শাহরুখ খানের পাঠান দিয়ে শুরু হলো বলিউডের বছর। তুমুল ব্যবসা করা সিনেমাটির মাধ্যমে নতুন স্বপ্ন দেখছে বলিউড। বিগত কয়েক বছরের ব্যবসায়িক ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে নতুন উদ্যমে শুরু করছে তারা। শাহরুখ খান নব্বইয়ের দশক এবং এ শতকের শুরুর দশকেও দর্শকদের উপহার দিয়েছেন দারুণ সব সিনেমা। আর ইন্ডাস্ট্রি পেয়েছিল মুনাফা। কিন্তু তার সেসব সিনেমা ছিল রোমান্টিক ঘরানার। কেবল শাহরুখ নন, নব্বইয়ের দশকে সালমান খান, আমির খান, অজয় দেবগন, অক্ষয় কুমারও রোমান্টিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন। প্রত্যেকেরই সিনেমার বৈচিত্র্য ছিল কিন্তু রোমান্টিক ঘরানা ছিল প্রধান। প্রেমের পাশাপাশি হয়তো ছিল পরিবার। কিন্তু এখন বলিউডের সেই ক্ল্যাসিক রোমান্টিক সিনেমা আর নেই। সে ঝুঁকছে অ্যাকশনের দিকে।

বলিউডের রোমান্টিক ঘরানা শুরু হলো কবে থেকে? এ প্রশ্ন করলে ফিরতে হবে অনেক বছর আগে। বলিউডের সিনেমার নিজস্ব ধারা ছিল। তার কিছুটা হয়তো হলিউড থেকে ধার করা, কিন্তু সেটা নেয়া হয়েছিল ভালোভাবেই। রাজ কাপুর, রাজ কুমার, মনোজ কুমার, শাম্মী কাপুরদের সঙ্গে ছিলেন দিলীপ কুমার। এরপর রোমান্টিক সিনেমা আরো জনপ্রিয় হয়েছিল রাজেশ খান্নার গুণে। অমিতাভ, ধর্মেন্দ্র কোনো না কোনোভাবে সেকালের অ্যাকশন সিনেমায় ঢুকে পড়েছিলেন। কিন্তু যশ চোপড়ার গুণে সেই অমিতাভ আর শশী কাপুরকে নায়ক হিসেবে নিয়ে নির্মিত হয়েছিল চমৎকার সব রোমান্টিক সিনেমা। রাজেশ খান্নার সঙ্গে শর্মিলা ঠাকুর, অমিতাভের সঙ্গে রেখা, জয়ার জুটি দর্শক ভুলবে না। সিলসিলা, কাভি কাভি এখনো তাদের প্রিয় সিনেমা।

যশ চোপড়ার হাত ধরেই পরিণত হয়েছিল বলিউডের রোমান্টিক সিনেমা। অমিতাভ-রেখার পর ঋষি কাপুর-শ্রীদেবীকে নিয়ে তৈরি করেছিলেন চাঁদনী। অনিল কাপুর-শ্রীদেবীকে জুটি করে নির্মাণ করেছিলেন লামহে। এরপর যশ চোপড়া ও যশরাজ ফিল্মসের সঙ্গে যুক্ত হলেন শাহরুখ খান। বলিউডে তৈরি হলো এক নতুন অধ্যায়। একের পর এক হিট সিনেমা তৈরি হয়েছে। ক্যারিয়ারের শেষ চারটি সিনেমা তিনি শাহরুখ খানের সঙ্গে নির্মাণ করেছেন। ১৯৯৩ সালে ডর দিয়ে শুরু। এরপর দিল তো পাগল হ্যায় (১৯৯৭), বীর-যারা (২০০৪) ও সর্বশেষ জাব তাক হ্যায় জান (২০১২)। তারই প্রডাকশন হাউজ থেকে তৈরি হয়েছিল ‘‌দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে’ (১৯৯৫), মোহাব্বাতে (২০০০) ও রব নে বানা দি জোড়ি (২০০৮)।

যশ চোপড়ার সিনেমার নিজস্ব ধারা ছিল। তার রোমান্সে ছিল রুচি ও শীলিত ভাব। সিনেমার গল্পের পাশাপাশি উপস্থাপনেও যশের ছিল দারুণ হাতযশ। তার কস্টিউম, লোকেশন ও সিনেমায় পাত্র-পাত্রীদের অভিনয় দর্শকের মধ্যে আলাদা আবেদন তৈরি করত। নায়ক-নায়িকার কেমিস্ট্রি বলে যে বিষয় আজ বহুল চর্চিত, তা যশ চোপড়ার সিনেমায় ছিল। বলতে গেলে বলিউডকে কেমিস্ট্রি প্রথম শিখিয়েছিলেন যশ। তার পরে এ কাজে হাত পাকিয়েছিলেন করণ জোহর। কুছ কুছ হোতা হ্যায়, কাভি খুশি কাভি গাম, কাভি আলবিদা না কেহনা বলিউডের নব্বইয়ের দশকের রোমান্টিক সিনেমার ধারা বহন করে। তবে করণ খুব দ্রুত সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছেন। তার সিনেমাও তাই বদলে গিয়েছিল।

