একটি ভূমিকম্প বহু মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। এমনকি বদলে দিতে পারে জনপদের ইতিহাস। ভূ-প্রাকৃতিক কারণে হয়ে থাকে ভূমিকম্প। তবে গল্পকার একে দেখতে পারেন ভিন্ন দৃষ্টিতে। সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া মাকোতো শিনকাইয়ের ‘‌সুজুমে’ সে রকমই এক ভিন্ন দৃষ্টিকোণের কথা বলে। মূলত এনিমেটির মাধ্যমে মাকোতো শিনকাই একটি ভিন্ন জগতের খোঁজ দিয়েছেন। অন্য জগৎ কিংবা বলা যায় বাস্তব ও পরাবাস্তবকে নিয়ে এসেছেন একই বিন্দুতে। এজন্য তিনি দ্বারস্থ হয়েছেন কল্পনা, পুরাণ, বিজ্ঞান ও সময়ের নানা অনুষঙ্গের কাছে। গল্পের এক মাত্রা থেকে তাকে নিয়ে গেছেন অন্য মাত্রায়।

সিনেমা শুরু হয় সুজুমেকে দিয়ে। অনাথ এ মেয়ে বেড়ে ওঠে তার খালার কাছে। তার স্বপ্নে আসে এমন কিছু বিষয়, যার অর্থ সে খুঁজে পায় না। ব্যাপারগুলো সে খোঁজে এমন নয়, কিন্তু অবচেতনে থেকেই যায়। আর সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো জেগে থেকেও সে এমন কিছু দেখে, যা অন্যরা দেখতে পায় না। ভূমিকম্পের কিছুক্ষণ আগেই সে দেখতে পায়, একটি অদ্ভুত বস্তু বা প্রাণী তার অঞ্চলের আকাশ ছেয়ে ফেলছে। এর পরপরই ভূমিকম্প শুরু হয়। সে অলীক বিষয়টি আর কারো চোখেই পড়ে না। সুজুমে সেটির পিছু নেয় ও এ সূত্রেই তার পরিচয় হয় সাওতার সঙ্গে। এখান থেকেই শুরু হয় শিনকাইয়ের অন্য দুনিয়ার গল্প।

সাওতা পারিবারিকভাবে প্রকৃতির একজন রক্ষক। গল্পে দেখা যায়, আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে আছে এমন এক দুনিয়া, যেখানে ‘‌ইভিল পাওয়ার’ কাজ করে। সে দুনিয়ার এক শক্তি নানাভাবে পৃথিবীর ক্ষতি করতে চায়। ভূমিকম্পের কারণও সেটি। আর এ শক্তিকে দেখতে পায় সুজুমে। সাওতার সঙ্গে পরিচয় হলে সে জানতে পারে এ বিষয়গুলো। ধ্বংসের সে শক্তি এ পৃথিবীর পরিত্যক্ত কিছু অঞ্চলে দরজা তৈরি করে বের হওয়ার চেষ্টা করে। সাওতা এ দরজাগুলোর রক্ষক আর এরপর সাওতার সঙ্গে জুড়ে যায় সুজুমের ভাগ্য।

মাকোতো শিনকাইয়ের অন্যান্য সিনেমার মতো সুজুমেও অন্য এক দুনিয়ার কথা বলে। সেটা শিনকাইয়ের দুনিয়া। এখানে জাপানের মানুষ ও সংস্কৃতির ছবি পাওয়া যায়। যেমন সুজুমেতে আমরা দেখি জাপানের কয়েকটি অঞ্চলের দৃশ্য। শিনকাই নিজের মতো তা তৈরি করেছেন। এর বাইরে একটি মায়াবী দুনিয়া তৈরি হয়। এবারের এনিমেতে একটি তিনপায়া চেয়ার এনেছেন মাকোতো। চেয়ারটি ছোটবেলায় সুজুমেকে তার মা দিয়েছিল। চেয়ারটিতে ঢুকে যায় সাওতার আত্মা। এরপর থেকে সুজুমে চেয়ারটি সঙ্গে করেই চলে।

জাপানি পুরাণে এক ধরনের ‘‌ডার্কনেস’ আছে। পাশাপাশি আছে ব্যাখ্যার অতীত কিছু বিষয়। সাওতার দুনিয়া রক্ষা করা, কী-স্টোন, কথা বলা বিড়াল ডাইচিন ও সুজুমের চেয়ার জাপানি পুরাণের সে ধারার একটি প্রকাশ। তবে প্রকাশটা মাকোতোর মতো। আধুনিকতার পাশে তিনি পুরাণকে রেখেছেন। আমরা দেখি সুজুমে ও তার সহপাঠীদের মোবাইলে ভূমিকম্পের সতর্কতা আসছে। আবার পাশাপাশিই দেখি অন্য পৃথিবীতে থাকা এক শয়তানি শক্তি, যা পৃথিবীকে ধ্বংস করতে চায়। আর তার পাশেই চলে আসে প্রেম। চেয়ারে পরিণত সাওতার প্রেমে পড়ে যায় সুজুমে। পুরারো রূপকথার গল্পে পাওয়া ব্যাঙ-রাজকুমার কিংবা বাংলার ঠাকুরমার ঝুলিতে পড়া রূপকথার গল্প খুঁজে পাই আমরা।

শিনকাইয়ের অন্যান্য এনিমের মতো সুজুমেরও সিনেমাটোগ্রাফি চমৎকার। এছাড়া আছে চমৎকার সংগীত আয়োজন। সুজুমের লড়াইয়ের মধ্যে একদিকে আছে প্রকৃতিকে নতুন করে দেখার আহ্বান। এর বাইরে বর্তমান সময়ের প্রযুক্তির পাশে পুরাণকে আনেন তিনি। এনিমের ক্ষেত্রে শিনকাই একসময় একাকিত্বের গল্প বলেছেন। তবে সুজুমে কোনো না কোনোভাবে ভালোবাসা ও একত্রে থাকার কথা বলে। সাওতার প্রতি সুজুমের অনুরাগ, খালার সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপড়েন মিলে এনিমেটি নতুন বার্তা দেয়। তা হলো পৃথিবীর জন্য কাজ করার আহ্বান। শেষ দৃশ্যে যে পৃথিবীর ছবি দেখান শিনকাই, তা আমাদের অতীতের কথা মনে করিয়ে দেবে। এখানেও দুই সময়কে মিলিয়েছেন শিনকাই।

সুজুমে নিয়ে শিনকাইয়ের নিজস্ব কিছু বক্তব্য আছে। মূলত জাপানে ঘটে যাওয়া ২০১২ সালের ভূমিকম্পের পর অনেক কিছু বদলে যায়। বদলে যাওয়া সে সময়কে শিনকাই নিজের মতো করে উপস্থাপন করেছেন। এর আগে ইয়োর নেম যেভাবে আলাদা দুটো ডাইমেনশন মিলিয়েছিল, সুজুমেও তা-ই করে। সুজুমের অতীতের সঙ্গে বর্তমানকে মিলিয়ে দেখান তিনি। আর এখানেই চলে আসে আবেগ, ভালোবাসা, সময়ের নৈর্ব্যক্তিক অবস্থার পরিচয়। সুজুমের গল্পটা প্রেম, পুরাণ, পৃথিবী ও প্রকৃতি ছাপিয়ে একজন ব্যক্তির গল্প হয়ে ওঠে। সুজুমের অতীত আর বর্তমান মিশে যায় এক জায়গায়।