বর্তমানে একটা সাধারণ চর্চা হলো কোনো কনটেন্ট মুক্তির আগেই সেটি নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা তোলা। দেখা যায়, সেটি দর্শক, শ্রোতা বা পাঠকের সামনে এলে সে আলোচনা আর থাকে না। ঘটনাটির অন্যতম কারণ প্রচারের ইচ্ছা। প্রচার না করলে এ যুগে প্রসার হয় না। ওটিটি এক্ষেত্রে নতুন করে কাজটি করছে। তাদের কোনো কোনো কনটেন্ট নিয়ে খুব আলাপ তুলতে দেখা যায়। যেমন সম্প্রতি আসা গাল গাদত-আলিয়া ভাটের সিনেমা ‘হার্ট অব স্টোন’। ভারতে যেমন সিনেমাটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তেমনি হয়েছে হলিউডে। তবে যে উচ্চাশা তৈরি করেছিল, শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি তা পূরণ করতে পারেনি।
সিনেমার গল্প অনেকটাই চেনাজানা। হলিউডের অ্যাকশন সিনেমা যারা দেখে অভ্যস্ত, তাদের কাছে এ গল্প নতুন কিছু নয়। একজন খলনায়ক (বা খল চরিত্র), তার বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া একজন এজেন্ট আর তাদের আশপাশের নানা ঘটনা নিয়ে সাজানো এ সিনেমার গল্প। তবে হার্ট অব স্টোন পুরনো ধারার হলিউডি অ্যাকশন সিনেমা হয়ে থাকতে চায়নি। সে নতুন একটা বিষয় আনতে চেয়েছিল। চলতি বিষয়ই তার গল্পের কেন্দ্র। বিষয়টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কিন্তু সেটিই একভাবে সিনেমার জন্য নেতিবাচক হয়ে ওঠে। কেননা একই বিষয়কে অবলম্বন করে নির্মিত হয়েছিল মিশন: ইম্পসিবলের এবারের সিনেমা ‘ডেড রেকনিং-পার্ট ওয়ান’। ইথান হান্ট তথা টম ক্রুজ দর্শকের মন বহু আগেই জয় করেছেন, কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে নির্মিত সিনেমাটি নানা কারণেই দর্শকের ভালো লাগেনি। ইথান হান্টের মিশনের এক মাসের মাথায় মুক্তি পাওয়া হার্ট অব স্টোন তাই দর্শকরুচির (চাহিদাও বলা যায়) কাছেও খানিকটা মার খেয়ে গেছে। অনেক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিনেমাটিকে বলা হচ্ছে ‘নেটফ্লিক্সের মিশন ইম্পসিবল’।
টম হারপারের ‘হার্ট অব স্টোন’ দেখতে গিয়ে স্পাই থ্রিলারের পাঁড় ভক্ত বা দর্শক অনেক কিছুই আগে থেকে ধরে নিতে পারবেন। তবে যারা সাধারণত বিনোদনের জন্য সপ্তাহান্তে সিনেমা দেখে তাদের জন্য এ সিনেমা উপভোগ্য। সিনেমার শুরুটাই হয় এক ধরনের ‘টেনশন বিল্ডআপ’ দিয়ে। সেখান থেকে গল্প এগিয়ে যায় এবং এক এক করে মূল বিষয়ের দিকে চলে যায় গল্প। শুরুর এ ধারাবাহিকতা ছিল সিনেমাজুড়ে। এ জায়গা অর্থাৎ গল্পের গড়ে ওঠা হার্ট অব স্টোনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। সিনেমার গল্প লিখেছেন গ্রেগ রুকা এবং সে গল্পের ওপর গ্রেগ রুকার সঙ্গে চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন অ্যালিসন ক্রোয়েডার। তাদের দুজনের জন্য। হার্ট অব স্টোন নতুন ধারার গল্প। তবে গল্পটি দুজন সাজিয়েছেন বেশ ভালো করে।
