মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কৃষিপণ্য উৎপাদন করেন কৃষক। কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনার নানা ত্রুটির কারণে প্রায়ই সেই উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে তারা বঞ্চিত হন। কখনো আবার উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করে হতে হয় সর্বস্বান্ত। আবার চিনিকল ছাড়া দেশে আর কোনো ভারী কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পও নেই, যেখানে কৃষক তার উৎপাদিত পণ্য সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করতে পারেন। আখের ওপর ভিত্তি করেই দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে গড়ে ওঠে বেশ কয়েকটি চিনিকল। তবে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে সেগুলোও আজ ধুঁকছে। একে একে বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে চিনিকলগুলোর কার্যক্রম।
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) নিয়ন্ত্রণে ১৬টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে লোকসান কমাতে বন্ধ রাখা হয়েছে ছয়টি চিনিকলের আখ মাড়াই। এর পরও চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত সংস্থাটির দায়দেনা দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে কেবল সুদ বাবদই পাওনা আড়াই হাজার কোটি টাকা। এখন ঘুরে দাঁড়াতে সুদের সেই টাকা মওকুফ চাইছে সংস্থাটি। শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির এক বৈঠকে সম্প্রতি এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে বিএসএফআইসি একটি প্রতিবেদন দেয়, যেখানে সংস্থাটির বর্তমান চিত্র তুলে ধরে লোকসান থেকে বেরিয়ে আসতে বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৮৬ সালের সরকারি করপোরেশন (ব্যবস্থাপনা সমন্বয়) অধ্যাদেশের ১১ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো করপোরেশন লোকসানের সম্মুখীন হলে তা সরকারের প্রতিপূরণের বিধান রয়েছে। তবে বিএসএফআইসি সময়মতো লোকসানের প্রতিপূরণ না পাওয়ায় ব্যাংক থেকে উচ্চসুদে ঋণ নিয়ে চলতে হয়েছে।
ফলে ক্রমাগত ঋণের সুদ বেড়ে যাওয়ায় বৃদ্ধি পেয়েছে উৎপাদন খরচ ও লোকসান।
প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে বিএসএফআইসির লোকসানের বিভিন্ন কারণ। বলা হয়েছে, আখ ও চিনির মূল্য সরকার নির্ধারণ করে দেয়। অথচ অনেক সময় বাজারের চাহিদা ও ভোক্তাদের বিষয় বিবেচনা করে চিনির দাম কমানোর প্রয়োজন পড়ে, কিন্তু আখের মূল্য স্থির থাকে। ফলে চিনির উৎপাদন খরচের তুলনায় বিক্রয় মূল্য কম হওয়ায় লোকসান গুনতে হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রতি কেজি চিনির সুদ ব্যতীত উৎপাদন ব্যয় ছিল ১১৯ টাকা এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ১৪৯ টাকা। অথচ সরকার প্রতি কেজি চিনির বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল ৭৫ টাকা। এছাড়া অধিক চিনিসমৃদ্ধ, পোকা ও রোগবালাই প্রতিরোধ সক্ষম আখের জাত উদ্ভাবন না হওয়া, অনুন্নত আখের জাত, দক্ষ জনবলের অভাব এবং শ্রমনির্ভর কারখানা হওয়ায় চিনি উৎপাদন কমেছে। এগুলোকেও লোকসানের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
এদিকে লোকসান কাটিয়ে উঠতে ট্রেড গ্যাপ ও ভর্তুকি বাবদ সরকারের কাছে বিএসএফআইসির প্রাপ্য ৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ছাড় ও মঞ্জুরীকরণের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া আখচাষীদের ঋণ হিসেবে সার, বীজ, কীটনাশক ও উপকরণ বিতরণ এবং আখের মূল্য নিয়মিত পরিশোধের জন্য সংস্থার অনুকূলে বার্ষিক ৩০০ কোটি টাকার রিভলভিং ফান্ড দেয়ারও অনুরোধ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে ঋণের সব সুদ মওকুফ চেয়েছে সংস্থাটি। এতে চিনি উৎপাদন ব্যয় ব্যাপকভাবে কমবে বলে আশা প্রকাশ করছে বিএসএফআইসি কর্তৃপক্ষ।
চিনি শিল্পের সার্বিক বিষয় নিয়ে সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও আলোচনা হয়। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকিয়া সুলতানা কমিটিকে জানান, বিএসএফআইসির ২০২০-২১ অর্থবছরে সুদসহ লোকসানের পরিমাণ ১ হাজার ৩৫ কোটি টাকার মতো। সুদ বাদে ৩৭০ কোটি টাকা। আর পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ ৮ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। ২০২২ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দায়দেনার পরিমাণ ৯ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা, যেখানে সুদ ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
শিল্প সচিব বলেন, দাম বাড়াতে পারলে কৃষকরা আখ চাষে আগ্রহী হবেন। এর বাইরেও কয়েকটি নতুন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তার মধ্যে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোং আমাদের পাঁচটি সুগার মিলে গিয়েছে। তারা পাইলটিং করে দিচ্ছে। জমি সিলেকশন, চারা রোপণ, পরিচর্যাসহ সব বিষয়ে তারা এক বছরের জন্য ‘বন্ধু সেবা’ নামে একটা অ্যাপস করে দিয়েছে। কখন জমিতে সেচ দিতে হবে, কখন সার প্রয়োগ করতে হবে সেই অ্যাপসের মাধ্যমে এসব বিষয়ে পরামর্শ মিলছে। এ পর্যন্ত ৩৫ হাজার চাষীকে অ্যাপসের মাধ্যমে মেসেজ দেয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে চিনি শিল্প ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে জানিয়ে জাকিয়া সুলতানা বলেন, বর্তমানে প্রতি একরে ৪০-৫০ টন আখ মাড়াই করা যাবে বলে আশা করা যায়। এ বছর চাষের জমিও বেড়েছে। উৎপাদন বাড়াতে কর্মকর্তারা সবাই চাষীদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলছেন, তাদের খোঁজখবর নিচ্ছেন। প্রতিদিনই কেউ না কেউ মাঠে থাকছেন ও মনিটরিং করছেন। এগুলো বাস্তবায়ন করা হলে সুগার ইন্ডাস্ট্রি আবার ঘুরে দাঁড়াবে।
শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি আমির হোসেন আমু বলেন, বাজারে চিনির চাহিদা পূরণে এবং আখ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে আখের দাম বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যায়। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করা হবে।










