ভারতের সেরা ওয়েব সিরিজ কোনটি? এ প্রশ্নের উত্তরে পরপর আসে ‘‌সেক্রেড গেমস’ ও ‘‌পাতাল লোক’-এর নাম। সেক্রেড গেমসের সঙ্গে জুড়ে আছে অনুরাগ কাশ্যপের নাম। কিন্তু পাতাল লোকের নির্মাতা কে? প্রাইম ভিডিওতে আসা ২০২০ সালের এ সিরিজ নির্মাণ করেছেন অবিনাশ অরুণ। সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে অবিনাশ পরিচালিত সিনেমা ‘থ্রি অব আস’। অথচ অবিনাশের হয়তো চলচ্চিত্র নির্মাণে আসারই কথা নয়।

মহারাষ্ট্রের পুনে ও লোনাওয়ালার মধ্যবর্তী অংশে ছোট একটি শহর তেলগাও। সেখানে বসেই বহু বছর আগে সুভাষ ঘাইয়ের একটি সাক্ষাৎকার পড়েছিলেন তরুণ অবিনাশ। সেখান থেকে অবিনাশ জেনেছিলেন সুভাষ ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট ইন্ডিয়ার (এফটিআইআই) ছাত্র ছিলেন। আর অবিনাশের বাবা তাকে জানান, এ প্রতিষ্ঠান থেকেই ভারতের সেরা চলচ্চিত্র নির্মাতারা তৈরি হয়ে আসেন। এর কয়েক বছর পর অবিনাশ তার বাবাকে বলেছিলেন এফটিআইআইতে সুযোগ পেতে হলে একটি শর্ট ফিল্ম নির্মাণ করে জমা দিতে হবে। অবিনাশের বাবা তুলার কারখানায় কাজ করতেন। তিনি প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে ৫ হাজার রুপি তুলে অবিনাশকে দেন। শর্টফিল্মটি অবিনাশ নির্মাণ করতে পারেননি।

শুরুর দিকের সে কথা স্মরণ করে অবিনাশ বলেন, ‘বাবা আমাকে কোনো প্রশ্নই করেননি। তিনি বরং খুশি হয়েছিলেন যে তার ছেলে চেষ্টা করেছে। আর আমার শুরুটাও আসলে সেখান থেকেই।’

অবিনাশের বংশে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় দ্বিতীয় শিক্ষিত ব্যক্তি। অবিনাশের আগে তার বাবা কেবল স্নাতক হয়েছিলেন। প্রায় নিস্তরঙ্গ এক অঞ্চল থেকে মুম্বাইয়ের জটিলতার মধ্যে এসেছিলেন অবিনাশ অরুণ। সোলাপুরের সন্তান অবিনাশ বলেন, ‘আমার পরিবার, প্রতিবেশী এখনো বোঝে না আমার পেশাটা আসলে কী?’

অবিনাশের যাত্রাটা হতে পারত এফটিআইআই থেকে। কিন্তু তা হয়নি। কেননা ওই সুযোগটা ছিল না। কিন্তু সে প্রতিষ্ঠানের ট্রেইনিদের সঙ্গেই কাজ করেছিলেন অবিনাশ। ১৬ বছর বয়সে তিনি মারাঠি সিনেমা নির্মাতাদের টিমে কাজ শুরু করেন। এর মধ্যে ছিলেন স্বনামখ্যাত মারাঠি চলচ্চিত্র নির্মাতা উমেশ কুলকার্নি। তার সহকারী হিসেবে কাজ করার পর অবিনাশ আরো প্রায় ২৫টি সিনেমায় সহকারীর কাজ করেন। এর পরই ২০০৬ সালে তিনি এফটিআইআইতে ভর্তি হন।

সে সময়ের স্মৃতিচারণ করে অবিনাশ বলেন, ‘আমি সেদিনের কথা এখনো মনে করতে পারি। তালিকায় নিজের নাম দেখে আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। আমার বহু দিনের স্বপ্ন সেদিন সফল হয়েছিল।’

আজকের দিনে এসে অবিনাশের ফিল্মোগ্রাফির দিকে তাকালে দেখা যায় ঝুলিতে সিনেমা তিনটি ও সিরিজ দুটি। সিনেমার মধ্যে ‘‌কিলা’, ‘‌আনপজড’ ও সর্বশেষ ‘‌থ্রি অব আস’। তিনটি সিনেমাই সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছে। এর আগে তিনি ছিলেন ‘‌মাসান’, ‘‌কারওয়া’, ‘‌মাদারি’, ‘‌হিচকি’ ও ‘‌দৃশ্যম’-এ। প্রতিটি সিনেমায় তিনি সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেছেন। কিন্তু এর মধ্যেই একটি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছিলেন অবিনাশ। ডিপ্রেশনে পড়ে যান তিনি।

নিজের মানসিক অবস্থা নিয়ে অবিনাশ বলেন, ‘মাত্র তিন বছরে আমার জীবনে নানা রকম ঘটনা ঘটে যাচ্ছিল। আমার একটা সিনেমা কানে পুরস্কৃত হলো, আরেকটি বার্লিনে। এদিকে আরো একটা সিনেমা প্রায় ১০০ কোটি রুপি আয় করে ফেলছিল। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম না কী চলছিল।’ এর মধ্য দিয়েই অবিনাশ কিছুটা দোনোমনায় পড়েন। তিনি নিজের দ্বিতীয় সিনেমা নির্মাণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। তিনি কী নির্মাণ করবেন? শৈল্পিক সিনেমা নাকি বাণিজ্যিক।

দ্বিধার প্রসঙ্গে অবিনাশ বলেন, ‘নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমি বাণিজ্যিক সিনেমা বানাতে চাইনি। একজন সিনেমাটোগ্রাফারের চোখ থেকে সিনেমাকে দেখতে শুরু করেছিলাম। আমি আসলে নির্মাতা নই, একটা সিনেমাটোগ্রাফারই। সে কারণেই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। প্রথম সিনেমাটি শৈল্পিক হওয়ার কারণে বুঝতে পারছিলাম না, আমার এরপর কী করা উচিত।’

অবিনাশের এ দশার প্রমাণ পাওয়া যায় তার ফিল্মোগ্রাফি থেকেই। কিলা মুক্তি পায় ২০১৪ সালে। এর ছয় বছর পর আসে পাতাল লোক। কিলা নির্মাণের পর তিনি সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেন প্রায় ১০টি সিনেমায়। এ নিয়ে অবিনাশ বলেন, ‘কাজই আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। কাজের মধ্য দিয়ে একটা সময় বুঝতে পারি নিজের জন্যই সেটা আমি করি। কখনো বন্ধুদের কথামতোও করে থাকি। তবে নিজের জন্য করা কাজটাই মনকে শান্তি দেয়।’

পাতাল লোক নিজের মতোই নির্মাণ করেছেন অবিনাশ। তবে সেখানে প্রাইমের কথামতো কিছুটা চলতে হলেও থ্রি অব আস পুরোপুরি অবিনাশের নিজের সিনেমা।

দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে