বছর কুড়ি নয়, বছর চৌদ্দ আগের কথা। এফএম রেডিওর সময় তখন। একটা দুটো করে কয়েকটা স্টেশন হয়ে গেছে। এর প্রতিটাতেই দিনে একবার হলেও বাজত, ‘তুমি আকাশের বুকে বিশালতার উপমা/তুমি আমার চোখেতে সরলতার প্রতিমা।’ গায়কের নাম খালিদ। আগে পিছে কিছু নেই। অন্তত স্টেশনগুলো কখনো বলত না। শ্রোতারাও পরিচিত ছিল এ নামের সঙ্গে। তবে এ গান বাজলে স্টেশন বদলাত না প্রায় কেউই। কেননা এক অদ্ভূত প্রশান্তি ছিল গায়কের গলায়। ছিল আরেকটি গান। ‘যদি হিমালয় হয়ে দুঃখ আসে, সে কিছু নয়।’ প্রিন্স মাহমুদের কথা ও সুরে এ গানেও কণ্ঠ দিয়েছিলেন খালিদ।
কেতাবি ভাষায় যাকে বলে নিভৃতচারী, খালিদ ছিলেন তা-ই। বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে তার যাত্রা আশির দশকে। তার জন্ম ১৯৬৫ সালের ১ আগস্ট, গোপালগঞ্জে। গান নিয়েই ছিলেন এ শিল্পী। কিন্তু খুব একটা মাতামাতি করেননি নিজেকে নিয়ে। ১৯৮৩ সালে যুক্ত হয়েছিলেন ব্যান্ড চাইমের সঙ্গে। প্রথম অ্যালবামের নামও চাইম। এতে ছিল গ্রাম বাংলার পরিচিত গান ‘নাতি খাতি বেলা গেল’। এ গানকে নতুন করে আয়োজন করেছিলেন খালিদ ও তার ব্যান্ড।
খুব দ্রুতই জনপ্রিয় হয়েছিলেন খালিদ। সেই সঙ্গে জনপ্রিয় হয়েছিল চাইম। এর বাইরেও খালিদ গেয়েছেন অনেক গান, যা আজও মানুষের প্লে লিস্টে থাকে। কিন্তু খালিদকে নিয়ে কখনো অনেক বেশি কথা হয়নি। তিনি শ্রোতাদের প্রিয় ছিলেন, কিন্তু উদযাপিত শিল্পী ছিলেন না। তার গানের সঙ্গে শ্রোতারা একাত্ম হয়েছেন বহুবার।
চাইমের প্রথম অ্যালবামে আরো ছিল ‘তুমি জানো নারে প্রিয়’, ‘কীর্তনখোলা নদীতে আমার’, ‘এক ঘরেতে বসত কইরা’, ‘ওই চোখ’, ‘সাতখানি মন বেজেছি আমরা’, ‘আমার জন্য রেখো একটা গান’। এ গানগুলো এখনকার শ্রোতাদের হয়তো পরিচিত না। কিন্তু খালিদের একক গান ঠিকই পরিচিত। তার জনপ্রিয় গানগুলো—‘সরলতার প্রতিমা’, ‘যতটা মেঘ হলে বৃষ্টি নামে’, ‘কোনো কারণেই ফেরানো গেল না তাকে’, ‘হয়নি যাবারও বেলা’, ‘যদি হিমালয় হয়ে দুঃখ আসে’, ‘তুমি নেই তাই’।
খালিদের সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। আর শিল্পী খালিদও গুরুত্বপূর্ণ। কেননা তার উত্থানের সময়টা ছিল একটা পরিবর্তন পর্ব। বাংলা গানের ধ্রুপদী শিল্পী মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রমুখের যে গানের ধারা তা বদলে যাচ্ছিল। আসছিল ব্যান্ডের সময়। জিঙ্গোইজমের সময়টায় খালিদ জনপ্রিয় হয়েছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তিনি চলেছেন একটা ভিন্ন পথে। সে কারণেই ব্যান্ডে থাকার পরও তার গানে ছিল মেলোডি। আবার তার সমকালীন শিল্পীদের মতো সংখ্যার দিক থেকেও বেশি গাননি তিনি।
খালিদের মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত বাংলাদেশের সংগীত অঙ্গন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক, অনুভূতি ও স্মৃতির কথা জানিয়েছেন বহু শিল্পী। নগরবাউল জেমস পেজ থেকে লেখা হয়েছে, ‘সে যে হৃদয় পথের রোদে, একরাশ মেঘ ছড়িয়ে, হারিয়ে গেল নিমিষে।’
শুভ্র দেব লিখেছেন, ‘অনেক বছরের বন্ধুত্বের সম্পর্ক আমাদের। চাইমের টুলু আমার অনেক পুরনো বন্ধু। সে সময় টিএসসিতে অনেক সময় আমরা একসঙ্গে আড্ডা দিয়েছি, খালিদও আসত। ওর গানের বিশেষত্ব ছিল ও অনেক সুরে গান গাইত আর তাই পেয়েছিল জনপ্রিয়তা। সবকিছু সরলভাবেই দেখত, মনটা ছিল অনেক ভালো। খালিদের অভাব অপূরণীয়। তার আত্মার শান্তি কামনা করছি। যেখানেই থাকো ভালো থেকো বন্ধু।’
বন্ধুভাবাপন্ন খালিদকে নিয়ে সুজিত মোস্তফা লিখেছেন, ‘আশির দশকের শুরুতে টিএসসির সাংস্কৃতিক অঙ্গন যখন আমরা ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছি, তখন খালিদ প্রায়ই আসত আমাদের টিএসসির আড্ডায়। সে ব্যান্ডের গায়ক, কিন্তু আমাদের ধারার গানগুলো সে অবলীলায় ও ভারি মিষ্টি সুরেলা কণ্ঠে গাইত। সহজে মিশত সবার সঙ্গে।’
খালিদকে ফেরান গেল না। গানের কথা দিয়েই বিদায় জানালেন প্রিন্স মাহমুদ। লিখেছেন, ‘কোনো বাঁধনেই বাঁধা তো গেল না কিছুতেই...।’










