বহুদিন হলো গালিব মারা গেছে কিন্তু এখনো মনে পড়ে
সব ব্যাপারেই সে বলত এমন যদি হতো, কেমন হতো?
বহু বছর আগেই গালিব মারা গেছেন। কিন্তু কবিতার শক্তি এমনই, একটা সুপারহিরো সিরিজ নিয়ে লিখতে গিয়ে গালিবের কথা মনে পড়ে। তিনি প্রতি কথাতেই বলতেন, বিষয়টা যেমন আছে তেমন না হয়ে অন্য রকম হলে কেমন হতো। গালিবের মৃত্যুর ১৫০ বছর পর ২০২২ সালে মার্ভেল এনেছিল একটি সিরিজ, যার নাম ‘হোয়াট ইফ...’ অর্থাৎ ‘এমন যদি হতো...’। সিরিজে ওয়াচার নামে একটি বৃহত্তর শক্তি কথা বলে অল্টারনেট ইউনিভার্সের। মার্ভেলের মূল দুনিয়া থেকে ভিন্ন এক দুনিয়ার বাস্তবতার কথা বলে অ্যানিমেটেড এ সিরিজ।
হোয়াট ইফের প্রথম সিজন ছিল মূলত ডক্টর স্ট্রেঞ্জকে কেন্দ্র করে। সিনেমার ডক্টর স্ট্রেঞ্জ কাজ করে পৃথিবীর বৃহত্তর উন্নতির জন্য। কিন্তু হোয়াট ইফের স্টিফেন স্ট্রেঞ্জ অনেক বেশি স্বার্থপর। তবে তার স্বার্থপরতা প্রেমের ক্ষেত্রে। স্ক্রিস্টিন পামারকে পাওয়ার জন্য। হোয়াট ইফ সে বছর বলেছিল, একজন সুপারহিরোরও ব্যক্তিজীবন ও পছন্দ থাকে। মার্ভেলের মূল গল্পও এর পর থেকে কোনো না কোনোভাবে চরিত্রের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ও ইতিহাসকে অনুসরণ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ব্ল্যাক প্যান্থার: ওয়াকান্ডা, স্পাইডার ম্যান: নো ওয়ে হোম ও দ্য মার্ভেলস। সে ধারাবাহিকতায় এবার হোয়াট ইফ যেন নজর দিল পেগি কার্টারের দিকে। এজেন্ট কার্টার বা ক্যাপ্টেন পেগিই দ্বিতীয় সিজনে কয়েকটি পর্বের কেন্দ্রীয় চরিত্র।
তবে শুরু হয়েছিল নেবুলাকে দিয়ে। এ ইউনিভার্সের নেবুলা যুক্ত হয় নোভা কর্পসে। আর সেখানে তার ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ছাপিয়ে গেছে বিশ্ব শান্তি বা বিশ্বের কল্যাণের দিকে। ইয়োন্দুর সঙ্গে তার সম্পর্কও একটা নতুন বিষয় ছিল মার্ভেলের গল্পে। তার চেয়েও মজার ব্যাপার ছিল পিটার কুইলকে নতুন রূপে দেখা। দ্বিতীয় পর্বে কুইলকে দেখা গেছে পৃথিবী আক্রমণ করতে। আর সেখানে সে মুখোমুখি হয় অ্যান্ট ম্যান রূপী হ্যাংক পিম, এজেন্ট কার্টার, কিং টি’চাকা ও হাওয়ার্ড স্টার্কের। মার্ভেল ইউনিভার্সের সুপারহিরোদের সঙ্গে পরিচিত দর্শকের জন্য এ নায়কদের পূর্বসূরিদের দেখতে পাওয়া একটা ভালো অভিজ্ঞতা।
