কয়েক বছর হলো বাংলা সিনেমায় নতুন হাওয়া লেগেছে। হিসাব করলে হয়তো ২০১৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘আয়ানবাজি’ থেকেই শুরু করতে হবে। কেননা অমিতাভ রেজা চৌধুরীর এ সিনেমা থেকেই হলে ফিরেছিল দর্শক। কিন্তু তারপর আবার দীর্ঘ বিরতি। ছয় বছর পর ‘হাওয়া’ থেকে আবার নতুন সূচনা। ২০২২ সালের পর ২০২৩ সালেও প্রেক্ষাগৃহে এসেছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সিনেমা। এসব সিনেমায় ঐতিহাসিক ঘটনার ক্ষেত্রে প্রাধান্য পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। গত বছর এসেছে ‘ওরা ৭ জন’, ‘১৯৭১ সেইসব দিনগুলো’। বাংলা সিনেমার দুর্দিনেও সিনেমা নির্মিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, কিন্তু ভাষা আন্দোলন নিয়ে সিনেমা অপ্রতুল। এমনকি এ ঘটনা নিয়ে নাটকও নির্মিত হয় না খুব একটা।
সিনেমায় ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ সর্বপ্রথম আনেন জহির রায়হান। ‘জীবন থেকে নেয়া’য় আমরা দেখি প্রভাতফেরির কথা। কিন্তু জীবন থেকে নেয়া কোনোভাবেই ভাষা আন্দোলনকেন্দ্রিক সিনেমা নয়। অবশ্য না হলেও জহির রায়হানের নির্মাণগুণে বিষয়টি অল্প সময় সিনেমায় থাকলেও তা হয়ে উঠেছিল বিশেষ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে নির্মিত সিনেমাটি দ্রোহ ও আন্দোলনের বাণী ছড়ায়। সেখানে ভাষা আন্দোলন ও প্রভাতফেরির কথা এ সিনেমায় ভাষা আন্দোলনকে মূর্ত করেছে। পাশাপাশি জানিয়েছে বা মনে করিয়ে দিয়েছে এটি আমাদের ইতিহাসের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এরপর সিনেমায় ভাষা আন্দোলনের প্রসঙ্গ কই?
২০০৬ সালে শহীদুল ইসলাম খোকন নির্মাণ করেন ‘বাঙলা’। আহমদ ছফার ‘ওঙ্কার’ অবলম্বনে সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন তিনি। অভিনয় করেছেন শাবনূর, মাহফুজ আহমেদ, হুমায়ূন ফরীদি, ওয়াহিদা মল্লিক জলি, মিল্টন খন্দকার প্রমুখ। একটি বোবা মেয়ের গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে উপন্যাসের পটভূমি এবং সেখানে উঠে এসেছে ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার প্রসঙ্গ। খোকন যখন এ সিনেমা নির্মাণ করেন তখন বাংলাদেশের সিনেমার অবস্থা একদমই ভালো নয়। বাঙলা তাই তেমন কোনো আলোচনা পায়নি। সিনেমাটির পটভূমি সুন্দর হলেও এর শেষটা অতিনাটকীয়, তবে নির্মাণ খারাপ নয়। সিনেমাটি নিয়ে আরো আলোচনা হতে পারত বা এখনো হতে পারে। কিন্তু এ সিনেমার পর আবার খরা।
এরপর অভিনেতা ও নির্মাতা তৌকীর আহমেদ চেষ্টা করেন ভাষা আন্দোলনের গল্প বলতে। ২০১৯ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘ফাগুন হাওয়ায়’। সিনেমার মুখ্য চরিত্রে ছিলেন সিয়াম আহমেদ ও নুসরাত ইমরোজ তিশা। এর বিশেষত্ব হলো এটি দেখিয়েছে ঢাকার বাইরের ভাষা আন্দোলন। গল্পে দেখা যায়, মফস্বলে পুলিশ জোর করে উর্দুতে কথা বলাচ্ছে। কিন্তু তার বিপরীতে ছাত্ররা নাটক করে এবং সর্বশেষ প্ল্যাকার্ড নিয়ে মিছিল করে মাতৃভাষার দাবি আদায় করতে চায়। ঢাকা মেডিকেলের আন্দোলন ছাড়াও যে দেশের নানা স্থানে ভাষার জন্য আন্দোলন হয়েছিল তৌকীর তা মনে করিয়ে দিয়েছেন ভাষা আন্দোলনের ৬৭ বছর পর।
এদিকে নাটক বলতে আমরা কেবল টিভি নাটক বুঝি। সেখানেও ভাষা আন্দোলন নিয়ে নাটকের সংখ্যা কম। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে ভালোবাসা দিবসকে কেন্দ্র করে প্রচুর টিভি নাটক হয়, কিন্তু ভাষা আন্দোলন নিয়ে হয় না। কখনো দুয়েকটা নাটক হয়তো থাকে। গত বছর নাগরিক টিভিতে ‘খোকা ফিরবে’, বিটিভিতে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্প থেকে ‘ভাষাতেই শক্তি’ প্রচার হয়েছিল।
এদিকে ভাষা আন্দোলনের সময়কালের পরপর আসকার ইবনে শাইখ ‘দুর্যোগ’ নামে নাটক লিখেছিলেন। ভাষা আন্দোলনের দুই বছর পর (১৯৫৪) তিনিই লিখেছিলেন ‘যাত্রা’। তবে অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ সবচেয়ে জনপ্রিয় ও চর্চিত। ‘কবর’ নাটকটি মুনীর চৌধুরী ১৯৫৩ সালে কেন্দ্রীয় কারাগারে রচনা করেন। নাটকটি প্রথম মঞ্চায়ন হয় একুশে ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় কারাগারে।
মোটাদাগে ভাষা আন্দোলন নিয়ে সিনেমা, নাটক ও টিভি নাটকের এ-ই হাল। ভাষা আন্দোলন আমাদের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ নিয়ে আরো বেশি কাজ হওয়া প্রয়োজন। সিনেমাহলে যখন দর্শক ফিরছে, তখন এ বিষয়ে মনোযোগ দেয়া সময়ের দাবি।










