পৃথিবীর প্রতিটা মহাকাব্যই রাজনৈতিক। প্রতিটা মহাকাব্যেই ছোট ছোট নানা বিষয় থাকে কিন্তু এর মূলে থাকে ক্ষমতার চাহিদা। ক্ষমতা লাভের জন্য থাকে দ্বৈরথ আর দ্বৈরথের কথা বললেই মাথায় আসে দুটো পক্ষের কথা। হতে পারে সে দুই পক্ষ কখনো দুটো জাতি, কখনো দুটো সম্প্রদায় বা কখনো স্রেফ দুই ব্যক্তি। পাকিস্তানের সিনেমা ‘দ্য লেজেন্ড অব মাওলা জাট’ মূলত দুই জাতি বা পরিবারের দ্বৈরথের গল্প থেকে ব্যক্তির দ্বৈরথে এসে ঠেকে। আর সে গল্পে আছে এক মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা।
সিনেমার মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনার সূচনা হয় মূলত এর গল্প কথনের মাধ্যমে। কামরান লাশারির কণ্ঠে জাট ও নাত্ (ত-এর উচ্চারণ ত ও থ-এর মাঝামাঝি) পরিবারের শত্রুতার গল্প শুনেই মনে হয় বহু যুগের পুরনো কোনো ইতিহাস বয়ান করা হচ্ছে। সিনেমার মূল গল্পটি সরল। পাঞ্জাবে জাট ও নাত্ পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব। জাট পরিবার তুলনামূলক সরল ও সম্মানিত। নাত্ পরিবার ক্ষমতালোভী ও দুর্ধর্ষ। জাটদের নেতা সর্দার জাট ও তার স্ত্রীকে নাত্দের দ্বারা হত্যা দিয়ে এ সিনেমার শুরু। সেখানে নাটকীয়ভাবেই বেঁচে যায় সর্দার জাটের ছেলে মাওলা জাট। গ্রামেরই এক নারী তাকে লালন-পালন করে এবং ক্রমে সে হয়ে ওঠে মল্লযোদ্ধা।
সিনেমায় মাওলা জাটের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ফাওয়াদ খান। এখন পর্যন্ত তাকে ‘লাভার বয়’ চরিত্রেই বেশি দেখা গেছে। কিন্তু এ সিনেমায় পুরোদস্তুর একজন মাতাল যোদ্ধার চরিত্রে অভিনয় করলেন, যে নিজের পরিচয় জানে না ঠিকমতো। যাকে তাড়া করে ফেরে কিছু দুঃস্বপ্ন। সিনেমায় দুঃস্বপ্নের এই ক্ল্যাসিক বিষয় রেখেছেন বিলাল লাশারি। ক্ল্যাসিকের আরেকটি উদাহরণ মাওলার বন্ধু মুদা। এমন একজন সর্বক্ষণের বন্ধু আমরা ক্ল্যাসিক সব গল্পেই পাই। সিনেমায় এ চরিত্রে অভিনয় করেছেন গায়ক-অভিনেতা ফারিস শাফি।
বিলাল লাশারি ২০১৩ সালেই মাওলা জাট নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। নানা কারণে সিনেমাটির নির্মাণ দীর্ঘায়িত হয়। পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল এ সিনেমার ভিজুয়াল দেখলে বোঝা যায় ললিউডের (লাহোরের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি) যেকোনো সিনেমার তুলনায় কতটা এগিয়ে আছে মাওলা জাট। খুবই পরিমিত জায়গার মধ্যে সিনেমার শুটিং করেছেন বিলাল। বিষয়টি সিনেমার মূল গল্পের জায়গা থেকে একটি প্রশ্ন তৈরি করে দর্শকের মনে। গল্প কথনে আমরা ‘ দেশ পাঞ্জাব’ কথাটি পাই কিন্তু সিনেমার প্রেমিজ ছোট হওয়ার কারণে একটি গ্রাম, একটি সরাইখানা ছাড়া কিছু পাই না। তাই মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনার সেই বিস্তৃতি পাওয়া একটু বাধাগ্রস্ত হয়।
