সেটাই যেন বারবার ছন্দপতনের মধ্য দিয়ে গেল।
ভায়োলেন্স কোনো সমস্যা নয়। সিনেমার নানা জনরা থাকে এবং সেখানে ভায়োলেন্সও একটা স্বতন্ত্র জায়গা করে নিয়েছে। সন্দীপ সেটা বানাতেই পারেন। এর আগে ভারতে এ ধারার সিনেমা না হলেও ভায়োলেন্স দেখা গেছে অনেক সিনেমায়। রাম গোপাল ভার্মার ‘রক্ত চরিত্র’ কম ভায়োলেন্ট না। প্রকাশ ঝার ‘গঙ্গাজল’ একটা দৃশ্য দিয়েই তার সময়ের সেরা ভায়োলেন্স দেখিয়েছেন। ২০১৯ সালে মুক্তি পাওয়া ভেট্রিমারানের ‘আসুরান’ও ভায়োলেন্ট। ভায়োলেন্সের নান্দনিকতা থাকে, সেদিকে যাওয়ার দরকার নেই। যে নামগুলো বলা হলো সেগুলো নান্দনিকতা বা সিনেমাটিক ল্যাঙ্গুয়েজ ও সিম্বোলিজমের বাইরে সরাসরিই ভায়োলেন্স দেখিয়েছে। রেড্ডি তার সিনেমায় এর পরিমাণ শুধু বাড়িয়েছেন।
সেই সঙ্গে বাড়িয়েছেন অ্যানিমেলের দৈর্ঘ্য। সাড়ে তিন ঘণ্টা দেখার বা দেখানোর মতো কিছুই ছিল না এখানে। রণবীর কাপুর, অনীল কাপুর, রাশমিকা মানদানা থেকে ববি দেওল সবাই ভালো অভিনয় করেছেন। কিন্তু রেড্ডির গল্পটা এমন যে তারা কেন কী করছেন, সেটাই বোঝা যায় না। আবার ২০২ মিনিটের সিনেমায় তিনি ববিকে দিলেন ১০/১২ মিনিট যেখানে দর্শক ভেবেছিল তিনি আরো সময় পাবেন। আসলে রণবিজয় আর তার ভায়োলেন্স ছাড়া সিনেমায় কিছুই নেই। অনেকে রণবিজয় চরিত্র ও ভাঙ্গার ব্যক্তিগত মিসোজিনি প্রসঙ্গ তুলছেন, কিন্তু সে বিষয় বাদ দিয়েই বলা যায় হুজুগে তুমুল ব্যবসা করলেও সিনেমা হিসেবে দাঁড়ায়নি অ্যানিমেল। ভায়োলেন্সের মধ্যে ‘সিনেমা’কে হারিয়ে ফেললেন সন্দীপ।