যশ আর করণের সিনেমা মানেই একটা সময় ছিল শাহরুখ খানের সিনেমা। কিন্তু নব্বইয়ের বলিউডে ছিলেন সালমান খানও। তার ম্যায়নে পেয়ার কিয়া আজও কিংবদন্তি। মিষ্টি প্রেম, খানিকটা প্লেটোনিক ধারার প্রেম ছিল সুরজ বারজাতিয়ার বৈশিষ্ট্য। এ সিনেমার পর হাম আপকে হ্যায় কওন (১৯৯৪) ও হাম সাথ সাথ হ্যায় (১৯৯৯) সিনেমায়ও একই বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে। সিনেমাগুলোয় প্রেমের পাশাপাশি ছিল পরিবারের গল্পও। বারজাতিয়া এক্ষেত্রে পরিবারের ভেতরের ভালোবাসার কথা বলতে পছন্দ করেন। বিবাহ (২০০৬) তার অন্যতম উদাহরণ। যশ চোপড়ার রোমান্সে বড় পরিবার অনুপস্থিত, তবে করণ জোহর তার সিনেমায় প্রধান চরিত্রদের পরিবারের কথা কিছু কিছু বলেছেন। অর্থাৎ রোমান্টিক সিনেমা মানে কেবলই প্রেম ছিল না। ছিল আরো বড় গল্প।

অজয় দেবগন ও কাজলের একাধিক সিনেমা রয়েছে। পেয়ার তো হোনা হি থা এর মধ্যে অন্যতম। আমির খানের সারফারোশের প্রেমও চোখে পড়ে। ইশক, দিল, রাজা হিন্দুস্তানির মতো সিনেমা এসেছিল তার কাছ থেকে। বাজি গোলাম, হাম হ্যায় রাহি পেয়ার কে সবগুলোই চমৎকার রোমান্টিক সিনেমা। শেষোক্ত সিনেমাটি ভালো ব্যবসা করেনি অবশ্য। অভিনয় করেছিলেন আমির খান ও জুহি চাওলা।

জুহির সঙ্গে শাহরুখ খানের বেশকিছু সিনেমা আছে। ইয়েস বস, ওয়ান টু কা ফোর প্রভৃতি সিনেমা রোমান্টিক। রাজু বান গ্যায়া জেন্টলম্যান থেকে জুহির সঙ্গে তার জুটি। বলিউড হয়তো আজিজ মীর্জাকে ভুলে গেছে, কিন্তু এ পরিচালক একসময় অসাধারণ কিছু সিনেমা উপহার দিয়েছিলেন। শাহরুখ-রানী জুটিরও রোমান্টিক সিনেমা আছে বেশকিছু। ২০০৩ সালে এ জুটির চলতে চলতে পরিচালনা করেছিলেন আজিজ মীর্জা। তার সর্বশেষ সিনেমা কিসমত কানেকশনে শহীদ কাপুরের সঙ্গে বিদ্যা বালানকে দেখেছিল দর্শক। সুভাষ ঘাইয়ের কথা না বললে লেখা অসম্পূর্ণ থাকবে। তার সিনেমাগুলোও রোমান্টিক সিনেমার উদাহরণ।

বলিউডের রোমান্স হারাল কেন? এ প্রশ্ন করলে বলতে হয় সময়ের সঙ্গে দর্শকের রুচি বদলেছে আর সে অনুসারে পরিচালকরা বদলে ফেলেছেন নিজেদের। করণ জোহর এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। যশ বা আদিত্য চোপড়া নিজেরা সিনেমা নির্মাণ করেননি, কিন্তু তাদের প্রযোজনা সংস্থা থেকেও সিনেমা এসেছে সময়ের দাবি অনুসারে। যখন অ্যাকশন চলেছে তখন অ্যাকশন এনেছেন, যখন কমেডি চলেছে তখন কমেডি। ধুম ফ্র্যাঞ্চাইজি যশরাজ ফিল্মসেরই কাজ। এখন আবার পাঠানও তারাই এনেছেন। কেননা একটা সময় তারা দেখেছেন, সাইফ-প্রীতি জুটির তা রা রাম পাম বা সাইফ-রানী জুটির হাম-তুম ভালো ব্যবসা করেনি। জাব তাক হ্যায় জানও ততটা ব্যবসা করেনি।

২০০৫ পরবর্তী বলিউডে চলেছিল কমেডি। এরপর মিশ্র ধারার সিনেমা এবং এখন শুরু হয়েছে অ্যাকশন। কিন্তু এসবের মধ্যেও এসেছিল রব নে বানা দি জোড়ি। করণের প্রযোজনায় প্রতি বছরই এসেছে রোমান্টিক সিনেমা। বলিউড রোমান্সের শেষ কান্ডারি হয়তো ইমতিয়াজ আলী। জাব উই মেট, রকস্টার, তামাশা হয়ে জাব হ্যারি মেট সেজাল মূলত রোমান্টিক ঘরানারই সিনেমা। হয়তো বলিউডের রোমান্টিক সিনেমার ধারা বদল হচ্ছে, কিন্তু রোমান্টিক সিনেমা থাকছে।