বিক্রমের পর দক্ষিণী সিনেমার চেহারাই যেন পাল্টে দিয়েছিলেন লোকেশ কনগরাজ। কমল হাসানকে নিয়ে এসেছিলেন তিনি নতুন রূপে। ১৯৮৬ সালে মুক্তি পাওয়া বিক্রমের লেজুড় ধরে এ সিনেমা যতটা না দর্শককে টেনেছিল, তার চেয়ে বেশি টেনেছিল পুরো সিনেমার নানা বাঁকের কারণে। বিক্রম হয়ে উঠেছে একটা মানদণ্ড। আর সে কারণেই লোকেশের ‘লিও’ নিয়ে দর্শকের আশা ছিল বেশি। লিও সলো সিনেমা হবে, নাকি লোকেশ ইউনিভার্সের পোশাক পরবে তা নিয়ে কত জল্পনা-কল্পনা। শেষ পর্যন্ত ইউনিভার্সেরই সিনেমা হিসেবে লিওকে পাওয়া গেল, এটি একটা প্রায় ভালো সিনেমাও হলো, কিন্তু লোকেশের মতো হলো না। তিনি নিজের যে মানদণ্ড তৈরি করেছেন, তা পার করলেন না।
লোকেশ কনগরাজের সিনেমা বেশি নয়। লিও তার সপ্তম সিনেমা। ফিচার ফিল্মে তিনি ২০১৭ সালে যাত্রা করেছিলেন ‘মানাগারাম’ দিয়ে। চারটি গল্প মিলিয়ে লোকেশের এ সিনেমা ছিল একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা। এমন সিনেমা আগেও হয়েছে, কিন্তু চার গল্পকে লোকেশ যেভাবে মিলিয়েছিলেন তা ছিল অনন্য। অনুরাগ বসুর ‘লাইফ ইন আ মেট্রো’ বা থিগারাজ কুমাররাজার ‘সুপার ডিলাক্স’ ভিন্ন কাহিনীর সমাপতন ঘটালেও ‘মানাগারাম’ সেটা করেছিল আরো চমৎকারভাবে। এমনকি বিক্রমের গোটা গল্পের মধ্যেও ছিল অন্তত তিনটি ভাগ আর সেখানে ভাগগুলো লোকেশ মিলিয়েছিলেন এমনভাবে যে বেখাপ্পা মনে হয়নি। কিন্তু লিও সেখান থেকে ভিন্ন। এর গল্পটা সলো, কিন্তু সঙ্গে তিনি যুক্ত করবেন বিক্রমকে। হতে পারে গল্পের নানা অংশে বিক্রমের চরিত্রগুলোর সঙ্গে লিওর চরিত্রগুলোর সংযোগ আছে। তবে সেটা এ সিনেমায় দেখা যায় না।
লিওর গল্পটা সলো হিসেবে খারাপ নয়। সিনেমাটিকে বিচার করতে বসলে দেখা যাবে, এখানে আছে একটা প্রধান চরিত্র যার জীবনের একটা গল্প লুকানো। এমন গল্প দক্ষিণের সিনেমায় হরহামেশা দেখা যায়। দর্শক মনে করতে পারেন অ্যাটলি কুমার পরিচালিত ‘থেরি’র কথাও। এর নাম করার কারণ সিনেমাটিতে বিজয়ই অভিনয় করেছিলেন। পুরনো জীবন ভুলে সে নতুন করে পরিবারের জন্য বাঁচে। লিওর গল্পটাও তাই। কিন্তু সে নিজের মতো করে বাঁচতে চাইলেও পুরনো জীবন আর তার মানুষেরা লিওকে শান্তিতে থাকতে দেয় না। কোনো না কোনোভাবে চলে আসে তার কাছে।
দক্ষিণের আর পাঁচটা সিনেমার মতো লিও অ্যাকশনভিত্তিক। বিজয়কে একজন ফ্যামিলিম্যান হিসেবে দেখার পাশাপাশি তাকে অ্যাকশন করতে দেখা যায়। বলতেই হবে সেখানে বিজয় দারুণ কাজ করেছেন। লোকেশের টিম অ্যাকশন কোরিওগ্রাফিও ভালো করেছে। বিশেষত এ সিনেমার প্রথম ১০ মিনিট হায়নার সঙ্গে লড়াই—দর্শক রুদ্ধশ্বাসে দেখবেন। এরপর কফি শপের মালিক, একজন বাবা ও একজন স্বামী হিসেবে বিজয়ের অভিনয়ও ভালো লাগার মতো। বলা যায়, পুরো সিনেমায় বিজয় ওয়ান ম্যান আর্মির মতো কাজ করেছেন। অবশ্য সিনেমার নাম অনুসারেও তা মানায়। কেননা সিনেমা লিওর কথা বলে। কিন্তু তাকে দেখাতে গিয়ে অন্যান্য চরিত্রের প্রতি অনেকটাই অবিচার করেছেন লোকেশ কনগরাজ।
সঞ্জয় দত্তকে আনা হয়েছিল প্রধান খল চরিত্র হিসেবে। কিন্তু অধীরার সঞ্জয় এখানে নেই। অ্যান্টনি দাসের কোনো বিল্ড আপ রাখেননি লোকেশ। সঞ্জয় এখানে আসেন কিছুক্ষণের জন্য। মনে হচ্ছিল অভিনয়টা তিনি করছেন করতে হবে বলে। চরিত্রের ভেতর ঢোকেননি। আরো সম্ভাবনা ছিল অর্জুন শারজার মধ্যে। কিন্তু হ্যারল্ড দাস হিসেবে তিনি অ্যান্টনি রূপে সঞ্জয়ের চেয়েও নিষ্প্রভ। তার চরিত্রটিকে আরেকটু জটিল করা হলে সিনেমার জন্যই সেটা ভালো হতো। আর ওদিকে তৃষা কৃষ্ণান অনেকদিন পর ফিরেও ছিলেন শোপিসের মতো।
সিনেমাটি উৎরে যায় অনিরুদ্ধের মিউজিক আর বিজয়ের অভিনয়ের জন্য। অনিরুদ্ধ আসলে সেরা সময় পার করছেন। তার মিউজিক এখন দর্শকের ভালো লাগবেই। কিন্তু সমস্যা বাধে লোকেশের ইউনিভার্স নিয়ে। কাইথির সঙ্গে যুক্ত করেছেন পুলিশ হাবিলদার নেপোলিয়নের মাধ্যমে। চরিত্রটির প্রতি সুবিচার করা হয়নি। রোলেক্সকে যে রকম এন্ট্রি দিয়ে কাইথির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল, কিন্তু লিওর সঙ্গে বিক্রমকে যুক্ত করতে একটি ফোনকল দেখানো হলো, তাও পুরোপুরি যেন মিলল না। এসব মিলিয়েই বলা যায় সিনেমাটি হলো, তবে লোকেশের মতো হলো না।










