দেশীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মানবিক মূল্যবোধ তুলে ধরা, নতুন নির্মাতা ও প্রতিভা উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ১৯৭৬-৭৭ সাল থেকে শুরু হয় চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারি অনুদান। পাঁচ দশক আগে থেকে শুরু হওয়া চলচ্চিত্রে সরকারি অনুদান নিয়ে আজও রয়েছে নানা প্রশ্ন, অভিযোগ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ অনুদান ব্যবস্থার কার্যকারিতা, স্বচ্ছতা ও সাফল্য নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

নেই মানসম্মত সিনেমা

অনুদান দেয়ার নীতিমালাকে অবজ্ঞা করে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় অনেকেই পাচ্ছেন সরকারি অনুদান। এবার ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩২টি চলচ্চিত্র নির্মাণে ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে—এর মধ্যে ১২টি পূর্ণদৈর্ঘ্য ও ২০টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ১৯৭৬ সাল থেকে শুরু করে গত ৫০ বছরে সরকারি তহবিল থেকে প্রায় ১৫০-২০০ কোটি টাকা চলচ্চিত্র অনুদানে ব্যয় হয়েছে। এ সময় সরকারি অনুদানে নির্মিত চলচ্চিত্রের সংখ্যা প্রায় ৪০০। প্রশ্ন হলো দীর্ঘ সময়ে এ ৪০০ সিনেমার মধ্যে কতটি সিনেমা আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে তৈরি হয়েছে? বরং প্রায় প্রতিটি সিনেমাই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তো দূরের কথা দেশেও খোঁজ মেলে না। এত বিপুল অর্থ ও প্রচেষ্টার পরও সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের মধ্যে মাত্র চারটি আন্তর্জাতিকভাবে উল্লেখযোগ্য পুরস্কার বা স্বীকৃতি পেয়েছে—যেমন ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ (মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, ১৯৮০), ‘গাড়িওয়ালা’ (শিকাগো আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব, ২০১৪), ‘মাটির প্রজার দেশে’ (বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, ২০১৮) ও ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ (কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, ২০১৩)। সাফল্যের হার মাত্র ১ শতাংশ—যা শিল্পের মান ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা প্রকাশ করে। ৫০ বছরে ৪০০ সিনেমা থেকে মাত্র চারটি সিনেমা সাফল্য অনুদান প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

অনুদান বিতরণ নিয়ে নানা অভিযোগ

চলচ্চিত্রের জন্য অনুদান নিয়ে শুরু থেকে সমালোচনা হয়ে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেকে রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত বা প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে অনুদান পান, যাদের প্রকৃত যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতা নেই। অনেক নির্মাতা অনুদানের টাকা নিয়ে বছরের পর বছর সিনেমা শেষ করেন না, নিম্নমানের কাজ জমা দেন না বা বাজেটের বড় অংশ আত্মসাৎ করেন। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং দুর্বল, শর্ত ভঙ্গ করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয় না। বছরের পর বছর চলে গেলেও সিনেমা নির্মাণের খোঁজ থাকে না।

এ সমস্যা রোধে যা করণীয়

জাতীয় চলচ্চিত্র অনুদানে স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্রের সংখ্যা ক্রমে কমছে এবং বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে, যা অনুদান নীতিমালায় বর্ণিত ‘মানবীয় মূল্যবোধসম্পন্ন জীবনমুখী, রুচিশীল ও শিল্পমানসমৃদ্ধ’ চলচ্চিত্র নির্মাণে পৃষ্ঠপোষকতাবিরোধী। জাতীয় চলচ্চিত্র অনুদানে স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্রকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রের জন্য পৃথক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

নির্মাতার ওপর অপ্রয়োজনীয় বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেয়া যাবে না। যেহেতু এফডিসির বাইরেও কারিগরি সহায়তার সুযোগ আছে, তাই এফডিসির কারিগরি সরঞ্জাম ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা লোপ করতে হবে।

এছাড়া এফডিসি ও অন্য কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন পরিচালক সমিতি ও প্রযোজক সমিতি প্রভৃতির ছাড়পত্র গ্রহণের বাধ্যবাধকতা লোপ করতে হবে। চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়ায় নির্মাতাকে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা দিতে হবে। নির্মিত চলচ্চিত্র সিনেমা হলে মুক্তির দায় প্রযোজককে না দিয়ে চলচ্চিত্রের প্রদর্শনের ব্যাপারে সরকারকেই উদ্যোগী হতে হবে। অনুদান দেয়ার জন্য স্বতন্ত্র বোর্ড বা দপ্তর গঠন করে বাছাই কমিটি, অনুদান কমিটি ও প্রিভিউ কমিটিতে যোগ্য ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত ও এ প্রক্রিয়াগুলোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। অনুদানের টাকা অপচয় এবং মানহীন চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য দায়ী—অনুদান কমিটির অস্বচ্ছতা, দুর্বল মনিটরিং, রাজনৈতিক প্রভাব ও নির্মাতাদের অনিয়ম, এক্ষেত্রে কার্যকর জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও কঠোর মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।