ইউনিভার্সের পর মাল্টিভার্স তৈরি করেছে মার্ভেল। একই পথে হাঁটছে ডিসি। ওয়ার্নার ব্রোস তাদের নতুন পরিকল্পনায় মার্ভেলকে অনুসরণ করবে এমনই মনে হচ্ছে। এ ধরনের সিনেমাগুলো সবই নির্মিত হচ্ছে ভিজুয়াল ইফেক্টের ওপর ভিত্তি করে। মার্ভেলের দুনিয়া মূলত সিজিআই ছাড়া নির্মাণ সম্ভব নয়। অন্যদিকে, ডিসির সিনেমাও সুপারহিরোভিত্তিক। সেখানেও অ্যাকশন সিকোয়েন্স বা সেটআপ তৈরির জন্য প্রযুক্তির দ্বারস্থ হতে হয়। সিনেমা বিষয়টাই প্রযুক্তিনির্ভর। কিন্তু দিন দিন সিনেমায় প্রযুক্তি এত বেশি ঢুকে পড়ছে যে অভিনেতা-অভিনেত্রীর অভিব্যক্তিও তৈরি হচ্ছে কম্পিউটার জেনারেটেড ইমেজারির (সিজিআই) মাধ্যমে। এমনকি এক সময় যে পরিচালকরা সময় নিয়ে সিনেমার পরিকল্পনা করে বাস্তবতাকে নিজের মতো তৈরি করতেন, তারাও পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর সিনেমা নির্মাণ করছেন। যেমন জেমস ক্যামেরন।
গত বছরের শেষে মুক্তি পাওয়া অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার বক্স অফিসে আয় করেছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। সিনেমাটি পুরোপুরিই প্রযুক্তিনির্ভর। ২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া অ্যাভাটারও সে ধারার সিনেমা ছিল। কিন্তু সেখানে দর্শককে একটি নতুন দুনিয়ার আভাস দিয়েছিলেন ক্যামেরন। তবে সে দুনিয়া তৈরির ক্ষেত্রে যে গল্পটা বলার কথা, সেখানে ক্যামেরন অনেকটাই খামতি রেখেছেন বলে মনে করেন দর্শক-সমালোচকরা। কিন্তু সিনেমাটি বক্স অফিসে ঠিকই কোটি কোটি ডলার কামিয়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে, ক্যামেরন নিজে সমালোচনা করেছেন মার্ভেল ও ডিসির সিনেমার। এসব সিনেমা ‘বালকসুলভ’ বা কিশোর উপযোগী বলেই মন্তব্য করেছেন তিনি। এছাড়াও তার মতে এসব সিনেমা কেবলই ভিএফএক্স নির্ভর।
একই সঙ্গে ক্যামেরন আবার স্বীকার করেছেন এসব সুপারহিরো সিনেমার মধ্য দিয়েই সিনেমায় ভিজুয়াল এফেক্ট উন্নত হয়েছে এবং সিনেমাগুলো মুনাফাও দিচ্ছে ইন্ডাস্ট্রিকে। কমিকবুকডটকমের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘কমিক থেকে নির্মিত সিনেমাগুলো বেশি ব্যবসা করছে। স্বীকার করতে আপত্তি নেই যে এখানে অনেক দক্ষ কর্মী আছেন, যারা এফেক্টের ক্ষেত্রে দারুণ কাজ করেন। তার ফলে আমাদেরও সুবিধা হচ্ছে। এ কাজের মাধ্যমে আমরা নতুন ও ভালো মানের কর্মী পাচ্ছি, যারা সিনেমায় ব্যবহৃত প্রযুক্তিকে আরো উন্নত করবেন।’ ক্যামেরনের এ কথা থেকে বোঝাই যাচ্ছে, সামনের দিনগুলোয় সিনেমায় আরো বেশি ভিজুয়াল এফেক্ট ব্যবহৃত হবে। এর ফলে সিনেমা আকর্ষক হলেও হয়ে উঠবে কৃত্রিম।
