পূজা উপলক্ষে মুক্তি পেয়েছে ‘দশম অবতার’। সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন সৃজিত মুখার্জি। ২০১১ সালে মুক্তি পাওয়া সৃজিতের বিখ্যাত সিনেমা বাইশে শ্রাবণের প্রিকুয়াল দশম অবতার। সিনেমাটির মাধ্যমে একটি ইউনিভার্স তৈরির চেষ্টা করেছেন সৃজিত। কেননা এ সিনেমায় যুক্ত করেছেন ‘ভিঞ্চিদা’র চরিত্র বিজয় পোদ্দারকে। বাইশে শ্রাবণের মতো ভিঞ্চিদার সময়কালেরও আগের ঘটনা নিয়ে নির্মিত হয়েছে দশম অবতার। সিনেমাটিতে তিনি প্রবীর রায় চৌধুরীর (প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি) সঙ্গে এনেছেন বিজয় পোদ্দারকে (অনির্বাণ ভট্টাচার্য)। তারা জুটি বেঁধে তদন্ত করে একটি সিরিয়াল কিলিংয়ের। সিনেমায় বাইশে শ্রাবণের ভাবটা রেখেছেন সৃজিত কিন্তু গল্প, অভিনয় আর তার পরিচালনা নতুন কিছু দিল না। এক রকম হতাশই করলেন সৃজিত।
সিনেমা শুরু হয় একটি চেজের দৃশ্য দিয়ে। কিন্তু সেখান থেকেই দৃষ্টিকটু বিষয়ের শুরু। প্রসেনজিতের যা বয়স, তাতে এমন দৌড়ে তাকে মানাচ্ছিল না। দ্বিতীয়ত, বাইশে শ্রাবণ ও দশম অবতার নির্মাণে বাস্তব সময়ের ফারাক ১২ বছর। অন্যদিকে সিনেমার সময়কাল অনুসারে, দশম অবতার বাইশে শ্রাবণের বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। কিন্তু ফ্রেঞ্চকাট দিলেও বাইশে শ্রাবণের প্রবীরের তুলনায় দশম অবতারের প্রবীরের বয়সটা যে বেশি তা চোখে লাগে। সৃজিত একটা চমৎকার এন্ট্রি সিন দিতে চেয়েছিলেন প্রবীরকে, তবে তা হয়ে গেল দৃষ্টিকটু। তবে সে তুলনায় পোদ্দারের ইন্ট্রোডাকশন সিন ভালো।
সিনেমার গল্পের দিকে গেলে বলতে হয় এর মধ্যে ভারতীয় টেলিভিশন সিরিজ অসুরের একটা প্রভাব দেখা যাচ্ছে। ২০২০ সালে মুক্তি পেয়েছিল অসুর। সে সিরিজের শুভর মতোই এ সিনেমায় বিশ্বরূপ (যিশু সেনগুপ্ত) নিজেকে বিষ্ণুর দশম অবতার মনে করে। আর তার ধারণা হয় পৃথিবীতে সে এসেছে দুষ্টের দমন করার জন্য। সে উদ্দেশ্য থেকে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী, অসৎ ডাক্তারকে হত্যা করে সে। মৃতদেহের পাশে রেখে যায় কোনো না কোনো চিহ্ন। আর তদন্তে নেমে তা থেকেই প্রবীর বুঝতে পারে বিষ্ণুর দশম অবতারকে সামনে রেখে কাজটি করছে তাদের খুনি।
সিনেমায় প্রবীর একজন ‘ব্যাডঅ্যাস’ অফিসার। সে ওপরওয়ালার তোয়াক্কা করে না। অন্যদিকে নিজেই সহকারী হিসেবে ওপরওয়ালার কাছে প্রস্তাব করে বিজয়ের নাম। কাজ করার সময় পদে পদে বিজয়কে টিজ করা যেন প্রবীরের বিনোদন। এর কোনো দরকার ছিল না। কিন্তু কাজটা সৃজিত করেছেন বাইশে শ্রাবণের ভাব আনার জন্য। এমনকি আগের সিনেমার বেশকিছু রেফারেন্স তিনি রেখেছেন দশম অবতারে। বাইশে শ্রাবণে যেমন পাকড়াশি জিজ্ঞেস করে, ‘কোন থানা?’ এ সিনেমায় বিজয়কে প্রবীর জিজ্ঞেস করে, ‘কোন থানা?’ একইভাবে আছে ‘বোর্ন ভিটা’, ‘মুদির দোকান’ ও বিরিয়ানি ডাল-ভাতের রেফারেন্স। বাইশে শ্রাবণ যারা দেখেছেন তারা ধরতে পারবেন সহজেই। কিন্তু সেটা আইকনিক না হয়ে বিরক্তিকর হয়ে ওঠে।
গল্পটা অকারণ টেনেছেন সৃজিত। কেননা সিনেমাটিতে কোনো রহস্য ছিল না। খুন যে বিশ্বরূপ করেছে তা শুরু থেকেই দর্শককে দেখিয়ে দিয়েছেন পরিচালক। এরপর বাকি থাকে পুলিশ তাকে কেমন করে ধরছে। কিন্তু সেখানেও বুদ্ধিবৃত্তি বা পুলিশ প্রসিজার স্পষ্ট বা বিস্তারিত দেখাননি পরিচালক। বরং চলে গেছেন প্রবীর ও বিজয়ের ব্যক্তিগত জীবন, ডিপ্রেশন ও অন্যান্য বিষয়ে। এর মধ্যে দশম অবতার ও হিন্দু পুরাণ নিয়ে দর্শককে কিছু জ্ঞান দেয়ার চেষ্টা করেছেন। নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ির সঙ্গে দুই সিটিং দিয়েছিলেন সৃজিত তার প্রমাণ রাখতে হবে তো।
থ্রিলারে শুরু থেকে অপরাধী প্রকাশ করে দিলে তো হয় না। একটা টুইস্ট রাখতে হবে। সে কারণেই আসল মৈত্রেয়ী (জয়া আহসান)। পুলিশকে সাহায্য করার পাশাপাশি প্রেম করল সে বিজয়ের সঙ্গে। দুটো রোমান্টিক দৃশ্য, একটা চুমুতেও বাইশে শ্রাবণকে ফেরালেন সৃজিত। শেষে ক্লাইম্যাক্সের পর আরেকটা ক্লাইম্যাক্স। কিন্তু বাংলা সিনেমার দর্শক এতদিনে বুঝে গেছে সেখানে কী হতে পারে। তাই দ্বিতীয় ক্লাইম্যাক্সের টুইস্ট ছাপিয়ে গেল এর দীর্ঘসূত্রতা। সিনেমার শেষ ২০ মিনিট ছেঁটে ৫ মিনিট করার সুযোগ ছিল।
প্রবীরের খিস্তি আর পোদ্দারের ওপর চালাকি বাদ দিলে থাকে বিশ্বরূপের অভিনয়, কিন্তু সেখানেও যিশুর খুন বা কবিতা আবৃত্তি খুব একটা সেন্স মেক করে না। জয়া আহসানের অভিনয়ে অনেকেই প্রশংসা করছেন, কিন্তু ডায়ালগ ডেলিভারি অনেক বেশি মনোটনাস। চারজন চমৎকার অভিনেতা, একটা বিলো এভারেজ গল্প আর সৃজিতের একটা ক্যামিও মিলে শেষ পর্যন্ত কোনো কিছুই জমল না।










