দেশভাগের আগে-পরে পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে পশ্চিমবঙ্গে অভিবাসী হয়েছে বহু পরিবার। তারা কেউ সেখানে হয়েছে ছিন্নমূল, কেউ নিজেদের মতো গুছিয়ে নিয়েছে। আবার অনেক পরিবার পুরোটা যায়নি। কেউ ছেলেকে পড়তে পাঠিয়েছে, কেউ মেয়েকে পাঠিয়েছে বিয়ে দিয়ে। এমনই এক মেয়ে ইন্দুবালা। খুলনার কলাপোতা থেকে তার স্থান হয়েছিল কলকাতার ১৪/২ ছেনু মিত্তির লেনে। মাতাল, জুয়াড়ি স্বামী আর সাবেকী দজ্জাল শাশুড়িকে পার করে নিজের পরিচয় একদিন সে তুলে ধরেছিল। দাদি ও মায়ের কাছে শেখা রান্না খাইয়ে মুগ্ধ করেছিল বহু মানুষকে। তৈরি হয়েছিল ইন্দুবালা ভাতের হোটেল। আবেগ, ঐতিহ্য, ইচ্ছে, আত্মসম্মানের বহু গল্প নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সেটি।

কল্লোল লাহিড়ীর বেস্টসেলার উপন্যাস ইন্দুবালা ভাতের হোটেল। নামে বিভূতিভূষণের বইয়ের ছাপ ও দুই বাংলার মানুষের গল্প থাকার কারণে দ্রুতই মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। প্রকাশ হওয়ার পর অনেকগুলো মুদ্রণ হয়েছে। আলাদাভাবে বাংলাদেশ থেকেও প্রকাশ হয়েছে বইটি। এরপর সে বই থেকেই দেবালয় ভট্টাচার্য নির্মাণ করেছেন আট পর্বের ওয়েব সিরিজ। ইন্দুবালার চরিত্রে অভিনয় করেছেন শুভশ্রী গাঙ্গুলি। ট্রেলার প্রকাশের পর থেকেই এ নিয়ে ছিল দুই বাংলার দর্শকের তুমুল আগ্রহ। প্রথমত বেস্টসেলার বই থেকে সিরিজ, অন্যদিকে শুভশ্রী অভিনয় করছেন এক বৃদ্ধার চরিত্রে। পুরো বিষয়টিই দর্শককে আকর্ষণ করেছিল বিশেষভাবে।

এ সিরিজের অন্যতম বিশেষ জায়গা এর গল্প। আদর্শ হিন্দু হোটেলের তুলনায় এখানে ব্যাপার কিছু আলাদা। বইয়ের তুলনায় সিরিজ আরো আলাদা। পুরো সিরিজ দেখে সহজেই বোঝা যায় দর্শককে আবেগমথিত করার সব চেষ্টাই এখানে ছিল। প্রথমত খুলনার গল্পটি ইন্দুর স্মৃতিতে আনা। এরপর সমান্তরালে কলকাতায় তার জীবন দেখানো। একটা স্মৃতিতে সজীব, অন্যটি বাস্তবতার কষাঘাতে পর্যুদস্ত। প্রথমত ইন্দুবালার সরল বাবা তাকে বনেদি ঘর দেখে বিয়ে দেয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ইন্দুর স্বামিটি মাতাল। বাজারে তার বহু দেনা। বাড়িতে হাড়ির হাল। অন্তঃসত্ত্বা হলেও সব কাজ ইন্দুবালার, শাশুড়ি কিছু করেন না। আবার বনেদি বাড়ির হাড়ির হাল হলেও ইন্দু তার বাড়ি থেকে চন্দ্রপুলি আনলে তা নিয়ে হেয় করে ইন্দুর শাশুড়ি। অথচ চন্দ্রপুলি সে বানাতে শিখেছিল তার পিতামহীর কাছ থেকে। ইন্দুর কাছে তা বিশেষ।

এ গল্পে ইন্দুর ভাতের হোটেল খোলার ব্যাপারটি হঠাৎ একটি সূত্র ধরে। বাড়িতে পাওনাদারদের উৎপাত হলে দেহাতি মাছওয়ালি লছমি তাদের তাড়ায়। আর বাড়ি ফেরার আগে খেতে চায় ইন্দুবালার হাতে। ইন্দু যত্ন করে খাওয়ায়। খাওয়া বাবদ ইন্দুকে সে টাকাও দেয়। সেই থেকেই শুরু। লছমি মাঝে মাঝেই দুপুরের খাবারটা ইন্দুর হাতে খায়। কখনো নিয়ে আসে তাজা মাছ। ধীরে ধীরে আরো দুয়েকজন খদ্দের আসে। শুরু হয় ইন্দুবালার ভাতের হোটেল। মা ও দাদির কাছে শেখা রান্না সে যত্নের সঙ্গে করে। কচুর ভর্তা, বেগুন ভাজা, পারসে মাছ, বিশেষ সময়ে পাঁঠার মাংস, চন্দ্রপুলি তৈরি করে। থাকে আমের আচার। লোকে চেটেপুটে খেয়ে যায়।

