আরব সাগরের কোলঘেঁষা বোম্বে বহু মানুষের নাম বদলে দিয়েছে। বিশেষত সিনেমাপাড়া দিয়ে হেঁটেছে যারা। ক্যামেরার পেছনে থাকলে তেমন কোনো সমস্যা নেই কিন্তু ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হলে নাম খুবই স্পর্শকাতর হয়ে পড়ে। ইউসুফ খানের গল্পটা তেমনই। একই গল্প বেগম মুমতাজ জাহানের (মধুবালা) কিংবা মেহজাবিন বানুর (মীনা কুমারী) প্রথম জীবনের। আরব সাগর তীরের লোনা বাতাস বহু মানুষের নাম বদলে দিয়েছে স্রেফ লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন বলে। কিসসা খোয়ানি বাজারের ছেলে ইউসুফ খানের নাম হলো তাই দিলীপ কুমার।
অশোক কুমারদের জগতে যখন কাপুর বংশ বোম্বের সিনেমার প্রায় হর্তাকর্তা, সেই সময় পেশোয়ারের ছেলে ইউসুফ বোম্বের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এলে থৈ পেতে খানিক সময় লাগল। কিন্তু পঞ্চাশের দশক থেকে ইউসুফকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। দেব আনন্দের জন্য যখন ভারতের নারীরা পাগল, রাজ কাপুর যখন নার্গিসের সঙ্গে জুটি বাঁধছেন; তাদের পাশাপাশি এগিয়ে চলছিলেন দিলীপ কুমার। রাজের ‘আওয়ারা’, ‘শ্রী ৪২০’, ‘আনাড়ি’; দেবের ‘সিআইডি’, ‘কালা পানি’, ‘সোলভা সাল’ সেই পঞ্চাশের দশকেরই সিনেমা যখন দিলীপ ‘তারানা’, ‘ইয়াহুদী’, ‘মধুমতী’তে অভিনয় করেছিলেন। অবশ্য এর মধ্যে বিমল রায়ের ‘দেবদাস’ (১৯৫৫) তাকে এমন উচ্চতায় পৌঁছে দিল, যা হয়তো আজকের দিনেও অনেকের ভাগ্যে জোটে না।
দিলীপ কুমারের সবচেয়ে হিট কিংবা জনপ্রিয় সিনেমার নাম কী? এমন প্রশ্ন করলে উত্তর দেয়া কঠিন। তবে নিশ্চিত ‘দেবদাস’ আর ‘মোগল-এ-আজম’ এখানে মুখোমুখি প্রতিযোগিতা করবে। ‘মোগল-এ-আজম’ দর্শকের পছন্দ, অনেক চর্চিত। সিনেমাটি সমালোচকদের কাছেও প্রশংসিত। সেখানে ‘দেবদাস’ কাল্ট ক্ল্যাসিক। শরতের দেবদাসের সেই পাগলামি, অনুতাপ, নিজেকে শেষ করে দেয়ার প্রতিটা পর্যায় যেভাবে বিমল রায় দিলীপের মাঝে দিয়েছেন আর দিলীপ ক্যামেরার সামনে ফুটিয়েছেন, তা অসামান্য। শাহজাদা সেলিমকে অবশ্য ভিন্নমাত্রার প্রেমিক হিসেবে দিলীপই প্রমাণ করেছেন। কিন্তু ‘তারানা’র মোতিলাল, ‘মধুমতী’র আনন্দ-দেবেন, ‘ইয়াহুদী’র মার্কাস কিংবা ‘নায়া দওর’এর শঙ্করকেও ভালো লাগতে বাধ্য। কিন্তু মজার ব্যাপার দেবদাসে অভিনয় করা নিয়ে দিলীপ নিজেই দ্বিধায় ছিলেন।
দেবদাসের আত্মনিগ্রহ ও মদ্যপানের বিষয়টি তরুণদের ওপর কী প্রভাব ফেলবে তা দিয়ে চিন্তিত ছিলেন দিলীপ কুমার। উদয়তারা নায়ারের সহযোগিতায় লিখিত তার ‘দিলীপ কুমার দ্য সাবস্ট্যান্স অ্যান্ড দ্য শ্যাডো’ বইয়ে তিনি বলেছেন, ‘মনে গভীর বেদনা নিয়ে থাকা মানুষটা যেভাবে মদ্যপানের মাধ্যমে নিজের কষ্ট ভুলতে চায় সে বিষয়টি তরুণরা হয়তো এটাকেই সত্য বলে গ্রহণ করবে।’ দিলীপ কুমার ভারতীয় সিনেমা সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলেন। প্রমথেশ বড়ুয়ার নির্দেশনায় সিনেমাটি আগেও নির্মিত হয়েছিল এবং সে সিনেমার প্রশংসাও করেছেন দিলীপ কুমার।
জীবনের জোয়ার-ভাটায় দিলীপ কুমার কখনো পিছিয়েও পড়েছেন। সত্তরে অমিতাভ, রাজেশ খান্নাদের দাপটে ব্যাকফুটে চলে যেতে হয়েছে। শেষের দিকে কিছু সিনেমা নিয়ে হয়তো আজকের দিনে একটু হাসাহাসিই করা যায় কিন্তু অভিনেতার কাজ তো অভিনয় করা। বোম্বের আলো যে দেখেছে তার পক্ষে ওই আলোতে ‘অ্যাকশন’ শব্দটা শোনার নেশা বড় বেশি। কিন্তু দেব আনন্দ যখন শেষ বয়সেও সিনেমা করতে যাচ্ছিলেন, দিলীপ নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। কখন থামতে হয় তিনি জানতেন। কিন্তু তার আগে রেখে গেছেন অসামান্য কিছু চরিত্র, অভিনয় ও অভিব্যক্তি।
ভারতীয় সিনেমার বহু দর্শকের কাছে দিলীপ কুমার মানে আনারকলির সঙ্গে শাহজাদা সেলিমের প্রেম, যেখানে তানসেনের বকলমে বড়ে গোলাম আলী খাঁর ঠুমরি বাজে। দিলীপ কুমার মানে তালাত মাহমুদের প্লেব্যাকে ‘এক ম্যায় হু এক মেরি বেকাসি কা শাম হ্যাঁয়’। দিলীপ কুমার মানে বৈজয়ন্তিমালাকে ‘উড়ে যাব যাব জুলফে তেরি’ বলে রোম্যান্স। দিলীপ কুমারের হাসিতে যে মধু বর্ষাত তা সম্ভবত ভারতীয় সিনেমায় আর আসেনি। সাজানো সেটের ইনডোর শুটিংয়ে তার হাসিতে সিনেমা পেয়েছিল প্রাণ।










