দক্ষিণ ভারতের কল্যাণে অ্যাকশন সিনেমা আবার জনপ্রিয় হয়েছে ভারতে। সে ধারাবাহিকতায় লোকেশ কনগরাজ নির্মাণ করেছেন ‘বিক্রম’। টিজার আসার পর থেকেই সিনেমাটি নিয়ে দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল তুমুল আগ্রহ। পুষ্পা, কেজিএফ, আরআরআর প্রভৃতি সিনেমার মধ্যে বিক্রমের টিজার কিছুটা ভিন্ন ধারার সিনেমার আভাস দিয়েছিল। ট্রেলারে সেটা বেড়ে যায়। বিশেষত কমল হাসানের সঙ্গে বিজয় সেতুপতি ও ফাহাদ ফাসিলের উপস্থিতির কারণে দর্শকের আর কিছু প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু গল্পটা কী হয় তা নিয়ে জল্পনাকল্পনা ছিল। সিনেমা মুক্তির পর দেখা গেল এখানে একটি ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে অন্ধকার জগতের নানা ঘটনা। একজন পুলিশ অফিসার, সিস্টেমের বিরুদ্ধে যাওয়া একটি গ্যাং ও এক মাদক ব্যবসায়ীর জটিল গল্প বিক্রম।

‘কাইথি’র (২০১৯) পরিচালক লোকেশ কনগরাজের আগ্রহের জায়গা অপরাধ জগৎ। কমল হাসানের ১৯৮৬ সালের এসপিওনাজ-থ্রিলারের নামেই এবারের সিনেমার নাম রেখেছেন তিনি। গল্পটাও অনুমানযোগ্য। সেই পুরনো পুলিশ আর ড্রাগ লর্ডের দ্বৈরথ। কিন্তু এখানে নতুনত্ব আছে সিনেমার পরিচালনায়, গল্পটা বলায় অর্থাৎ ন্যারেটিভে এবং অভিনেতাদের অভিনয়ে। প্লট পরিচিতি হলেও গল্পের এগিয়ে যাওয়ার ধরনে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেছেন কনগরাজ। যেভাবে তিনি গল্পের পুরো জগিট ঘুরে দেখা ও দেখানোর চেষ্টা করেন, সেখানে নিরীক্ষা বা নতুন কিছু করার চেষ্টা স্পষ্ট।

সিনেমা শুরু হয় কারনানকে (কমল হাসান) দিয়ে। সিনেমার শুরুতেই আমরা জানতে পারি একাধিক পুলিশ অফিসার নিয়মিত বিরতিতে খুন হচ্ছে। খুন যারা করছে তারা এ খুনগুলোকে সিস্টেমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা তাদের প্রতিবাদ বলে প্রচার করে চলেছে। পুলিশের প্রধান হোসে (বিনোদ হোসে) একজন তুখোড় অফিসারকে এ দলের বিরুদ্ধে পাঠালেন। অমর চরিত্রে ফাহাদ ফাসিল সেই বন্ডসদৃশ অফিসার। তিনি কারনানের অতীত খুঁড়তে শুরু করেন। সিনেমায় এ ধারাবাহিক খুনের প্রধান সন্দেহভাজন সান্ধানাম (বিজয় সেতুপতি) একটি মাদক ব্যবসায়ী পরিবারের প্রতিনিধি। বলা যায় ডন। একদিকে প্রতিপত্তি ও প্রভাবে ধরাছোঁয়ার প্রায় বাইরে থাকা সান্ধানাম, অন্যদিকে কারনানের জীবনের নানা রঙ অমরকে গোলকধাঁধায় ফেলে দেয়।

সিনেমাটি নিয়ে দর্শক ও সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। তবে নিরপেক্ষভাবে বলতে হয় সিনেমাটি অনেক সম্ভাবনা তৈরি করলেও তা ধরে রাখতে পারেনি। সিনেমার শুরুই হয় কারনানের মৃত্যু দিয়ে। ট্রেলারে যেখানে কমল হাসানকে মূল চরিত্রের মতো করে উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেখানে তার মৃত্যু দিয়ে সিনেমা শুরু করার বিষয়টি হজম করতে দর্শকের সময় লাগে। পরবর্তী সময়ে অমর যখন কারনানের অতীত খুঁজে বের করে সে সময় কারনানের চরিত্র ও সে চরিত্রে কমল হাসানের উপস্থিতি দুটোই অনুভব করা যায়। কিন্তু গল্পটার কোথাও যেন একটা খামতি থেকে যায়। প্রথমত, দর্শকের পূর্ব ভাবনা ও সিনেমার গল্পে এমন একটা ফারাকের কারণে শুরুতেই ছন্দপতন হয়। দ্বিতীয়ত, সিনেমার প্রথমার্ধে রহস্য যেমন পরতে পরতে সাজানো, সেখান থেকে দ্বিতীয়ার্ধে ওই আবেশটা আর রাখা সম্ভব হয়নি।

সিনেমায় তিন-তিনজন হেভিওয়েট স্টারকে ঠিকঠাক উপস্থাপন করা কঠিন। অনেক পরিচালক পারেন, তবে স্টাররা যদি ঝানু অভিনেতা হন, তাহলে ব্যালান্স করা কঠিন হয়ে যায়। বিক্রম যদি কেবল অমর চরিত্রটিকে প্রধান রেখে তৈরি সিনেমা হতো, তাহলে কোনো প্রশ্ন উঠত না। বন্ডসুলভ চরিত্রটিতে ফাহাদ ফাসিল দারুণ কাজ করেছেন। কিন্তু বিজয় সেতুপতির চরিত্রে গুরুত্ব দিতে গিয়ে ফাসিলকে আড়ালে নিতে হয়েছে। অর্থাৎ, কারনানকে যখন দর্শক দেখতে চাইল তখন অমর প্রধান হয়ে উঠল। অমর প্রধান চরিত্র এ কথা দর্শক মেনে নিতে না নিতে হাজির হলো সান্ধানাম। এর বাইরে যা থাকল তা হলো কিছু অ্যাকশন সিন, যা দর্শক উপভোগ করেছে। কিছু আবেগী দৃশ্য ও সাবপ্লট তৈরির চেষ্ট দেখা গেছে কিন্তু সেগুলো পূর্ণতা পায়নি।

অ্যাকশন-প্যাকড সিনেমা হওয়ার কারণে অনেকে অ্যাকশনকে গুরুত্ব দিয়ে বা অ্যাকশন দেখার জন্য সিনেমাটি দেখেছেন। তবে সিংহভাগ দর্শকের সাধারণ মত হলো—সিনেমাটা কমল হাসানের হওয়ার কথা ছিল। বিক্রম নামটি ব্যবহার করা হয়েছে প্রচারের জন্য। কিন্তু সব মিলিয়ে দর্শককে বিনোদন দেয়ার মতো সিনেমা তৈরি করার ক্ষেত্রে লোকেশ সফল। এর বাইরে সিনেমায় বিজয় চরিত্রে নারাইনের উপস্থিতি ও সুরিয়ার ক্যামিও লোকেশ কনগরাজ ইউনিভার্সের ইঙ্গিত দিয়ে গেল।