পাতিয়ালার নবাবপুত্র সাইফ আলী খানের সিনেমায় আসা নির্ধারিত ছিল। অবশ্য ক্রিকেটারও হতে পারতেন মনসুর আলী খানের এ পুত্র। কিন্তু মা শর্মিলা ঠাকুরের ক্যারিয়ারের দিকেই হাঁটলেন তিনি। ১৯৭৫ সালে গুলযার পরিচালিত মওসমের মাধ্যমে তার অভিষেক হয়। সিনেমায় সঞ্জীব কুমারের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন শর্মিলা ঠাকুর। এ সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন সাইফ। এরপর ১৯৯৩ সালে তিনি অভিনয় করেন যশ চোপড়া পরিচালিত ‘পরম্পরা’য়। এখানেই তার সত্যিকারের অভিষেক হয়।
নব্বইয়ের দশকে সাইফের ক্যারিয়ার এগিয়ে যাচ্ছিল। তবে সেসব ছিল বলিউডি ঘরানার অ্যাকশন সিনেমা। এর মধ্যে অক্ষয় কুমারের সঙ্গে জুটি বেঁধে তিনি অভিনয় করেছিলেন ‘ইয়ে দিল্লাগি’ (১৯৯৪), ‘ম্যায় খিলাড়ি তু আনাড়ি’ (১৯৯৪), ‘তু চোর ম্যায় সিপাহি’ (১৯৯৬) ও ‘আরজু’তে (১৯৯৯)। এসব সিনেমায় সাইফের ছিল এক ধাঁচের অভিনয়। অনেকটা কিশোর থেকে বড় হয়ে ওঠার মুখে যে মনোভাব থাকে, সাইফকে সেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। ‘ম্যায় খিলাড়ি তু আনাড়ি’র আনাড়িই যেন ছিলেন সাইফ। এক ধাঁচের চরিত্র থেকে বের হতে পারছিলেন না তিনি। তাকে বের করা হচ্ছিলও না। এর মধ্যে অবশ্য অন্য ধারার সিনেমাও করেছিলেন, তবে তা নিয়ে আলোচনা হয়নি।
২০০০ সাল-পরবর্তী সাইফ আলী খানকে দেখা যেতে শুরু করে চকোলেট বয় চরিত্রে। এক্ষেত্রে ‘কাল হো না হো’র নাম করেন অনেকে। ২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া এ সিনেমার রোহিত চরিত্রটি অনেকটাই সাইফের পরিচিতি হয়ে দাঁড়ায়। একজন ভালো বন্ধু, বাবা-মায়ের আদরের ছেলে, দেখতে সুন্দর; এমন একটা পরিচয় তৈরি করেছিল। এর আগে ‘দিল চাহতা হ্যাঁয়’ করেছিলেন তিনি কিন্তু আমির খানের আড়ালে পড়ে গিয়েছিলেন। মাধবনের সঙ্গে করেছিলেন ‘রেহনা হ্যায় তেরে দিল মে’। এখানে অনেকটাই রাফ ছিলেন কিন্তু সেটাই শেষ পর্যন্ত রোহিতের মতোই একটি চরিত্রের দিকে মোড় নেয়।
সাইফকে ভিন্নভাবে পরিচয় করিয়েছিলেন। বিশাল ভরদ্বাজ। পরিণীতার শেখর বা সালাম নমস্তের নিক অরোরাকে দেখে অভ্যস্ত দর্শক সাইফকে নতুন করে জানল ‘ওমকারা’র মাধ্যমে। শেকসপিয়ারের ‘ওথেলো’ অবলম্বনে সিনেমার গল্প সাজিয়েছিলেন বিশাল। সাইফ অভিনয় করেছিলেন ল্যাংড়া ত্যাগী চরিত্রে। শেকসপিয়ারের ইয়াগোর বিশাল সংস্করণ ছিল এ চরিত্র। খোঁচা খোঁচা চুলের ল্যাংড়া ত্যাগীর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো খল চরিত্রে তাকে দেখেছিল দর্শক। এ সিনেমায় ল্যাংড়ার চরিত্রে তার অভিনয়, লুক প্রশংসা পায়। কিন্তু সেখানেও একটা সমস্যা দেখা দিয়েছিল। এ চরিত্রে জন্য ফিল্মফেয়ারে সেরা খলনায়কের পুরস্কার পেয়েছিলেন সাইফ। কিন্তু সেবার জুরি হিসেবে ছিলেন শর্মিলা ঠাকুর। এ নিয়ে উঠেছিল নেপোটিজমের অভিযোগ।
কিন্তু সাইফ যে তার চকোলেট বয় ইমেজের বাইরে এসে আসলে খল বা ধূসর চরিত্রেই ভালো করতে পারেন তা প্রমাণ হয়েছে গত দশকের শেষে। সাইফকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল ২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়া স্যাক্রেড গেমস। সরতাজ সিং কোনোভাবেই খল না, তবে চরিত্রটি ধূসর। এর পরই তাকে খল চরিত্রে আবার ফেরানো হয়। ২০২০ সালে ওম রাউত পরিচালিত ‘তানাজি’তে তাকে দেখা গিয়েছিল উদয়ভান রাঠোর চরিত্রে। ওম রাউতই তাকে পরিণত করেন ‘আদিপুরুষ’ সিনেমার রাবণে। সিজিআই নির্ভর এ সিনেমা নিয়ে দর্শকের বহু আপত্তি আছে, কিন্তু উদয়ভান বা রাবণ হিসেবে সাইফের অভিনয় নিয়ে কারো সন্দেহ নেই।
সাইফ নিজেও নিজেকে ভেঙে তৈরি করেছেন। গত দশকে তিনি নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। কপ থেকে শুরু করে বাবুর্চি, কিছুই বাদ দেননি। বিশাল ভরদ্বাজের রেঙ্গুনে ছিলেন প্রতিনায়ক। তবে ২০১৯ সালে মুক্তি পাওয়া নবদ্বীপ সিংয়ের ‘লাল কাপ্তান’ সিনেমায় সাইফের গোসাঁই চরিত্রটি সবচেয়ে ভিন্ন ধারার। কিন্তু সাইফেরই হয়তো দুর্ভাগ্য, এ উদয়ভান বা রাবণের আড়ালে পড়ে গেছে তার নাগা সন্ন্যাসীর চরিত্রটি।