সিনেমায় সিজিআই এসেছিল জেমস ক্যামেরন, স্টিভেন স্পিলবার্গদের হাত ধরে। নব্বইয়ের দশকে টার্মিনেটর টু ও জুরাসিক পার্কে প্রথম সিজিআই ব্যবহৃত হয়। এরপর থেকে সিনেমায় ক্রমাগত আরো বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করে ভিজুয়াল এফেক্টস। গত দশকে বিশ্বের সব অঞ্চলের সিনেমায়ই প্রধান হয়ে উঠেছে সিজিআই। কিন্তু একালেও অনেক নির্মাতা সিজিআই বা প্রযুক্তিনির্ভর ভিজুয়াল এফেক্টের দ্বারস্থ হতে নারাজ। এ তালিকার শুরুর দিকে নাম থাকবে ক্রিস্টোফার নোলান, কোয়েন্টিন টারান্টিনো, প্যাটি জেনকিনস, ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা, জর্জ মিলার, মার্টিন ক্যাম্পবেল প্রমুখের নাম। এদের মধ্যে ফোর্ড কপোলা সিনেমা নির্মাণ করে এসেছেন ষাটের দশক থেকে। তিনি প্রবীণ নির্মাতা। কিন্তু নোলান কিংবা জেনকিনস সে তুলনায় তরুণ নির্মাতা। তারাও সিজিআই চান না।
ক্রিস্টোফার নোলান ২০২২ সালে এসে তার সিনেমা ওপেনহেইমারের জন্য একটি নিউক্লিয়ার বিস্ফোরণের বাস্তব দৃশ্যধারণ করেছেন। তার মতে, ‘সিজিআই খুব শক্তিশালী মাধ্যম হলেও আমি সিজিআই ও ফটোগ্রাফিকে আলাদা করে দেখি। কেননা, কম্পিউটার দিয়ে ছবি তৈরি করা গেলেও তা বাস্তব নয়।’ ওয়ান্ডার ওম্যানের পরিচালক প্যাটি জেনকিনসও বাস্তবের ভিত্তিতেই সিনেমা নির্মাণে বিশ্বাসী। সুপারহিরো সিনেমা নির্মাতার ক্ষেত্রে এমন বাস্তবঘেঁষা উদাহরণ কম। তিনি কম্পিউটার জেনারেটেড ইমেজ দিয়ে সিনেমা নির্মাণের ব্যাপারটিকে ‘ বোকা বোকা’ মনে করেন।
তারা একথা মনে করলেও অন্যান্য নির্মাতারা তা মনে করেন না। কেবল হলিউড নয়, বিশ্বের অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রির নির্মাতারাও সিজিআইয়ের দিকে ঝুঁকছেন। ভারতে ২০১৫ সালে নির্মিত বাহুবলী অন্যতম উদাহরণ। এরপর ধারাটি একটু স্তিমিত হলেও ২০২২-এ এসে একাধিক সিনেমা বলিউডে নির্মিত হয়েছে যেখানে সিজিআই প্রধান। ব্রহ্মাস্ত্রেরই উদাহরণ দেয়া যায়। সিনেমাটি কেবল সিজিআইয়ের কারণেই বক্স অফিসে ভালো আয় করেছে।
একটি প্রশ্ন উঠতে পারে যে ‘নান্দনিক সিনেমা’ আসলে কী? সিজিআইনির্ভর সিনেমাও তো নান্দনিক হতে পারে। সে কথায় আপত্তি করার কিছু নেই কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ভিজুয়াল এফেক্ট নিয়ে মাথা ঘামাতে গিয়ে সেসব সিনেমায় গল্প, অভিনয়ে খামতি থেকে যাচ্ছে। তারচেয়ে বড় কথা অনেক ক্ষেত্রেই অভিনেতা-অভিনেত্রীর অভিব্যক্তিই পাওয়া যায় না। ক্ল্যাসিক উদাহরণ হতে পারে দ্য ওয়ে অব ওয়াটার। কিন্তু এসব সিনেমাই বক্স অফিসে বেশি ব্যবসা করছে।
একথা ঠিক যে গোল্ডেন গ্লোবে সেরা সিনেমার পুরস্কার পেয়েছে দ্য ফেবলম্যানস। অস্কার জয়ের সম্ভাবনাও রয়েছে এর। তালিকায় থাকছে দ্য ব্যানশিস অব ইনশিরিনের মতো সিনেমা। গত বছর আলোচনায় ছিল বেলফাস্ট। কিন্তু এ ধরনের সিনেমার দর্শক ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। সে কারণেই একটা সন্দেহ দানা বাঁধে যে নান্দনিক সিনেমার দিন হয়তো শেষ হয়েই আসছে।