সিরিজের গল্পটা শুরু হয় একালের এক তরুণীকে দিয়ে। ভ্লগ করার ইচ্ছা ও ইন্দুবালার হোটেলে খাওয়ার জন্য সে আসে। এরপর ইন্দুর সঙ্গে তার দাদি-নাতনির সম্পর্ক হয়ে যায়। সেখান থেকেই দেবালয় ভট্টাচার্য কয়েকটি টাইমলাইনে পুরো গল্পটা দেখিয়েছেন। কখনো ইন্দুর ছোট বাড়ি, কখনো তার কলাপোতার বাড়ি ও বিস্তৃত ধানী জমি, মনিরুলের সঙ্গে তার কিশোরী বেলার ভালো লাগা, দাদির কাছে রান্নার প্রথম পাঠ—সবকিছুই সমান্তরালে এসেছে। এর সঙ্গে আছে দেশভাগ। সেখানেই শেষ হয় না। আসে নকশাল আন্দোলন। ৪৭ থেকে সত্তরের দশক পর্যন্ত সময় এসেছে। জায়গাটা কিছুটা আরোপিত লাগে। সময় ও গল্পের বিস্তৃতি না থাকায় এমনটা হয়। বিশেষত মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি না এলেও হতো মনে হয়। কিন্তু ইন্দু বারবার তার কলাপোতার কথা মনে করে, বাংলাদেশকে দেশ মনে করে বলে বিষয়টা অবশ্য এসেই যায়।

ইন্দুবালা ভাতের হোটেলে এমন কিছু বিষয় আছে, যা এ প্রজন্মের কাছে পৌঁছনো প্রয়োজন ছিল। যেমন বিভিন্ন ধরনের খাবার যার নাম আমরা ভুলে গেছি। দ্বিতীয়ত সংস্কৃতি, ব্রতকথার বিষয়গুলোকে নতুন করে পরিচয় করানো দরকার ছিল। যেমন ইন্দুবালা ভাতের হাড়িতে চাল দিয়ে সবার ভাত জোটার প্রার্থনা করে। রান্নার আগে পূজা করার বিষয়গুলো এখন আর নেই. পুরনো সে কথাগুলো এ সিরিজ মনে করিয়ে দেয়। এর বাইরে গল্পটি নারীশক্তির প্রকাশক। ইন্দু, লছমি নিজেদের লড়াই নিজেরা করে। ইন্দু একসময় যুক্ত হয় নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে। সে থামে না। 

সিরিজটির শুটিং হয়েছে খুব অল্প জায়গায়। ইন্দুর বাড়ি, কলাপোতা দেখাতে একটা মাঠ ঘুরে ফিরে আসে। কাজটায় হইচই আরো বড় পরিসরে করতে পারত। করা উচিত ছিল। তবে এ সিরিজে পুরনো কিছু সিনেমার রেফারেন্স আনা হয়েছে। প্রথমত তরুণ মজুমদারের ‘‌নিমন্ত্রণ’ থেকে দৃশ্যই দেখানো হয়েছে। এছাড়া মনিরুলের সঙ্গে কাশবনে তার বেড়ানোও নিমন্ত্রণ অনুসরণ করে। রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল ইসলাম ও অতুলপ্রসাদের গান ব্যবহারের পাশাপাশি অনুপ্রেরণা নেয়া হয়েছে ঋত্বিক ঘটকের ‘‌সুবর্ণরেখা’ থেকেও। দেহতরী গানটি এ সিনেমায় ছিল। সেটা কাকতাল নয়। ইন্দু কোনো না কোনোভাবে নতুন বাড়ি খোঁজে, খোঁজে তার সন্তানরাও। সুবর্ণরেখা পুরোটাই ছিল ঘর খোঁজার যাত্রা।

ইন্দুবালার ঘরে ফেরা হয় না। পাসপোর্ট নিয়ে ট্যুরিস্টের মতো সে নিজের দেশে ফিরতে চায় না। ব্যাকগ্রাউন্ডে ‘‌পাখিদের স্মৃতি’, ‘‌দেহতরী’ বারবার সেটাই বোঝায় যে ইন্দুর আসলে ফেরা হবে না। কলাপোতা তার স্মৃতিতেই থাকে। আর এ সিরিজে ইন্দুর গল্পে মিশে থাকে কলাপোতার বহু গল্প।