বিস্তীর্ণ নীল জল বহু রহস্য ধরে থাকে। তার গভীরে আছে অজানা নানা প্রাণী, এমনকি পাহাড় পর্বত। সীমা নেই বলা চলে। সে কারণে রহস্য আরো বাড়ে। বলা হচ্ছে সমুদ্রের কথা। সমুদ্রের বেশির ভাগ রহস্যই এর গভীরতা নিয়ে। কিন্তু সমুদ্রের ওপরের বৈচিত্র্য ও রহস্যও কম নয়। তার বুকে ভেসে চলে নানা জাহাজ। কোনোটি যাত্রী পরিবহন করে, কোনোটি মালামাল। নানা আকার সেসব জাহাজের। বিচিত্র মানুষ বের হয় এসব জাহাজ নিয়ে। তাদেরই মধ্যে একটি দল জলদস্যু। সমুদ্রে ত্রাস ছড়িয়ে বেড়ায় তারা। এ সময় সমুদ্রের জলদস্যু নিয়ে তেমন কথা শোনা যায় না, কিন্তু একটা সময় এরা ছিল প্রেতের মতোই ভীতিকর। জলদস্যুদের নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা মিথ, নানা কিংবদন্তি। তা নিয়ে রচিত হয়েছে গল্প, উপন্যাস, সিনেমা ও কমিক। তেমনই একটি মাঙ্গা ‘ওয়ান পিস’। এইচিরো ওদার মাঙ্গা থেকে এবার নির্মাণ হয়েছে ওয়েব সিরিজ। আর সে সিরিজ স্বপ্ন ও প্রতিজ্ঞা পূরণের গল্প নিয়ে এসেছে।
গল্প শুরু হয় গোল্ড রজারের মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে। গোল্ড ছিল জলদস্যুদের রাজা। ‘কিং অব পাইরেটস’ তার সব সম্পদ লুকিয়ে রেখেছিল গ্র্যান্ড লাইনে (বিষুব রেখার মতো কোনো একটি জায়গা)। মৃত্যুর আগে সে কথাই জানিয়ে যায় সে। এর নাম দেয় ওয়ান পিস। মেরিন (সমুদ্র রক্ষাকারী সরকারি বাহিনী) মনে করেছিল, তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জলদস্যুদের সাহস ভেঙে যাবে আর কমে যাবে দস্যুতা। কিন্তু দেখা গেল গোল্ডের সম্পদ খুঁজে বের করতে অনেকেই বেরিয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে আছে পুরনো জলদস্যু এবং মজার ব্যাপার এর মধ্য দিয়ে নতুন দস্যুও তৈরি হয়েছে। এদেরই একজন মাঙ্কি ডি লুফি। কিশোরটি হয়ে উঠতে চায় জলদস্যুদের রাজা। কিন্তু সে প্রথাগত জলদস্যু নয়।
মাঙ্গা ও অ্যানিমেপ্রেমীদের কাছে ওয়ান পিসের গল্প পরিচিত। ওদার মাঙ্গা থেকে তৈরি হয়েছিল হাজার পর্বের অ্যানিমে। ওদা এ গল্পে এনেছেন বেশকিছু চরিত্র, যারা পুরোপুরি মানুষ নয়। এর সঙ্গে মিশেছে জাপান ও সমুদ্রের মিথ। এ কারণের পাশাপাশি গল্পের বিস্তৃতির কারণে ওয়ান পিসের লাইভ অ্যাকশন নির্মাণ অসম্ভব মনে করত অনেকে। কিন্তু সেটিই করে দেখাল নেটফ্লিক্স। মজার ব্যাপার হলো ৩১ আগস্ট থেকে স্ট্রিম হওয়া এ সিরিজের দর্শক প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক। কেবল অ্যানিমের দর্শক নন, ওদার মাঙ্গা পড়া ব্যক্তিরাও বলছে নেটফ্লিক্স যথাসম্ভব ভালো একটি মাঙ্গা-অনুপ্রাণিত সিরিজ নির্মাণ করেছে। মাঙ্গার মূল গল্প, চরিত্র ও আকর্ষণ নষ্ট করেনি তারা।
সিরিজে ডি লুফি বা স্ট্র হ্যাট পাইরেট চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইনাকি গোদয়। চরিত্রটি একদিকে মজার, অন্যদিকে কিশোর হলেও দৃঢ় প্রত্যয়ী। এ দুই বিষয়ই ইনাকি চমৎকার উপস্থাপন করেছেন। তার চোখে-মুখে বিষয়গুলো ফুটেছিল। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইনাকি খুব বেশি অভিনয় করেননি। এছাড়া ওয়ান পিসের এ চরিত্র এতটা প্রাণপ্রাচুর্যে পূর্ণ যে চরিত্রের অভিনেতাকে এনার্জেটিক হতে হবে। ইনাকি সেটাই করেছেন। এমনকি লুফির ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করা শিশুটিও তা-ই করেছে।