দ্য লেজেন্ড অব মাওলা জাট সিনেমার মূল শক্তি এর গল্প বয়ান ও নির্মাণে। গল্পের গতি ধীর. তবে তা দর্শকের মধ্যে বিরক্তি তৈরি করে না। এক্ষেত্রে গল্প যেভাবে এগোয়, তা গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অভিনয়। ফাওয়াদ খানের সঙ্গে ফারিসের বন্ধুত্বের রসায়নের পাশাপাশি আসে মুখো জাটনির সঙ্গে তার প্রেমের রসায়ন। সেটি শুরু হতে যদিও সময় নেয় কিন্তু ততক্ষণ মাহিরা খান দর্শককে ধরে রাখেন তার গ্ল্যামার দিয়ে। সিনেমার বেশ অনেকটা সময় নিজের দিকে দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখেন গহর রশীদ। মাখা নাতের চরিত্রটি এ সিনেমার প্রায় একমাত্র খল চরিত্র। ‘একমাত্র’ বলার কারণ, মাওলার প্রতিপক্ষ নূরী ঠিক খল নন, তিনি প্রতিনায়ক।
নায়ক হিসেবে মাওলা জাটই সবার মন জয় করবেন কিন্তু এ সিনেমার মূল আকর্ষণ নূরী নাত্ চরিত্রে হামযা আলী আব্বাসীর অভিনয়। গল্পে বলাই হয় নূরী নাত্ নিজের নামেই পরিচিত এবং তার ত্রাসের তুলনা হয় না। ভয়াল তার চাহনি। হাতে পায়ে বেড়ি। কেননা সে একবার ছাড়া পেলে লড়াই ব্যতীত থাকতে পারে না। সে কয়েদেই থাকে, যেন পাঞ্জাবের দুর্ধর্ষ অপরাধীদের সঙ্গে লড়তে পারে। কিন্তু কারো সঙ্গে লড়েই সে তুষ্ট হয় না। লড়াই তার পেশা নয়, নেশা।
সিনেমার আরেকটি শক্তিশালী জায়গা এর সংলাপ। ভাষা উর্দু নয়, পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবিভাষী ব্যতীত সংলাপ পুরোটা বোঝা কঠিন। তবু যতটুকু বোঝা যায়, তা-ই শিহরণ জাগায়। সংলাপ ভালো হওয়ার পাশাপাশি বলার ক্ষেত্রে অভিনেতা-অভিনেত্রীরা তাদের মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। যেমন নূরীকে না চিনে যখন মুদা তার নাম জানতে চায়, নূরী বলে, ‘ তে ম্যায় দাসসা তো তেরা নাস ফাট জায়েগা, সোনেয়া’ (যদি আমি বলে দিই তাহলে তোর শিরাগুলো ফেটে যাবে, প্রিয়); এ দৃশ্যায়ন দর্শককে আটকে রাখে। সিনেমায় অন্তত দুটো মুখোমুখি সংলাপ আছে। নূরী ও মাওলার কথোপকথন এবং মাওলার সঙ্গে দারো নাত্নির। হুমায়মা মালিকের দারো চরিত্রটি এ সিনেমার অন্যতম ধূসর চরিত্র। দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন তিনি। মাওলার সঙ্গে তার কথোপকথনের দৃশ্যটি আলাদা করে বারবার দেখার মতো।
সিনেমার কিছু অংশের সঙ্গে গেম অব থ্রোনসকে মেলাবেন অনেকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এ ধারার গল্পের উপস্থাপনায় কিছু কিছু মিল থাকবেই। কিন্তু বিলাল লাশারি যেভাবে গল্পটা বলেছেন আর দেখিয়েছেন, বলিউড পর্যন্ত বলছে, অনেক দিন এমন সিনেমা তারাও নির্মাণ করতে পারেনি। এপিক ক্ল্যাসিকের প্রতিটি উপাদান আছে এ সিনেমায়। নূরী নিজে ক্ষমতা চায় না। তবে পরিবারের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে চায়। কাপুরুষোচিত আচরণের জন্য বাবাকে হত্যা করে বোনকে সর্দার করে সে, কিন্তু পাগড়ি নিজে পরে না। কেননা নিজের মধ্যকার ধূসর দিকটি সে জানে। খল হলেও মাখাকে মহাকাব্যিক মৃত্যু দিয়েছেন বিলাল। আবার মুদাকে মারার সময় নূরী যেভাবে বলে, ‘আজ যদি আমার হাতে ক্ষমার রেখা থাকত!’ এখানে নূরীকে প্রতিনায়ক হিসেবেই তৈরি করেন বিলাল। ওদিকে নিজের পরিচয় জেনে মাওলা প্রতিশোধ নিতে চেয়ে বলে, ‘সর্দার জাটের প্রতিশোধ কবর থেকে উঠে এসেছে’; আর সে কথা জেনে মাওলাকে খোঁজে নূরী। দ্বৈরথটা ব্যক্তি পর্যায়ে চলে আসে আর ক্ল্যাসিক অনুসরণে সে ভেনডেটায় জয়ী হয় মাওলা জাট।










