পুরনো দিল্লির একটি ছাদে মসলা তৈরি হচ্ছে। বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে আছেন তাদের গুরুজন, পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য। রাকেশ ওমপ্রকাশ মেহরা পরিচালিত সিনেমাটির নাম ‘দিল্লি সিক্স’। এ সিনেমায় রোশন মেহরার (অভিষেক বচ্চন) দাদির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ওয়াহিদা রেহমান। রাকেশের ২০০৬ সালের সিনেমা ‘রঙ দে বাসন্তিতে’ও ছিলেন ওয়াহিদা। এমনকি অপর্ণা সেনের বাংলা সিনেমা ‘আরশিনগরে’ (২০১৪) দেখা গেছে ওয়াহিদাকে। সাদাকালো যুগের এ নায়িকা তিনটি সিনেমার দুটিতে দাদি ও একটিতে মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ২০২৩ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত ওয়াহিদাকে নিয়ে লেখার শুরুতে আসতে পারত ‘গাইড’, ‘পেয়াসা’ বা ‘তিসরি কসম’-এর নাম। কিন্তু সাদাকালো যুগের নায়িকা যে অভিনেত্রী হিসেবে এ শতকেও নিজের ছাপ রাখছেন, ওয়াহিদার ক্যারিয়ারের পাশাপাশি বলিউডেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
ওয়াহিদা রেহমানকে হয়তো বলিউড স্মরণ করবে রোজি (গাইড, ১৯৬৫), হীরা বাই (তিসরি কসম, ১৯৬৬) বা অঞ্জনা (রাম অউর শ্যাম, ১৯৬৭) হিসেবে। ওয়াহিদার কথা বলতে দর্শকের মনে পড়বে পেয়াসার সহৃদয় গোলাপ চরিত্রটি কিংবা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গলায় বিশ্বজিতের লিপে ‘ইয়ে নয়ান ডারে ডারে’ গানে তার লজ্জাবতীর মতো অভিনয়ের জন্য। কিন্তু ব্যক্তি ও অভিনেত্রী ওয়াহিদা অমন নরম ছিলেন না। তিনি ছিলেন বলিউডের প্রথম কালের স্বাধীনচেতা নারী ও অভিনেত্রী। কেবল সিনেমায় নয়, নিজের জীবনেও এর চর্চা করেছেন। সে কারণেই এ বছর দাদাসাহেব ফালকে ঘোষণা করার পর থেকেই বলা হচ্ছে একদম সঠিক হাতে উঠছে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মাননাটি।
সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যম ‘দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে ওয়াহিদাকে নিয়ে। কিশোয়ার দেশাইয়ের এ নিবন্ধে ওয়াহিদাকে বলা হচ্ছে অভিনেত্রী, বিদ্রোহী ও নারীবাদী। অভিনেত্রী ওয়াহিদাকে বলিউডের সব দর্শক মোটামুটি হলেও চেনে। কিন্তু বিদ্রোহী ও নারীবাদী কেন? বিদ্রোহী থেকেই শুরু করা যাক। ওয়াহিদা যে সময় বলিউডে সিনেমা করতে আসেন সে সময় অভিনেত্রী তো দূর, অভিনেতারাও নাম বদলেছেন। মুমতাজ জাহান হয়েছিলেন মধুবালা, মেহজাবীন বানু হয়েছিলেন মীনা কুমারী, এমনকি ইউসুফ খান হয়েছিলেন দীলিপ কুমার। কিন্তু ওয়াহিদা তার মুসলিম নাম বদলে সিনেমায় আসতে রাজি হননি। তার বক্তব্য ছিল, স্বনামেই তাকে গ্রহণ করবে ইন্ডাস্ট্রি।
ওয়াহিদার বিদ্রোহ শুরু হয় আরো আগে থেকে। ১৯৩৮ সালে তামিলনাড়ুতে জন্ম ওয়াহিদার। আবদুর রহমান ও মুমতাজ বেগমের চার কন্যার কনিষ্ঠ তিনি। তৎকালীন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির ডিস্ট্রিক্ট কমিশনার আবদুর রহমান তার চার কন্যাকেই ভারতনাট্যম শিখিয়েছিলেন। কিন্তু যে গুরুর কাছে ওয়াহিদার নাচ শেখার কথা, তিনি রাজি ছিলেন না। কথিত আছে ১১ বছর বয়সী ওয়াহিদা তর্ক করেছিলেন নাচ শেখার জন্য ধর্ম কোনো বাধা হতে পারে না।
ডাক্তার হতে চাওয়া ওয়াহিদা তার পারিবারিক দুঃসময়ে সিনেমার প্রস্তাব গ্রহণ করেন। তার যাত্রা হয়েছিল ‘আলী বাবা ও চল্লিশ চোর’ অবলম্বনে নির্মিত একটি তামিল সিনেমার পার্শ্বচরিত্র করে। তিনি প্রথম নজরে আসেন ১৯৫৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সিআইডি’র মধ্য দিয়ে। সেই থেকেই দেব আনন্দের সঙ্গে ওয়াহিদার যাত্রা। ১৯৫৮ সালে মুক্তি পায় ‘সোলভা সাল’। ১৯৫৭ সালে ‘পেয়াসা’ মুক্তি পেলেও সে সময় গোলাপ চরিত্রের মর্ম সব দর্শক বোঝেনি। সে তুলনায় রাজ খোসলা পরিচালিত ‘সোলভা সাল’ দেব আনন্দের বিপরীতে ওয়াহিদাকে দিয়েছিল লাইমলাইট আর তিনিও দেখিয়েছিলেন তার অভিনয় প্রতিভা।
বলিউডে রাজ কাপুর, দিলীপ কুমার ও দেব আনন্দকে বলা হয় ‘ত্রয়ী’। পঞ্চাশ, ষাটের দশক ছিল তাদের দখলে। এ তিন নায়কের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অভিনয় করা নায়িকার মধ্যে একমাত্র ওয়াহিদারই নাম করা যায়। রাজ কাপুরের সঙ্গে ‘এক দিল সো অফসানে’ (১৯৬৩) ও ‘তিসরি কসম’ (১৯৬৬); দিলীপ কুমারের সঙ্গে ‘রাম অউর শ্যাম’ বাদে আরো চারটি সিনেমায় ছিলেন তিনি। দেব আনন্দের কথা বলাই বাহুল্য। এর বাইরে গুরু দত্তের সিনেমায়ও অভিনয় করেছেন ওয়াহিদা, যার প্রতিটি আজ কিংবদন্তি।
একালে যেটুকুও নারীকেন্দ্রিক সিনেমা নির্মিত হয়, তখন তা হতো না। সে সময় ‘পেয়াসা’, ‘গাইড’, ‘প্রেম পুজারি’, ‘বাজি’-তে সবসময়ই ভিন্ন পথে হেঁটেছেন ওয়াহিদা রেহমান। নায়িকা হিসেবেও উজান বেয়েছেন। তাই পেয়াসা থেকে আরশিনগর, প্রতিদিনই নতুন হয়ে উঠেছেন তিনি।