একই রকম ভালো কাজ করেছেন এমিলি রাড ও ম্যাকেন্যু। তারা অভিনয় করেছেন যথাক্রমে নামি ও জোরো চরিত্রে। এর মধ্যে নামি চরিত্রটি অ্যানিমেতে ‘কিউট’ হলেও এমিলির মধ্যে তার খানিক অভাব ছিল। অভিনয়ে সেটা পুষিয়েছেন। তবে বেশ ভালো অভিনয় করেছেন ম্যাকেনু। রোরোনোয়া জোরো চরিত্রের গম্ভীর দিকটি তিনি ভালো করেছেন। এছাড়া তার তলোয়ারবাজিও দেখে মনে হয়েছে এক সামুরাইকে দেখা গেল। এক্ষেত্রে ম্যাকেন্যুর পাশাপাশি বাহবা পাবেন ফাইট কোরিওগ্রাফাররা। কেননা সিরিজে থাকা প্রায় সবকটি ফাইট সিনই ছিল দুর্দান্ত।
তবে ঝুলে গেছে ভাইস অ্যাডমিরাল ডি গার্পের চরিত্রে ভিনসেন্ট রেগানের অভিনয়। সানজি ও কোবি চরিত্র দুটিও একটা পর্যায়ে বিরক্তিকর মনে হতে পারে। তবে সেসব পুষিয়ে দিয়েছে বাগি দ্য ক্লাউনের চরিত্রে জেফ ওয়ার্ড, মিনহক চরিত্রে স্টিভেন ওয়ার্ড, শেফ জেফের চরিত্রে ক্রেইগ ফেয়ারব্রাসের অভিনয়।
জলদস্যু বা সমুদ্রভিত্তিক ফিকশনগুলো নানা ধারার হয়ে থাকে। চার্লস নডহফ ও নরম্যান হলের ‘মিউটিনি অন দ্য বাউন্টি’তে বলা হয়েছিল বিদ্রোহের গল্প। হারমান মেলভিলের ‘মোবিডিক’ বলেছিল তিমি শিকারের কথা। ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’ উপন্যাসে গুপ্তধনের গল্প বলেছিলেন লুই স্টিভেনসন। ওয়ান পিসের গল্প গুপ্তধন খোঁজার হলেও এখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে স্বপ্ন পূরণ ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা। বিশেষত সিরিজে মাঙ্কি ডি লুফি যখনই বলে সে ‘পাইরেট কিং’ হতে চায়, তার চোখে-মুখে আত্মবিশ্বাসের দ্যুতি খেলে। একই রকম ঘটনা দেখা যায় নামির মধ্যে। সে জলদস্যুদের কাছ থেকে নিজের গ্রামকে বাঁচানোর জন্য দস্যুদের সঙ্গেই কাজ করে। কেননা সে নিজের লোকদের রক্ষা করতে চায়। আত্মপ্রত্যয়ের ছাপ জোরোর চোখেও। নিজের স্বপ্ন পূরণ ও লক্ষ্যে অবিচল থাকা নিয়ে এ সিরিজে বেশকিছু সংলাপ আছে। সেই সঙ্গে আছে বন্ধুদের পাশে দাঁড়ানোর শপথও। লুফি তার বন্ধুদের ভালোর কথা ভাবে। তারা কোনো কারণে একে অন্যকে ছেড়ে যায় না।
স্টিভেন মেইডা ও ম্যাট ওয়েনসের নির্দেশনায় চারজন পরিচালনা করেছেন (প্রত্যেকে দুই এপিসোড) সিরিজটি। শুটিং হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকায়। নির্মাণ চমৎকার। এ নিয়ে এরিচিরো ওদার সাহায্য নিয়েছেন নির্মাতারা। সে কারণেই লুফির রাবার ধরনের শরীর, বাগির টুকরো হওয়া বা ফিস-ম্যানদের চরিত্রগুলো বেশ ভালোভাবেই উপস্থাপন করেছেন তারা। সেই সঙ্গে ছিল দারুণ ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। তবে এ সময়ের দর্শকের কথা ভেবেই তৈরি হয়েছে সিরিজ। এসেছে স্বপ্ন ও প্রত্যয়ের পথে হাঁটার বার্তা। লুফি তার বন্ধুদের বার বার বলে নিজের মনের কথা শুনতে। তাই ওয়ান পিস হয়ে উঠেছে স্বপ্ন ও প্রতিজ্ঞা পূরণের গল্প।










