সিনেমা নানাভাবেই মানুষকে প্রভাবিত করে। নায়ক-নায়িকার পোশাক থেকে সিনেমায় ব্যবহৃত প্রপসও দেখা যায় দর্শকের ঘরে। মনোরঞ্জনের অনুষঙ্গ হয়েও সিনেমা তাই কোনো না কোনো সময় পরিণত হয়েছে মানুষকে প্রভাবিত করার হাতিয়ার হিসেবে। হলিউড, বলিউড থেকে প্রতিটি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিই এ কাজ করেছে। সিনেমার মধ্য দিয়ে ছড়ানো হয়েছে নানা আদর্শ, তথ্য, এমনকি বিভেদের রাজনীতি। বলিউডের ক্ষেত্রে বিষয়টি অনেক বেশি স্পষ্ট। হলিউডের বিখ্যাত সিনেমা পার্ল হারবারের প্রপাগান্ডা হয়তো স্পষ্ট বুঝতে পারে না দর্শক, কিন্তু দ্য কেরালা স্টোরি, দ্য কাশ্মীর ফাইলস, মিশন মজনুর মতো সিনেমাগুলোয় ছড়ানো প্রপাগান্ডাগুলো বোঝা যায়। সেজন্য এসব নিয়ে কথা হয়। কিন্তু বলিউডে প্রপাগান্ডা সিনেমা নতুন কিছু নয়। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকেও তৈরি হয়েছে প্রপাগান্ডা সিনেমা। যুক্ত ছিলেন রাজ কাপুরের মতো নায়ক ও নির্মাতা।

পঞ্চাশের দশকে সোভিয়েত রাশিয়ায় সবচেয়ে বড় স্টার কে ছিল? এ প্রশ্ন করলে যে কেউ রাশান তারকাদের নামই খুঁজবেন। মজার ব্যাপার হলো রাশান নয়, সে স্টার ছিলেন একজন ভারতীয়। রাজ কাপুর। তার বেশির ভাগ সিনেমায় একটি সাধারণ বিষয় ছিল—কপালের ফেরে পড়া এক যুবক। চার্লি চ্যাপলিনকে সবসময় অনুকরণ করেছেন রাজ কাপুর আর এদিকে তার সিনেমায় ছিল ভাগ্য বিড়ম্বিত সৎ যুবকের কথা। আনাড়ি, শ্রী ৪২০, বুট পালিশ, আওয়ারা একই ধারার গল্প। এর মধ্যে আওয়ারা ও শ্রী ৪২০ রাশিয়ায় বেশি জনপ্রিয়তা পায়। এমন অবস্থা হয় যে তাকে পেলে রাশানরা মাথায় করে রাখেন।

আওয়ারা মুক্তি পায় ১৯৫১ সালে। পরিচালক রাজ কাপুর। চিত্রনাট্য রচয়িতা খাজা আহমদ আব্বাস। ১৯৫৫ সালে মুক্তি পাওয়া শ্রী ৪২০ সিনেমারও চিত্রনাট্য লেখক ছিলেন আহমদ আব্বাস। এ সময় ভারতে লেখক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকদের একটি অংশ সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। খাজা আব্বাসও সে পথের পথিক ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন বলরাজ সাহনী, কাইফি আজমী, সরদার জাফরী প্রমুখ। এরা যুক্ত হয়েছিলেন পিপলস থিয়েটারের সঙ্গে। রাজ কাপুর নিজে কমিউনিস্ট ছিলেন না, কিন্তু তার সিনেমা খেটে খাওয়া মানুষের কথা বলত। ফলে কাপুরের সঙ্গে জুটে যান আব্বাস। তারা একসঙ্গে বেশকিছু সিনেমায় কাজ করেছিলেন। এর মধ্যে শ্রী ৪২০ রাশিয়ায় সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়।

ভারতে একটি পরিচিত প্রবাদ হলো, ‘‌হিন্দি-চিনি ভাই ভাই।’ তবে পঞ্চাশের দশকে বিষয়টি ছিল, ‘‌হিন্দি-রুশি ভাই ভাই।’ ভারতে শিল্পী-সাহিত্যিকদের মধ্যে থাকা সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা কাজে লাগাতে চেয়েছিল সোভিয়েত রাশিয়া। তাই ভারতের, বিশেষত বলিউডের সিনেমায় তারা এমন কিছু উপাদান রাখার জন্য প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন, যেন তা রাশিয়ায় জনপ্রিয় হয়। এতে রাশিয়ার যেমন লাভ, তেমনি ভারতের। সোভিয়েত রাশিয়ার দুটো লাভ। প্রথমত, হলিউডের সিনেমার বিপরীতে ভারতের সিনেমা তৈরি করলে আমেরিকা পিছিয়ে পড়বে। দ্বিতীয়ত, ভারতে প্রসারিত হবে সমাজতন্ত্র। অন্যদিকে ভারতের লাভ তাদের আরেকটি বাজার। সে কারণেই শ্রী ৪২০ সিনেমায়, ‘‌মেরা জুতা হ্যায় জাপানি’ গানটি তুমুল জনপ্রিয় হয় রাশিয়ায়। এখানে রাজ কাপুরের চরিত্রটির জুতো জাপানি কিন্তু মাথায় লাল টুপি রাশান। এক্ষেত্রে প্রথমত ‘‌সাম্রাজ্যাবাদী’ জাপানকে পায়ের দিকে ও রাশিয়াকে মাথায় তুলে রাখা হয়েছে বলে সোভিয়েত রাশিয়ার দর্শকরা ধরে নেয়। অন্যদিকে লাল টুপি দিয়ে সমাজতন্ত্রকেই প্রকাশ করা হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়।

এ কথাগুলো অনেকটা নিজের মতো ব্যাখ্যা বলে উড়িয়ে দিতে পারেন অনেকে। কিন্তু আদতে প্রপাগান্ডা সিনেমা হিসেবেই এ সিনেমাগুলো বাজার পেয়েছে। সম্প্রতি বিক্রমাদিত্য মোতওয়ানের সিরিজ ‘‌জুবিলি’-তে তিনি দেখিয়েছেন চল্লিশের শেষের দিকে ভারতীয় রাজনীতিবিদদের মাধ্যমে রাশানরা সিনেমায় প্রপাগান্ডা ঢোকাতে উদ্বুদ্ধ করে। ব্যাপারটা অতটা হয়ে না থাকলেও সিনেমায় প্রপাগান্ডা যে ছিল, তাতে সন্দেহ নেই। খাজা আহমদ আব্বাস তার আত্মজীবনী ‘‌আই অ্যাম নট অ্যান আইল্যান্ড’-এ লিখেছেন সোভিয়েত রাশিয়ায় গিয়ে তারা তুমুল সংবর্ধনা পেয়েছিলেন। রাজ কাপুরকে তারা মাথায় করে রাখে। এমনকি রাশিয়ায় বড় বড় ব্যাঙ্কোয়েটে ‘‌আওয়ারা হু’ বাজানো হয়। অথচ গানটি কোনোভাবেই উদযাপনের নয়।

রাজ কাপুর এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের পরিচালক তরুণ মজুমদারের আত্মজীবনী ‘‌সিনেমাপাড়া দিয়ে’তে পাই, তরুণের ‘‌সংসার সীমান্তে’ (১৯৭৫) তাসখন্দ ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কৃত হওয়ার খবর দিয়ে রাজ কাপুর তাকে জানান, রাশিয়ায় তার (রাজ) তুমুল জনপ্রিয়তা আগের মতোই।

সিনেমার মাধ্যমে কোনো মতবাদ প্রচার করা দোষের কিছু নয়। তবে সেটা মানুষের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করলে সংকট সৃষ্টি হয়। রাজ কাপুরের সিনেমা একটি ভাবধারাকে প্রচার করত, এখনকার বলিউডে চলতি প্রপাগান্ডা সিনেমাগুলো গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করছে। এ কাজ সিনেমা ও শিল্পকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।