এবারের সিজন এগিয়েছে একটু ঢিলেভাবে। বিশেষত তৃতীয় পর্ব ‘ইফ হ্যাপি সেভড দ্য ক্রিসমাস’ অনেকেরই ভালো লাগবে না। হাল্ক ব্লাড থেকে হ্যাপি হোগানের দৈত্য হয়ে ওঠা ও টনি স্টার্কের ফাজলামো অবশ্য একটা কমিক রিলিফ দেয়। মনে রাখা দরকার, এটি ছিল বড়দিনের এপিসোড। তাই সে মজাটাই রেখেছেন নির্মাতারা। কিন্তু চতুর্থ পর্ব ‘ইফ আয়রন ম্যান ক্র্যাশড ইন্টু দ্য গ্র্যান্ডমাস্টার’ খুব একটা প্রতিশ্রুতিশীল ছিল না। কেননা একদিকে এটি যেন থর: র্যাগনারক ও আয়রন-ম্যান ওয়ানের রিটেলিং। সেখান থেকে বের হয়ে ক্যাপ্টেন কার্টারের গল্পে আবার ফেরে হোয়াট ইফ। কিন্তু সপ্তদশ শতকে থরের ভিন্ন রূপ, স্টার্কের পুরনো দিনের বিজ্ঞানী হওয়ার বিষয়টি ঠিক খাপ খায় না। তবে রবিন হুড বা অন্যান্য পুরনো গল্পের নায়কদের আনার মাধ্যমে একটা নতুন ধারণা দিয়েছে হোয়াট ইফ যে তারা ছিল ওই সময়ের অ্যাভেঞ্জার্স। সেটা বেশ ভালো।
হোয়াট ইফ নির্মাণ করেছেন ব্রায়ান অ্যান্ড্রুস ও তার সঙ্গীরা। ব্রায়ান সব পর্বেই ছিলেন। কিন্তু পর্ব অনুসারে এসেছে ভিন্ন পরিচালক। এবারে তারা গল্প বলেছেন প্রথম সিজনের তুলনায় ভিন্নভাবে। অ্যানিমেশনেও আছে ভিন্নতা। অ্যানিমের একটা ভাব পাওয়া যায়। বিশেষত কাহোরির গল্পে। আর এ গল্প থেকেই মোড় ঘোরে হোয়াট ইফ দ্বিতীয় সিজনের। কাহোরির আদিবাসী এলাকার ওপর আক্রমণ ও তার অমর লোকে চলে যাওয়া, সেখান থেকে ফিরে এসে নিজের লোককে বাঁচানোর গল্পটা পুরাতন। কিন্তু হোয়াট ইফ তাকে এনেছে নতুন এক শক্তি দিয়ে। এ যেন পুরনো যুগের সে ‘ক্ষমতাসীন অত্যাচারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো’র গল্প।
মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্স মূলত সুপারহিরোর বাণিজ্যিকীকরণ করেছে অনেক আগেই। তাদের সিনেমায় গ্ল্যামার বেশি। কিন্তু হোয়াট ইফ সে গ্ল্যামার থেকে বেরিয়ে আসে। যে কারণে আমরা ভিন্ন দুনিয়ার গল্পে দেখি থ্যানোস বড় দুর্বল। ওয়ান্ডা এখানে খুব শক্তি ধরে রাখতে পারে না। এ বিকল্প গল্পে থর কখনো খল হিসেবেই আসে আর ওডিন আসে হেলার শত্রু হিসেবে। কাহোরির সঙ্গে স্ট্রেঞ্জকে জুড়ে ওয়াচার আমাদের দেখান যে প্রিয় সুপারহিরোও নিজের জন্য দুনিয়াকে হুমকির মুখে ফেলতে পারেন।
হোয়াট ইফ... একটা ভিন্ন বাস্তবতার কথা বলে। কিন্তু সব উল্টে যায় না সেখানে। কোনো না কোনোভাবে শেষ পর্যন্ত স্ট্রেঞ্জ নিজের ভুলটা বুঝতে পারে আর শেষ পর্যন্ত বাঁচিয়ে দেয় দুনিয়াকে আর পেগি ফিরে আসে তার দুনিয়ায়। কিন্তু আমাদের কাছে থেকে যায় সে প্রশ্নগুলো, গালিবের মতো করে হোয়াট ইফ... আমাদেরও ভাবায়, এমন না হলে কেমন হতো?










