এই শহরে আমাদের রোজকার জীবনযাপন। ভালো-মন্দ নানা ঘটনা ঘটতে থাকে প্রতিদিন। তার সবটা আমাদের জানা হয় না। আবার কখনো মোটাদাগে আমরা একটা ঘটনা জানি, কিন্তু তার বাস্তবতা জানা হয় না। প্রতিটি ঘটনার নেপথ্যে থাকে আরো অনেক ঘটনা। সেসব নিয়ে কখনো গল্প লেখা হয়, কখনো তৈরি হয় সিনেমা। তবে দিন বদলের রাজনীতিতে সিনেমা বা নাটকের জায়গা এখন নিয়েছে ওয়েব সিরিজ। বড় প্লাটফর্ম ও দর্শক পাওয়ার কারণে সেখানে কনটেন্ট নিয়ে নিরীক্ষা করা যায়। তৈরি হয় বিচিত্র গল্প। সে ধারাবাহিকতায় আশফাক নিপুন নির্মাণ করেছিলেন ‘মহানগর’। এ শহরের একটি রাতের গল্প। এবার তার দ্বিতীয় সিজন নিয়ে এসেছেন নির্মাতা আর সেখানে আবার দেখিয়েছেন এ নগরের জীবন বাস্তবতা।
গল্পটি মূলত ওসি হারুনের। প্রথম সিজনে দর্শক মোশাররফ করিমকে দেখেছে এ চরিত্রে। পাওয়া গিয়েছিল তার অভিনয় দক্ষতার প্রমাণ। এর সঙ্গেই ছিল আশফাক নিপুনের নির্মাণ ও একটা নিরেট গল্প। সেখানে থ্রিল, সাসপেন্সের কমতি ছিল না কিন্তু মূল হয়ে উঠেছিল রূঢ় বাস্তবতা। আমরা প্রতিদিন এমন কিছু বিষয়ের মধ্য দিয়ে যাই, যা আমাদের সঙ্গে ঘটার কথা নয়। সেখানে আবার কখনো আসে পোয়েটিক জাস্টিস। আফনান, হারুন, মলয়ের গল্পটি নিপুণভাবে বলেছিলেন নির্মাতা নিপুন। দ্বিতীয় সিজন নিয়ে তাই আশা ছিল আকাশচুম্বী। কনটেন্ট হিসেবে এবারো দর্শকের চাহিদা মিটিয়েছেন নির্মাতা। দর্শককে দিয়েছেন একটা জমাট গল্প আর সেখানে ছিল নতুন ও অভিজ্ঞ অভিনেতাদের দক্ষতা।
সিরিজের গল্প প্রথম সিজনের শেষ থেকে শুরু হয়নি। পিছিয়ে গেছে দুই বছর আগে। গল্পকে নতুন মোড় দেয়া হয়েছে এবার। মেলেছে ডালপালা। নির্মাতা এবার একটি শাখা তৈরি করেছেন, তার উপশাখা খুব বেশি নেই। পরিমিতিবোধের পরিচয় পাওয়া যায় এখানে। একসঙ্গে অনেক কিছু মিলিয়ে ফেলা হয়নি। আমাদের সহজে দেখা ঘটনার বাইরের বাস্তবতা এখানে উঠে এসেছে, যা দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে।
স্ট্রিমিং শুরু হওয়ার পর থেকেই দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছে মহানগর ২। চলমান সময়ের বাস্তবতা ধারণ করে মহানগর। মোস্তফা সরয়ার ফারুকী তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আশফাকের মহানগর বা মহানগর ২ ছিপ ফেলে সময় ধরারই আরেক নাম।’ ঈদ উপলক্ষে স্ট্রিম হয়েছে মাইশেলফ অ্যালেন স্বপন নামে আরেকটি সিরিজ। দারুণ জনপ্রিয় হওয়া এ সিরিজের কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করা নাসির উদ্দিন খান বলেন, ‘অসাধারণ নির্মাণ। দেখতে হবে। বলে বোঝানো যাবে না।’ প্রশংসা করেছেন চঞ্চল চৌধুরীও।
মহানগরের মূল আকর্ষণ ছিলেন মোশাররফ করিম। এ সিজনেও তিনিই স্টার। সিরিজটি বহু মানুষ দেখতে বসেছিলেন, কেবল ওসি হারুনের অভিনয় ও সংলাপের জন্য। প্রথম সিজনে তার ‘দুইটা কথা মনে রাখবেন’ এবার খানিকটা বদলে গিয়ে হয়েছে, ‘দুইটা কথা ভুলে যাবেন।’ প্রবাদ বাক্য বা নীতিবাক্যের মতো হারুনের এ ‘দুইটা কথা’ মূলত বেশকিছু লাইফ লেসন দেয়। আলাদা করে বলা দরকার সংলাপ লেখার গুণের কারণে এ কথাগুলো বস্তাপচা না হয়ে দর্শকের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করে।
দ্বিতীয় সিজনে নতুন কাস্টিং নিয়ে হাজির হয়েছে মহানগর টিম। ফজলুর রহমান বাবু, আফসানা মিমি, বৃন্দাবন দাস, তানজিকা আমিন, দিব্য জ্যোতিকে দেখা গেছে এবার। হারুনের সঙ্গে রীতিমতো টক্কর দিয়েছেন বাবর (ফজলুর রহমান বাবু)। তবে এ সিজনের একটা দুর্বল দিক হলো হারুনকে নায়ক রাখতে গিয়ে বাবরকে তার যথেষ্ট শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে ফজলুর রহমান বাবুর অভিনয়ের খুব বেশি সুযোগ ছিল না। চরিত্রটিকে আরো বিস্তার দেয়া হলে মোশাররফ-বাবু দ্বৈরথটা বাংলাদেশের সিরিজের অন্যতম একটা আইকনিক ব্যাটল হয়ে থাকত। এখন থাকল কেবল হারুন।
রাজনীতিবিদের চরিত্রে আফসানা মিমি ঠিক যতটুকু প্রয়োজন ততটাই ভালো। দর্শকের মন জয় করেছেন দিব্য ও দমবন্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি দিয়েছেন সুকুমার বড়ুয়া চরিত্রে বৃন্দাবন দাস। তবে কেকের ভেতরে চকোলেটের মতো এবার অনির্বাণকে রেখেছেন নিপুন। প্রয়োজন ছিল না হয়তো, কিন্তু স্টার ভ্যালুর কারণে দর্শকের সেটা ভালোই লেগেছে। মহানগরের নানা বাস্তবতার মতো এটা সিনেমা, সিরিজের বাস্তবতা।
মহানগরকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই বাংলা সিরিজের মধ্যে সেরা বলছেন। সেরার নির্বাচন সময় করে থাকে। তবে গল্প ও নির্মাণে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকার পরও এ ধারার কনটেন্ট নতুন। সেদিক থেকে মহানগরকে এগিয়ে রাখা যায়। সেরার দৌড়টা আপাতত তোলাই থাক।










