প্রযুক্তির উন্নতির কারণে বিশ্বব্যাপী আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে মানুষের জীবনে সুবিধা এলেও কিছু মানুষের কারণে এআইয়ের অপব্যবহারও বেড়েই চলেছে; যার কারণে অনেকে অনলাইনে বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

বিশেষ করে এআইয়ের সাহায্যে তৈরি ভুয়া ছবি ও ভিডিও অনেকের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই দেখা যায়, মনগড়া তথ্যের ভিত্তিতে তারকাদের ছবি বা ভিডিও তৈরি হয়, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা। অনেকে এগুলোকে সত্যি মনে করে ফেলছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি দেশের বেশ কয়েকজন তারকার ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন রাফিয়াত রশিদ মিথিলা, তাসনিয়া ফারিণ, সাদিয়া আয়মান, নাজনীন নাহার নিহা, রুনা খান, শবনম ফারিয়া, আশনা হাবিব ভাবনা প্রমুখ। এ নিয়ে তারা বেশ বিব্রতকর অবস্থায় রয়েছেন। এসব ভুয়া ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানোর প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।

কিছু দিন আগে অভিনেত্রী সাদিয়া আয়মানের কিছু ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি বিষয়টি নিয়ে সরব হন। সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্টের মাধ্যমে তিনি এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ছবি ও ভিডিও সম্পর্কে ভক্তদের সচেতন থাকার আহ্বান জানান। পাশাপাশি এসব কর্মকাণ্ডে জড়িতদের জন্য কঠোর বার্তা দেন। একইভাবে দেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী তাসনিয়া ফারিণ, নাজনীন নাহার নিহা ও শবনম ফারিয়া ডিপফেকের শিকার হয়েছেন। অভিনেত্রী রুনা খানের কিছু ছবিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন শিল্পীরা।

বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী রুনা খান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রযুক্তির যেমন সুবিধা রয়েছে, তেমনি মারাত্মক অসুবিধাও আছে। শুধু আমাদের দেশে নয়, সারা বিশ্বেই এমন বিকৃত রুচির মানুষ রয়েছে। তবে আমাদের দেশে হয়তো সংখ্যাটা একটু বেশি। এরা প্রযুক্তির অসুন্দর দিক ব্যবহার করে বিকৃত কাজ করছে। দিন দিন এ সমস্যা বাড়ছে, ভবিষ্যতেও বাড়বে। এর মাধ্যমে তারা বিকৃতভাবে অর্থ উপার্জন করছে—যত বেশি ভিউ, তত বেশি আয়।’

রুনা খান আরো বলেন, ‘প্রতিটি শিল্পীর নিজস্ব ফেসবুক পেজ থাকে; সেই পেজ থেকে প্রকাশিত ছবি বা ভিডিওর দায় শিল্পীর। কিন্তু এআই কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে শিল্পীর ছবি বা ভিডিও বিকৃতভাবে ছড়ালে, শিল্পীর পক্ষ থেকে কিছু করার থাকে না। কিছু বিকৃত রুচির মানুষ এটাকে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার বানিয়েছে।’

এ ধরনের অপকর্ম বন্ধে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে এত রুচিহীনতা ও অশিক্ষা রয়েছে যে এটা খুব সহজে থামবে বলে মনে হয় না। এ দায় প্রথমত তাদের, যারা এ কাজ করছে; আর এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আজ শিল্পীদের ক্ষেত্রে হচ্ছে, কাল রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী কিংবা সমাজের অন্য স্তরের মানুষদের ক্ষেত্রেও হবে। তাই মানুষের ব্যক্তিজীবন ও বাস্তব জীবনের ন্যূনতম নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।’

এ ব্যাপারে সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জনপ্রিয় অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী তার অফিশিয়াল ফ্যান পেজে বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) দুপুরে একটি পোস্ট দিয়েছেন।

মেহজাবীন লিখেছেন, ‘প্রযুক্তি আজ আমাদের জীবনের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা অনেকেই এর ভালো দিক নিয়ে আশাবাদী, কিন্তু এর অন্ধকার দিক অস্বীকার করার উপায় নেই। এআই এখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রযুক্তি। কিন্তু এটা যখন ভুল মানুষের হাতে পড়ে, তখন তা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই এআই ব্যবহার করে সেলিব্রিটিদের বা নারীদের ছবি ও ভিডিও বিকৃত করছে।’

তিনি বলেন, ‘এগুলো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ছে, আর যারা বুঝতে পারে না এগুলো ভুয়া, তারা বিশ্বাস করে, মন্তব্য করে, অপমান করে। প্রতিনিয়ত এ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন অনেকেই। এটা এখন নিত্যদিনের ঘটনা। এমন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, যারা সারা দিন ধরে শুধুই এসব করে বেড়ায়। তারা ভুল তথ্য ছড়ায়, বিভ্রান্তি তৈরি করে, মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে। এটা শুধু অনৈতিকই নয়, একেবারে অপরাধ।’

মেহজাবীন আরো বলেন, ‘এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ডিজিটাল সহিংসতা বলা যায়। এআই থামানো সম্ভব না হলেও এর অপব্যবহার রোধ করা দরকার। আমাদের দরকার কঠোর আইন, শক্তিশালী প্রতিরোধ এবং জনসচেতনতা। যারা এসব করে, তাদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। আমি আশা করি, আমাদের দেশে দ্রুত এমন নিয়ম-কানুন ও শাস্তির ব্যবস্থা হবে, যা সবাই—বিশেষ করে নারীদের জন্য—নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ তৈরি করবে।’