টিউশনসহ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের শিক্ষার্থী ফি যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে চায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা দেয়ার জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। ইউজিসির সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেশের সার্বিক উচ্চশিক্ষা খাত নিয়েই ২০টি সুপারিশ করা হয়েছে। এসব সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদনটি আজই রাষ্ট্রপতির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হবে।

শিক্ষার্থী ফি বিষয়ে কমিশনের ৪৭তম বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভর্তি ও টিউশন ফি এবং শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বিষয়ে ভিন্নতা ও অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের ট্রান্সক্রিপ্ট, সার্টিফিকেট ও প্রশংসাপত্র ইত্যাদি সরবরাহ করার ক্ষেত্রেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চহারে ফি নিয়ে থাকে। এমনকি কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই প্রতি বছর টিউশন ও ভর্তিসহ অন্যান্য ফি বাড়ানোর অভিযোগও পাওয়া যায়। যেহেতু দেশের সব অঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস্থা সমান নয়, সেহেতু শিক্ষার্থীদের প্রদেয় বিভিন্ন ফি ও চার্জ একটি যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নির্দেশনা দিতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ বণিক বার্তাকে বলেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি নেয়ার ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নানা অসামঞ্জস্যতা দেখা যায়। সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্ধারিত নির্দেশনা না থাকার সুযোগে তারা নিজেদের ইচ্ছামতো ফি নির্ধারণ করছে। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের মোটা অংকের অর্থ ব্যাংকে পড়ে রয়েছে। তার মানে তারা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি হারে ফি আদায় করছে। আবার কিছু বিশ্ববিদ্যালয় টিউশন ফির বাইরেও বিভিন্ন খাতে মোটা অংকের ফি নির্ধারণ করছে। তাই কমিশন চায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফির বিষয়টি যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসা হোক।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্থিক অনিয়ম বন্ধে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে চায় ইউজিসি। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারের আর্থিক বিধি-বিধান অনুসরণ করা জরুরি। ইচ্ছামতো আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারের বিদ্যমান আর্থিক নিয়মাবলির ব্যত্যয় ঘটছে বলে কমিশনের নজরে এসেছে। আর্থিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন সমুন্নত রেখে একটি ‘সমন্বিত আর্থিক নীতিমালা ও ম্যানুয়াল’ প্রণয়নের জন্য ইউজিসি কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. আবু তাহের বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা চাই দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিক বিধি-বিধান মেনে চলুক। তবে অনেক সময় বাজেট বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন অনিয়ম উঠে আসে। একই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় হলেও একেক জায়গায় একেক নিয়ম অনুসরণ করতেও দেখা যায়। তাই আমরা একটি নীতিমালা ও ম্যানুয়াল প্রণয়নের সুপারিশ করেছি।

ইউজিসির প্রতিবেদনে বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান উন্নয়ন করতে একটি নীতিমালা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কমিশন, সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগ ও কার্যক্রম গ্রহণ করা অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে বৈশ্বিক র্যাংকিং নির্ধারণী সূচকের সঙ্গে সংগতি রেখে নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

প্রতিবেদনে দেশের পাবলিক-প্রাইভেট—সব বিশ্ববিদ্যালয়েই চলমান সন্ধ্যাকালীন, এক্সিকিউটিভ ও উইকেন্ড কোর্স বন্ধের সুপারিশ করেছে কমিশন। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের কোর্স পরিচালনা করা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশিষ্ট্য ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। এ কারণে সন্ধ্যাকালীন, এক্সিবিউটিভ ও উইকেন্ড জাতীয় সব কোর্স বন্ধ হওয়া জরুরি।

প্রতিবেদনে গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে ইউজিসি বলেছে, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির ঘটনা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ নিয়ে কোনো নীতিমালা না থাকায় গবেষণাপত্রে চুরির বিষয়টি সংজ্ঞায়িত হচ্ছে না। তাই প্লাজিয়ারিজম (চৌর্যবৃত্তি) বিষয়ক সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করা আবশ্যক।

গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর সুপারিশ করে ইউজিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে সরকারি বরাদ্দ জাতীয় বাজেটের মাত্র দশমিক ৮৭ শতাংশ, যা যেকোনো বিচারেই অপ্রতুল। কাজেই জাতীয় বাজেটে উচ্চশিক্ষায় খাতওয়ারি বরাদ্দ চিহ্নিত করে কমিশনের চাহিদামাফিক অর্থ সংস্থানের জন্য সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। এছাড়া সরকার অনুমোদিত স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ফর হায়ার এডুকেশন ইন বাংলাদেশ: ২০১৮-২০৩০ (এসপিএইচই ২০১৮-২০৩০) অনুযায়ী, ২০২২ সালের মধ্যে উচ্চশিক্ষা খাতে জাতীয় বাজেটের ২ শতাংশ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৬ শতাংশ বরাদ্দ রাখার বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

অস্তিত্বহীন বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাসের বিষয়টিকেও ইউজিসি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে। এতে বলা হয়েছে, অস্তিত্বহীন বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাসে ব্যাচেলর, মাস্টার্স, এমফিল এমনকি পিএইচডি পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তির খবর প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। সাময়িক অনুমতিপত্র বা সনদপত্র গ্রহণ ছাড়া বাংলাদেশে কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন বা পরিচালনা সম্পূর্ণ অবৈধ। গুণগত উচ্চশিক্ষার প্রসারে সীমিত পরিসরে স্বনামধন্য বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অবকাঠামোগত ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধাসহ শাখা অফশোর ক্যাম্পাস স্থাপন ও পরিচালনার অনুমতি দেয়া যেতে পারে। তবে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস স্থাপন ও পরিচালনার পাশাপাশি নিয়মিত তদারকির জন্য বিদ্যমান বিধিমালা ‘বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানের শাখা ক্যাম্পাস বা স্টাডি সেন্টার পরিচালনা বিধিমালা, ২০১৪’ সংশোধন করা প্রয়োজন। কারণ বিধিমালাটি ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, ২০১০’-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি দেশের বেসরকারি পর্যায়ে ক্রমবিকাশমান উচ্চশিক্ষা খাতে ব্যাপক উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠার সৃষ্টি করতে পারে। এ বিষয়ে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।

এছাড়া উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে ইউনিভার্সিটি টিচার্স ট্রেনিং একাডেমি, সেন্ট্রাল রিসোর্স ল্যাবরেটরি ও ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেছে কমিশন।