সাধারণ পরিচিত (কমন) ধারণা অনুসারে, দেবতা ও ঈশ্বর সমার্থক। কিন্তু পুরাণের বিকল্প ব্যাখ্যা যারা করেন, তাদের কাছে দেবতা অনেকটাই মানুষ ও ঐশ্বরিক ক্ষমতার একটি যৌগ এনটিটি। গ্রিক পুরাণ হোক বা ভারতীয় দেবতাদের এমন অনেক কাজ করতে দেখা যায়, যা মানুষের মতো। অর্থাৎ তার মনুষ্য চরিত্র আছে। সাধারণভাবে দেবতাকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মনে হলেও পুরাণের গভীর অধ্যয়ন আমাদের দেখায়, নানা সময় দেবতাকেও সংগ্রাম (স্ট্রাগল) করতে হয় দেবত্ব পাওয়ার জন্য। সিংহাসনের লড়াইও সেখানে আছে। সে ধারায় নবতর সংযোজন মার্ভেলের সিরিজ ‘লোকি’। নর্স পুরাণের দেবতা লোকিকে নতুন করে দেখেছে মার্ভেল। এর আগে মার্ভেলের সিনেমায় তিনি ছিলেন একটি পার্শ্বচরিত্র হিসেবে। এবার কেবল লোকির গল্পটাই দেখা গেল।
নর্স পুরাণ অনুসারে, লোকি মূলত অনিষ্টকারী দেবতা। মার্ভেলেও তার প্রথম উপস্থাপন ছিল ‘গড অব মিসচিফ’ হিসেবে। থরের গল্পে লোকি এসেছিলেন আর সেখানে দর্শক দেখেছিল বখে যাওয়া এক রাজপুত্রকে। ওডিনের পুত্র হিসেবে পরিচিত হলেও একসময় জানা যায় তিনি আসলে লাউফির পুত্র, ওডিনের নয়। সে হিসেবে অ্যাসগার্ডের সিংহাসন লোকির পাওয়া সম্ভব নয়। সেটার অধিকারী থর। অন্যদিকে থর রীতিমতো বাবার ‘ভালো ছেলেটি’ এবং লোকি শুরু থেকেই বিদ্রোহী। দিন দিন তার বিদ্রোহ বাড়তে থাকে এবং একসময় সে দুনিয়ার ওপর দখল নেয়ার চেষ্টা করে। অ্যাভেঞ্জার্সের সঙ্গে মিলে লোকির হাত থেকে দুনিয়াকে বাঁচায় থর। কিন্তু এর পরও থরের পেছনে লেগে থাকে লোকি। কিন্তু এর পরের গল্পটা কী?
মার্ভেলের কমিক অনুসারে, লোকিকে নিয়ে স্বতন্ত্র সিরিজ নির্মিত হয় ২০২১ সালে। জুনে স্ট্রিম হয় প্রথম এপিসোড। অ্যাভেঞ্জার্সের কাছ থেকে ট্রেসারেক্ট চুরির পর লোকির একটি নতুন গল্পের সন্ধান আমাদের দেয় মার্ভেল। সেখানে বলা হচ্ছে লোকি সময়কে যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় তা করলে মাল্টিভার্সে নানা রকম বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। আর মাল্টিভার্স তত্ত্ব অনুসারে, লোকি কেবল একজন নয়। তার বহু ভ্যারিয়েন্ট আছে, যাদের কাছ থেকে সময়কে বাঁচায় টাইম ভ্যারিয়েন্স অথরিটি। তাদের বলা চলে সময়ের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কিন্তু সেখানে বিচারের মুখোমুখি লোকি যখন মোবিয়াসের সঙ্গে আলাপে বসে তখন গল্প বইতে থাকে অন্য খাতে।
পিতৃ বা মাতৃসূত্রে দেবরক্ত বহন করলেই দেবতা হওয়া যায় না। পৃথিবীর যেকোনো রাজপরিবারের ইতিহাস বা রাজাদের জন্য লিখিত বই (অর্থশাস্ত্র, দ্য প্রিন্স থেকে সিয়াসতনামা) বলে রাজার পুত্র হলেই রাজা হওয়া যায় না। প্রথমত, তাকে সিংহাসনের যোগ্য হতে হবে। এরপর রাজোচিত কাজ করতে হবে। মোবিয়াস লোকিকে দেখায় সে দেবতার উপযোগী কোনো কাজই করেনি। সে কেবল মানুষকে বা অন্যকে কষ্ট দিতে পছন্দ করে। প্রথমে লোকি তার মিসচিফ দিয়েই জেল থেকে ছাড়া পেতে চায়, কিন্তু একটা পর্যায়ে আমরা দেখি লোকি বুঝতে পারে এ সিস্টেমের সবকিছুই সুসজ্জিত এবং তার কিছু নিয়ম আছে। লোকি জন্মসূত্রে দেবতা হলেও ওই নিয়মের বাইরে সে যেতে পারবে না।
মাইকেল ওয়াল্ডরনের সিরিজে লোকির চরিত্রে বরাবরের মতো অভিনয় করেছেন টম হিডেলস্টোন। মোবিয়াস চরিত্রে ওয়েন উইলসন। লোকির ভ্যারিয়েন্ট সিলভি চরিত্রে ছিলেন সোফিয়া ডি মার্টিনো। ক্যাংয়ের ভ্যারিয়েন্ট হিসেবে ছিলেন জোনাথন মেজর্স। লোকির চরিত্র সাজাতে এদের সবার সেরা অভিনয় দরকার ছিল আর তাদের কাছ থেকে সেটা আদায় করে নিয়েছেন ওয়াল্ডরন। সিরিজ আমাদের দেখায় দেবরক্ত শরীরে থাকলেই সে দেবতা হতে পারে না। মার্ভেলে থরের গল্পে এর আগে একই বিষয় দর্শক দেখেছে। ভারতীয় পুরাণের মতো নর্স পুরাণের এ মার্ভেল সংস্করণেও আমরা দেখি, একজন দেবতাকে শিখতে হয় নতুন করে। তাকে ছাড় দিতে হয় অনেক কিছু। লোকির নতুন গল্পে সে শিক্ষার মধ্য দিয়েই গেছেন এ নর্স দেবতা।
টম হিডেলস্টোন অসাধারণ অভিনেতা, এতে কারো সন্দেহ ছিল না। কিন্তু মার্ভেলে তিনি খুব বেশি সময় পাননি। লোকি সিরিজে নতুন করে সুযোগটা পেয়েছেন। নিজের অন্যতম সেরা অভিনয় করেছেন তিনি। তার মধ্য দিয়েই উপস্থাপন করেছেন প্রেম (সিলভির সঙ্গে), বন্ধুত্ব (মোবিয়াস ও ওবির সঙ্গে) ও দেবত্ব। মামলায় জর্জরিত জোনাথন মেজর্সও এ সিরিজে কোনো কোনো সময় ছাড়িয়ে যাচ্ছিলেন টমকে। কিন্তু শেষ দৃশ্যে সব হারানো টমের হাসি অন্য সবকিছুকে ম্লান করে দেয়। সেই সঙ্গে তার বলা ‘তোমার জন্য, আমাদের সবার জন্য’ কথাটি দর্শককে মনে করিয়ে দেবে, একদিন ওডিনকে একই কথা বলেছিল লোকি। কিন্তু তখন সে লোভী ছিল। তারপর স্বার্থ ত্যাগ করে গল্পকে নতুন করে লিখে বখে যাওয়া যুবরাজ একদিন দেবতা হলেন।










