বহু রেকর্ড ভাঙা জেলার নিয়ে রজনীকান্তের একটি কথা বেশ আগ্রহ জাগায়। তিনি বলেছেন, ‘‌রি-রেকর্ডিংয়ের আগে সিনেমাটা গড়পড়তা ছিল। অনিরুদ্ধের আবহসংগীত সিনেমাটাকে বদলে দিয়েছে।’

গত আগস্টে মুক্তি পায় রজনীকান্ত অভিনীত জেলার। সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন নেলসন দিলীপকুমার। মুক্তির পর থেকে এখন পর্যন্ত এর বক্স অফিসে আয় করেছে ৬০০ কোটি রুপির বেশি। কিন্তু সিনেমায় রজনীকান্তের অভিনয় ও নেলসনের পরিচালনার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে অনিরুদ্ধের মিউজিক। কেবল জেলার নয়, ভারতের বক্স অফিস তোলপাড় করা শাহরুখ খানের জওয়ানের আবহসংগীত, এমনকি সংগীত পরিচালনাও তার। সব মিলিয়ে সিনেমার সংগীতে অনিরুদ্ধ রবিচন্দ্র এখন বড় একটি নাম। তবে তিনি রাতারাতি এ জায়গায় আসেননি, পাড়ি দিয়েছেন দীর্ঘ পথ।

অনিরুদ্ধের সংগীতের সূচনার কথা যদি বলা হয়, আজ হয়তো অন্তর্জালের যুগে কেউ আর অবাক হবেন না। তবে শুধু জওয়ান বা জেলার দেখা দর্শকের কাছে অনিরুদ্ধের একটি পরিচয় দিলে তারা নস্টালজিক হবেন। ২০১২ সালে হঠাৎ জনপ্রিয় হওয়া ‘হোয়াই দিস কোলাবেরি ডি’ গানের সংগীতও অনিরুদ্ধর করা। তামিলনাড়ুর ওই সময়ের এ গান বেজেছে ঢাকার অলিগলিতেও। এ সিনেমায় সংগীত পরিচালনার মধ্য দিয়েই সিনেমায় ক্যারিয়ার শুরু তার। আর প্রথম সিনেমায়ই বাজিমাত করেছিলেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এরপর বিজয়, রজনীকান্তের সিনেমা থেকে শুরু করে সর্বশেষ শাহরুখ খানের সঙ্গে কাজ করলেন অনিরুদ্ধ।

এ সময় এসে তার সংগীত শুনলে মনে হবে মানুষকে নাচাতে পছন্দ করেন তিনি। সোজা কথা ডান্স নাম্বার আর চলতি কথায় ‘‌মাস মিউজিক’ দেয়াতে তার কৃতিত্ব বেশি। অভিষেকে দেয়া হোয়াই দিস কোলাবেরি ডি থেকেই সেটা বোঝা যায়। গান হিসেবে এর যোগ্যতা হয়তো তত বেশি নয়, কিন্তু এ গানের সুরে বহু শ্রোতা মাথা নাড়িয়েছে। সর্বশেষ জেলার আর জওয়ানের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকেও তারা হাত পা নাড়াতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, মেলোডিতেও অনিরুদ্ধ ভালো কাজ করেছেন। বালাজি মোহনের ‘‌মারি’তে (২০১৫) যেমন তিনি ধুম ধাড়াক্কা ‘‌মারি থানা লোকাল’-এর মতো গান বানিয়েছেন, তেমনি ‘‌থ্রি’তে (২০১২) দিয়েছেন ‘‌নি পারথা ভায়িগাল’-এর মতো মেলোডি। সাম্প্রতিক জওয়ানের ‘‌চালেয়া’র কথাও বলা যায়, গানটি গুণগুণ করার মতো। 

অনিরুদ্ধর ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল ধানুষের হাত ধরে। থ্রির কথা তো শুরুতেই বলা হলো। এরপর ২০১৪ সালে ভেলরাজের ‘ভেলাইল্যা পাত্তাধারি’তে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর করেছিলেন অনিরুদ্ধ। ধানুষ তার অভিনয়ের পাশাপাশি অ্যাকশন ও সোয়্যাগের জন্যও জনপ্রিয়। ২০১৪ সালে এসে তিনি ভাবলেন ধানুষের ডায়ালগ, অ্যাকশন বা চেজ সিনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর করলে তা আরো ভালো দর্শকপ্রতিক্রিয়া আনবে। ‘‌মারি’তে এসে তা স্পষ্ট প্রমাণিত। মারি থানা লোকাল গানের বিট ধানুষের লুক আর অভিনয়ের সঙ্গে এত মিলেছিল যে তাকে আলাদা করে রজনীকান্তের মতো অতিমানবিক কাজ করতে হয়নি। সংগীত সে কাজ করে দিয়েছিল।

থালাপতি বিজয় ও অজিত কুমারের সিনেমায় সংগীত ও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর করার সময়ও তাদের ব্যক্তিত্ব ও সিনেমায় তাদের উপস্থাপন লক্ষ্য করে মিউজিক দিয়েছেন অনিরুদ্ধ। ২০১৪ সালে মুক্তি পাওয়া এআর মুরুগাদোসের সিনেমা ‘‌কাত্থি’তে বিজয়ের জন্য প্রথম মিউজিক করেন অনিরুদ্ধ। ছুরির ক্যাঁচকোচের সঙ্গে তিনি ব্যাকগ্রাউন্ডে ব্যবহার করেছিলেন কোরাস। সেটা একটি নতুন ধরন হিসেবে ধরা দিয়েছিল শ্রোতাদের কানে। প্রতিটা স্কোরে তিনি উচ্চ টেম্পো ব্যবহার করেছেন। কাছাকাছি ধরনের কাজ করেছেন রজনীকান্ত ও অজিত কুমারের সিনেমায়। 

অনিরুদ্ধ এরপর ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরে ভোকালের ব্যবহার বাড়িয়েছেন। লোকেশ কনগরাজের ‘‌মাস্টার’ (২০২১) যদি লক্ষ করি, সেখানে শোনা যাবে ‘‌দে কল মি মাস্টার... মাট্রাঙ্গাল ভারুম ফাস্টার’ যা বিজয়ের চরিত্রকে পুরোপুরি প্রকাশ করে। নেলসনের বিস্ট বা অজিতের ‘ভেদালাম’ অনিরুদ্ধের সংগীতের একই ধারার কাজের প্রমাণ দেয়।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। অনিরুদ্ধকে গত কয়েক বছরে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার সংগীতে নতুন নতুন নিরীক্ষা করেছেন। লোকেশের বিক্রমে ছিলেন কমল হাসান। তামিলনাড়ুতে কমল হাসানের পরিচিতি ‘‌আন্দাভার’ (গণদেবতা) হিসেবে। অনিরুদ্ধ তাই বিক্রমের টাইটেল ট্র্যাক শুরু করেছিলেন শঙ্খধ্বনি দিয়ে আর এর সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি। গানের মধ্যে রেখেছিলেন কমল হাসানের ‘‌নায়াকান’ সিনেমার কথাও।

সংগীতের মধ্য দিয়ে অনিরুদ্ধ প্রকাশ করতে চান অভিনেতার ব্যক্তিত্বকে। ফিল্ম কোম্পানিয়নের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘‌মিউজিশিয়ান নয়, আমি প্রথমে একজন ভক্তের চোখে অভিনেতাকে দেখি। তাতে বুঝতে সুবিধা হয় দর্শকের কী প্রয়োজন। কারণ তারাও তো ভক্ত।’