টম হারপারের পরিচালনাও ছিল শিলীত। ১২৫ মিনিট দৈর্ঘ্যের এ সিনেমায় তিনি প্রথম থেকেই স্পাই থ্রিলারের ভাবধারাটি এনেছেন। এরপর গল্পজুড়ে ছিল একটি মিশনের জন্য করণীয় সবকিছু। চরিত্রদের এনেছেন দ্রুতই। বিশেষত মূল চরিত্র র্যাচেল স্টোন (গাল গাদত), পার্কার (জেমি ডরন্যান) ও ইয়াংকে দর্শক শুরু থেকেই দেখতে পান। মিশনের মধ্যেই ছিল তারা এবং মিশন থেকেই পরিচিত হয় চরিত্রের গভীরের গল্প। সিনেমার গল্পের পাশাপাশি অভিনয় বা পারফরম্যান্সের দিক থেকে বলা যায়, পুরো সিনেমায় আধিপত্য ছিল র্যাচেল স্টোন চরিত্রে গাল গাদতের। মূলত সেটি হওয়ারই কথা, কেননা গল্পটা ঘোরে স্টোনের মিশন ও তার যাত্রাকে কেন্দ্র করে। গাল গাদত এ ধারার সিনেমার জন্য পারফেক্ট অভিনেত্রী। হার্ট অব স্টোনে তাকে দেখে কোনো না কোনোভাবে দর্শকের মনে পড়বে ‘সল্ট’ (২০১০) সিনেমার অ্যাঞ্জেলিনা জোলিকে। যদিও দুটো গল্পের মূল বিষয় অনেকটাই ভিন্ন।
আলিয়া ভাটের কথা না বললেই নয়। সিনেমায় তিনি ছিলেন খল চরিত্রে। বলা যায়, টক্করটা হয়েছে র্যাচেল স্টোন ও কেয়া ধাওয়ানের (আলিয়া) মধ্যে। সেখানে আলিয়া গাদতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অভিনয় করেছেন। এ সিনেমার মাধ্যমে দীপিকা পাড়ুকোন, প্রিয়াংকা চোপড়ার মতো আলিয়াও হলিউডে নিজের জায়গা করে নিলেন। কিন্তু সিনেমাটি পুরোপুরি সফল হতে পারল না, এটি আলিয়ার জন্য কিছুটা দুঃখের কারণ হয়ে থাকবে। আলিয়ার পারফরম্যান্স ভালো ছিল তবে বলিউডের তিনি যে ধারার সিনেমায় অভিনয় করেন, হার্ট অব স্টোন সে তুলনায় ভিন্ন হওয়ায় আলিয়া পুরোপুরি ফুটে উঠলেন না যেন। কয়েকটি জায়গায় সংলাপ বলার ধরন ও অভিব্যক্তি এ ধরনের সিনেমার মতো হয়ে ওঠেনি।
টম হারপারের হার্ট অব স্টোন অ্যাকশনভিত্তিক স্পাই থ্রিলার। সেদিক থেকে সিনেমাটি চমৎকার ফাইট কোরিওগ্রাফ করেছে। সিনেমাটির প্রতিক্রিয়া যারাই জানাচ্ছেন, তারা এ কথা বলছেন। এছাড়া বিস্তৃত লোকেশনে শুট করার কারণে সিনেমাটি হয়ে উঠেছে দর্শনীয়। আল্পসে প্যারাসুট নিয়ে ওড়া কিংবা লিসবনে গাড়ি ধাওয়া করার দৃশ্য দর্শকের চোখে লেগে থাকার মতো। কিন্তু এর পাশাপাশিই এসে পড়ছে সিনেমার মূল গল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিষয়টি এবং তা মিশন: ইম্পসিবলের পর পরই আসায় দর্শক সমালোচকের অবচেতনেই সিনেমাটি একটু পিছিয়ে পড়ে। তাই রেটিং কম পড়ছে সিনেমার, হচ্ছে সমালোচনা। এর অন্যতম কারণ মুক্তির আগেই তৈরি করা উচ্চাশা। দর্শক মনে করেছিল, কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র নিয়ে ভিন্ন ধারার একটি সিনেমা হবে হার্ট অব স্টোন। কিন্তু তৈরি করা সে উচ্চাশা পূরণ করতে পারেনি সিনেমাটি।










