সিনেমা সাধারণভাবে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবেই পরিচিত। বর্তমানে অবশ্য সিনেমার মূল উদ্দেশ্য থাকে ব্যবসা করা। কিন্তু নানা সময়ে সিনেমা হয়ে উঠেছিল রাজনীতি, সমাজ সচেতনতা ও প্রতিবাদের হাতিয়ার এবং তা খুব সক্রিয়ভাবেই। এসব ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট দল, মত, মতাদর্শী ব্যক্তিদের উদ্যোগে বা কখনো সাংগঠনিক অনুপ্রেরণায় সিনেমা তৈরি হতো। আজাকের দিনে সিনেমায় রাজনৈতিক কথাবার্তা বেশির ভাগই পপুলিস্ট ঘরানার। এর বাইরে মতাদর্শগত বক্তব্য তেমন পাওয়া যায় না। কিন্তু কোনো কোনো নির্মাতা তাদের সিনেমায় একটা বক্তব্য রাখেন, যা জনপ্রিয় ধারার বাইরে যায়। দক্ষিণ ভারতে এমন সিনেমা বেশ দেখা যায়। সেখানেই নতুন সংযোজন কার্তিক সুব্বারাজের ‘জিগারঠাণ্ডা ডাবল এক্স’।

কার্তিক সুব্বারাজ তামিল সিনেমা নির্মাতা। ২০১৪ সালে এসেছিল তার তৃতীয় ফিচার ফিল্ম ‘জিগারঠাণ্ডা’। মূল চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সিদ্ধার্থ (কার্তিক) ও ববি সিংহ (সেতু)। জিগারঠাণ্ডার গল্পে কার্তিক একজন তরুণ নির্মাতা। সে সিনেমা পরিচালনা করতে চায়। সে সূত্রেই কুখ্যাত সন্ত্রাসী সেতুর জীবনীভিত্তিক সিনেমা নির্মাণ করতে যায়। সেতুর সঙ্গে সিনেমা বানাতে বানাতে কার্তিক বুঝতে পারে একে দিয়ে আর যা-ই হোক সিনেমা সম্ভব নয়। সেতু যে গল্প বলে তার চেয়ে ভিন্ন একটা সিনেমা সে নির্মাণ করে ফেলে। কুখ্যাত সন্ত্রাসীকে উপস্থাপন করে কমেডিয়ান হিসেবে। কিন্তু সেতু দেখতে পায়, মানুষ ভালোবাসছে তাকে। সেতু বদলে যায় সে সময় থেকে।

জিগারঠাণ্ডার নয় বছর পর এল জিগারঠাণ্ডা ডাবল এক্স। একই থিমের সিনেমা, কিন্তু গল্পটা এবার আরো বিস্তৃত। জিগারঠাণ্ডায় কার্তিক সিনেমার প্রতি বিশ্বস্ত ছিল। সে সিনেমা নির্মাণ করতে চেয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত নির্মাণ করেছিল নিজের মতো করে। কিন্তু জিগারঠাণ্ডা ডাবল এক্সে কিরুবাকরনের (অভিনয়ে এসজে সুরিয়া) কোনো পরিকল্পনা ছিল না সিনেমা নিয়ে। সে সিনেমার মানুষই নয়। কেবল জেলখাটা থেকে বের হতে সে সিনেমা বানাতে শুরু করে সিজারকে নিয়ে (অভিনয়ে রাঘব লরেন্স)। সে সিনেমা নির্মাণ ও তার আগে পরের অনেক ঘটনা এমনভাবে এগিয়েছে যেখানে আছে মানুষের কথা, রাজনীতির কথা আর কার্তিক বলতে চেয়েছেন কেমন করে মানুষ রাজনীতির শিকার হয়।

নয় বছর আগে আসা জিগারঠাণ্ডায় দর্শককে কার্তিক দেখিয়েছিলেন এক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীর বদলে যাওয়া। সেখানে স্থানীয় রাজনীতি তেমন ছিল না। সিনেমার নাম জিগারঠাণ্ডা যার অর্থ ‘কোল্ড হার্টেড’। আর সিনেমায় দর্শক দেখেছিলেন এক পাথর হৃদয় সন্ত্রাসীর হৃদয় উষ্ণ হয়ে ওঠার গল্প। কার্তিক তার সিনেমার মধ্য দিয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন সেতুর চরিত্র আর তার খুনখারাপির বিরুদ্ধে। সে সিনেমাকে রেখেছিল সেতুর তরফ থেকে আসা নানা হুমকির ওপরে।

জিগারঠাণ্ডা ডবল এক্স আমাদের দেখায় সিজার বা তার মতো সন্ত্রাসীদের পেছনে থাকা বড় বড় রাজনৈতিক মাথাদের। সেখানে থাকে কেন্দ্রীয় রাজনীতির হাত। সুব্বারাজ এ সিনেমায় নিয়ে এসেছেন হাতির দাঁত নিয়ে ব্যবসার প্রসঙ্গ। প্রতি বছর এ কারণে মারা পড়ে প্রচুর হাতি। কিন্তু সে চোরাচালান যে কেবল চোরাচালানীরা করে এমন নয়। তাদের অস্ত্র ও নিরাপত্তা আসে ক্ষমতাধর মানুষের কাছ থেকেই। সিনেমায় সে নোংরা রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন সুব্বারাজ। তিনি ‘পুষ্পা’র (যে নিজেই একজন অপরাধী) মতো সিজারকে নায়ক হিসেবে দেখাননি বরং বড় শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর পাশাপাশি মানুষের জন্য কাজ করার মাধ্যমে তাকে নায়ক হিসেবে তৈরি করেছেন।

সুব্বারাজ এ সিনেমায় প্রতিবাদের পাশাপাশি কিংবদন্তি অভিনেতা ও নির্মাতা ক্লিন্ট ইস্টউডকে ট্রিবিউট করেছেন। এ সিনেমায় কিরুবাকারন সিজারকে বলে, তার প্রিয় ক্লিন্ট ইস্টউড একটা সিনেমায় গ্রামের মানুষের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদ করে নায়ক হয়েছিল। সত্যিকারের নায়ক অকারণ সন্ত্রাস করে না। সিনেমার শেষে সিজার মানুষের পাশে থেকে সিস্টেমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সিস্টেমের হাতেই মারা যায়। আদিবাসীদের ওপর হওয়া সে পুলিশি হামলার দৃশ্য মূলত বিশ্বজুড়ে হওয়া বহু অত্যাচারের প্রতিবাদ। আর তা কার্তিক রাখলেন সিনেমার রিলে।