ইমতিয়াজ আলী পরিচালিত ‘জাব উই মেট’ সিনেমার ‘আয়োগে জাব তুম ও সাজনা’ গানের সঙ্গে কমবেশি অনেকেই পরিচিত। ওস্তাদ রশিদ খানের কণ্ঠে এ গান ভারত, বাংলাদেশ এমনকি পাকিস্তানেও জনপ্রিয়। সহজে রশিদ খানকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য এ গানের উল্লেখ। এমনিতে রশিদ খানের গান অগণিত। তার মধ্যে জনপ্রিয় গানও কম নয়। শাস্ত্রীয় সংগীতের শিল্পী হলেও তিনি গেয়েছেন বাণিজ্যিক সিনেমায়। জলসায় গাওয়া গানে যেমন পেয়েছেন জনপ্রিয়তা ও প্রশংসা, সিনেমায়ও তাই। রামপুর-সাসওয়ান ঘরানার শিল্পী তাই এক নামে পরিচিত ভারতীয় উপমহাদেশে।
রশিদ খানের গানের যাত্রা আগ্রহজাগানিয়া। তবে অনেকটাই নিশ্চিত ছিল তার এ যাত্রা। কেননা রশিদ খান সংগীত পরিবারেরই মানুষ। গান শিখেছেন নিসার হুসেন খাঁর কাছে। অন্যদিকে তিনি গোয়ালিঘর ঘরানার ওস্তাদ গোলাম মোস্তফা খাঁর ভাগ্নে।
উত্তর প্রদেশের বাদায়ূনে জন্ম রশিদ খানের। খুব অল্প বয়সে তাকে মুম্বাইয়ে নিয়ে যান তার মামা। সেখানে এক ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করান। সঙ্গে খানিক তালিমও দেন। কিন্তু সেখানে কিছু ভালো লাগেনি তার। ফলে তিনি ফিরে আসেন বাদায়ূনে। সেখানে ফিরে রশিদ খান তালিম নেয়া শুরু করেন রামপুর-সাসওয়ান ঘরানার দিকপাল ওস্তাদ নিসার হুসেন খাঁ-সাহিবের কাছে। ১০ বছর বয়সে তিনি কলকাতা যান এবং পরে সেখানেই থিতু হয়েছিলেন।
মূলত ১৯৭৮ সালে নিসার হুসেন গিয়েছিলেন কলকাতায়। সেখানে সংগীত রিসার্চ একাডেমিতে যোগ দেন। আর তার সঙ্গে রশিদ খান কলকাতা গিয়ে একাডেমিতে পরীক্ষা দিয়ে পেয়ে যান স্কলারশিপ। জানা যায়, তার পরীক্ষা নিয়েছিলেন রাইচাঁদ বড়াল, এ কানন, মালবিকা কানন, বিজয় কিচলু, ভিজি যোগ ও দীপালি নাগ। এসব নানা বিষয়ে একসময় কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপ করেছেন তিনি। সেখানেই জানিয়েছিলেন, প্রথম শিখেছিলেন রাগ ভৈরব। প্রথমে নিসার হুসেন তাকে দিয়ে কেবল ‘সা’ বলিয়েছেন বহুদিন। এরপর একসময় বন্দিশ, তারপর শাস্ত্রীয় সংগীতের আরো নানা শাস্ত্র।
রশিদ খান যে ঘরানার সংগীত করেন তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য বোলতান। তার গায়কীতে এর প্রকাশ আছে। নিসার হুসেন খাঁর কাছ থেকে শেখা সংগীত তিনি জীবনের পুরোটা সময় ধরে রেখেছিলেন।
রশিদ খানকে নিয়ে লিখতে গিয়ে আনন্দবাজার জানিয়েছে, তার প্রথম অনুষ্ঠানও কলকাতায় হয়েছিল। তখন তার বয়স ১০ বা ১১ বছর। সেখানে রশিদ খানের সঙ্গে ছিল পণ্ডিত রবিশঙ্করের বাজনা। সেই শুরু। তারপর তিনি কতবার মঞ্চে উঠেছিলেন, তা হয়তো নিজেও বলতে পারবেন না। তবে প্রথম দিনের অনুষ্ঠানের কথা জীবনে বারবার স্মরণ করেছেন। সেদিন পাঁচ বা ছয় হাজার লোকের সামনে বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলেন তিনি।
‘রশিদ খানের গান’ কথাটি হয়তো ভুল হবে, কেননা শাস্ত্রীয় সংগীতে গান থাকে না, থাকে সংগীত। তবে তাকে সহজে চেনা যায় যাব উই মেটের আওগে তুম, সিটিলাইটসের টাইটেল সং সিটিলাইটস, মাই নেম ইজ খানের আল্লা হি রেহেম দিয়ে। এর বাইরে ইউটিউবে খুঁজলে পাওয়া যাবে তার বহু সংগীত। গেয়েছেন রাগ ভৈরব, হংসধ্বনি, বেহাগ, শ্যাম কল্যাণ, কৌশি কানাড়া। তিনি মঞ্চে উঠলে দর্শকের আবেদন থাকত ‘ইয়াদ পিয়া কি’ গাওয়ার। ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খাঁর এ গান বহু শিল্পী গেয়েছেন, কিন্তু রশিদ খানের মতো করে কেউ পারেননি।
পণ্ডিত ভীমসেন যোশীর সঙ্গে হার্দিক সম্পর্ক ছিল রশিদ খানের। পুনেতে একবার রশিদ খানের গান শুনে ভীমসেন তাকে ১০ হাজার রুপি নজরানা দিয়েছিলেন। সঙ্গে বলেছিলেন, কোনোদিন যেন নজরানা ছাড়া গান না করেন। এ ভীমসেনই নাকি প্রথমবার রশিদ খানের সংগীত শুনে বলেছিলেন ‘ভারতের শাস্ত্রীয় সংগীত তার ভবিষ্যৎ পেয়ে গেছে।’ আর রশিদ খান সম্পর্কে ঋতুপর্ণ ঘোষ বলেছিলেন, তিনি ‘ভূমণ্ডলের দীপ্যতম সুগন্ধর্ব’।
এহেন রশিদ খান কোনো নিয়মবদ্ধ রেওয়াজ বা গানের রীতিতে বিশ্বাস করেন না। সে কারণেই শাস্ত্রীয় সংগীতের মধ্যে নিজেকে বেঁধে রাখেননি। সিনেমার গান করেছেন, এমনকি ফিউশনও করেছেন। মূলত শাস্ত্রীয় সংগীতের শিল্পীরা যে মানসের হন, তাতে ফিউশন করার কথা নয়। কিন্তু তিনি করেছেন।
মূলত বাদায়ূন থেকে কলকাতায় আসা রশিদ খান সংগীতকে নিজের ভুবন করে নিয়েছিলেন। আর সেখানে তার কাছে সংগীতই ছিল বড়। সংগীতের ধারা বা বিধিবদ্ধতায় নিজেকে বদ্ধ করেননি। সে কারণেই তিনি বিদগ্ধ বা সংগীতবোদ্ধা শ্রোতাদের কাছে যেমন জনপ্রিয়, তেমনি সাধারণ শ্রোতার কাছেও জনপ্রিয়।










