অপরাধী তার কৃতকর্মের সাজা ভোগের পাশাপাশি যাতে সংশোধন হতে পারেন, কারাগারে নেয়া হয় তেমনি নানা কার্যক্রম। তবে এক মাসের ব্যবধানে দুই বন্দির পলায়নের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে এর ভিন্ন চিত্র। সংশোধনের পরিবর্তে নতুন করে অপরাধে সম্পৃক্ত হচ্ছেন তারা। পালিয়ে যাওয়া দুই বন্দির মধ্যে একজনকে ১০ ঘণ্টার ব্যবধানে আটক করা গেলেও অন্যজন এখনো লাপাত্তা। একের পর এক বন্দি পলায়নের ঘটনায় বন্দি সংশোধনাগার কর্মসূচিতে কারা কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনি কারানিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার বিষয়টিও উঠে আসছে।

কারা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বন্দিদের সংশোধনের জন্য কারা অভ্যন্তরে ধর্মীয় চর্চা থেকে শুরু করে বই পড়ার ব্যবস্থা এমনকি সাংস্কৃতিক চর্চার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। পাশাপাশি বন্দি জীবনে তাদের আয়ের পথ দেখাতে কারা অভ্যন্তরে গড়ে তোলা হয়েছে নানামুখী শিল্প। ছাপাখানার কাজ শেষে শুরু করে তৈরি পোশাক উৎপাদনের মতো কাজেরও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে বন্দিদের জন্য।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্দিদের সংশোধনের জন্য কেবল এ কর্মসূচিগুলোই যথেষ্ট নয়। কারণ হিসেবে তারা বলছেন কারাগারে কয়েদি কতটা সংশোধিত হয়—কাশিমপুর কারাগারের পর মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে বন্দি পলায়ন ফের সেই প্রশ্নই উত্থাপন করেছে। তাছাড়া দেশের কারাগারগুলোর সুরক্ষা ব্যবস্থা যথাযথ করার ক্ষেত্রে যে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে, কাশিমপুরের ঘটনাটি ফের তা প্রমাণ করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কারাগার বা সংশোধনাগার। তবে আমাদের দেশের কারাগারগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। কারাগারের ধারণাটা কিন্তু এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। উন্নত দেশগুলোতে এখন আর কারাগার শব্দটি ব্যবহার হয় না, বলা হয় সংশোধনাগার। সাজা ভোগের পাশাপাশি বন্দিদের সংশোধনের জন্য কিছু কর্মসূচিও গ্রহণ করতে হয়। আমাদের এখানে যেসব কর্মসূচি নেয়া হয়েছে, তা খুবই পুরনো দিনের। বন্দিদের মনস্তাত্ত্বিক মটিভেশনের কিছু কর্মসূচি নিতে হবে। পাশাপাশি কারাগারের পরিবেশেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। কারাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পরামর্শও দেন তিনি।

কারা কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, টাঙ্গাইলের গোপালপুর থানার মাদক মামলার আসামি মিন্টু মিয়া (২৮) শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে শুক্রবার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি হন। কারা পাহারায় থাকা অবস্থায় ভোররাতে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যান মিন্টু। সে সময় তার পাহারার দায়িত্বে ছিলেন কারারক্ষী আব্দুল আলীম ও কামরুল ইসলাম। কারারক্ষীদের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন সহকারী প্রধান কারারক্ষী মোবারক মিয়া। কারারক্ষী পাহারায় থাকার পরও মিন্টুর পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কারাধ্যক্ষ মাহবুবুল ইসলাম। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে পালিয়ে যাওয়া কারাবন্দি মিন্টুর সন্ধান পেতে গোয়েন্দা তত্পরতা বৃদ্ধি করে কারা কর্তৃপক্ষ। মিন্টুর গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হাট বাইয়ান গ্রামে। তিনি পালিয়ে যাওয়ার পরপরই তার বাড়িতে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে কারা কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি গাজীপুরে মিন্টুর শ্বশুরবাড়িতেও গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়। পালিয়ে যাওয়ার ১০ ঘণ্টার মাথায় রাজধানীর বাবুবাজার ব্রিজ এলাকা থেকে মিন্টুকে আটক করা হয়। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় একটি মামলাও দায়ের করেছে কারা কর্তৃপক্ষ।

মিটফোর্ড হাসপাতালে কারা পাহারায় থাকা অবস্থায় বন্দি পালিয়ে যাওয়ার ২৩ দিন আগে অর্থাৎ ৬ আগস্ট আরেক সাজাপ্রাপ্ত কারাবন্দি পালিয়ে যান।

তিনি কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার থেকে নিজের বানানো মই দিয়ে কারারক্ষীদের সামনেই ১৮ ফুট উঁচু দেয়াল পার হয়ে পালিয়ে যান। এখন পর্যন্ত ওই বন্দির কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় কারা কর্তৃপক্ষের গঠিত তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে কারারক্ষীদের দায়িত্বে অবহেলার দৃশ্য।

সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, ৪২ জন কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাক্ষ্য ও অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করে কারা কর্তৃপক্ষের তৈরি করা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কারারক্ষীদের দায়িত্বে অবহেলার দৃশ্য। তদন্ত কমিটির সদস্যরা গত ৮ ও ১৩ আগস্ট কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার পরিদর্শন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদনটি জমা দেয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, কাজের জন্য বানানো মই দিয়েই কারাগারের প্রধান ফটক অতিক্রম করে পালিয়েছেন ওই বন্দি। কারাগারের ভেতরে ইলেকট্রিক্যাল ও বিভিন্ন কাজের জন্য মই ব্যবহার করা হয়ে থাকে। নিয়ম হলো কাজের পর মই খুলে প্রধান কারারক্ষীর তত্ত্বাবধানে স্টোররুমে তালা দিয়ে রাখা। কিন্তু ঘটনার দিন স্টোররুমের তালা না থাকায় সেখান থেকে মইটি নিয়ে পালিয়ে যান বন্দি।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, জেল সুপার ও জেলার যদি কারা অভ্যন্তরে আরো তদারকি করতেন এবং ডেপুটি জেলাররা যদি তাদের নির্দিষ্ট এলাকাগুলো নিয়মিত ঘুরতেন এবং কারারক্ষীরাও যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতেন, তাহলে বন্দি পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতেন না। এ ঘটনার জন্য কাশিমপুর কারাগারের জেলসুপারসহ মোট ২৫ জনকে দায়ী করা হয়। দায়ীদের বিরুদ্ধে কারাবিধি ও সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়।

তবে দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কারারক্ষীদের বিরুদ্ধে বরাবরই কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে দাবি কারা কর্মকর্তাদের। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মাহবুবুল ইসলাম জানান, মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে বন্দি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় সহকারী প্রধান কারারক্ষী মোবারক মিয়া, কারারক্ষী আব্দুল আলীম ও কামরুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অনুসন্ধানে দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধে স্থায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি কাশিমপুর কারাগার থেকে বন্দি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন এ কারা কর্মকর্তা।