বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারের পর গত বছর ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ছয়টি অবৈধ ইটভাটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। কিন্তু কয়েক মাস পার হতেই প্রভাবশালী মহল পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পুনরায় চালু করেছে এসব অবৈধ ইটভাটা। শুধু ড্রামশিটের চিমনি দাঁড় করিয়ে হাজার হাজার টন কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। ফসলি জমির মাটি ও ভাটাসংলগ্ন সরকারি খালের মাটি দিয়ে ভাটাগুলোয় তৈরি হচ্ছে ইট।

চরফ্যাশন উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা দক্ষিণ আইচার মানিকা, হাজারীগঞ্জ, চরকলমী, আবদুল্লাহপুর, রসুলপুর, নীলকোমল ও ঘোষেরহাটসহ মাদ্রাজ ইউনিয়নে রয়েছে এ ভাটাগুলো। প্রতিটি ভাটায় রয়েছে গাছ কাটার স মিল। এ স মিলে হাজার, হাজার মণ গাছের গুঁড়ি কেটে চলছে ইট পোড়ানোর কার্যক্রম। এলাকাবাসী রয়েছেন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। একইভাবে হুমকিতে পড়েছে পরিবেশ।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, উপজেলার আবদুল্লাহপুর ইউনিয়নে অবস্থিত মাইসা-২ নামের ইটভাটায় বাংলা চিমনি ব্যবহার করে জ্বালানি কাঠ দিয়ে ইট পোড়ানোর কাজ চলছে। শত শত শ্রমিক কাজ করছেন ভাটায়। সামনে থাকা ভাটার স মিলে কেউ কেউ গাছের গুঁড়ি কেটে লাকড়ি তৈরি করছেন। কেউ আবার ইট পোড়ানোর চুল্লিতে লাকড়ি দিচ্ছেন। প্রতিটি শ্রমিকই চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন ভাটায়। 

স্থানীয়রা বলছেন, ফসলি জমিতে অবৈধভাবে ড্রামচিমনি ব্যবহার করে লাকড়ি দিয়ে ইট পোড়ানো হচ্ছে। অবৈধ ভাটার কালো ধোঁয়ায় আশপাশের জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ভাটার পাশের বাসিন্দা আহসান হাবিব, কামাল, হারুনসহ অনেকে জানান, গত বছর প্রশাসনের লোকজন এসে ভাটাটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। কয়েক মাস যেতেই এ মৌসুমের শুরুতেই এটি আবার আগের মতোই বাংলা চুঙ্গি তৈরি করে শুরু করেছে ইট পোড়ানোর কাজ।

ভাটামালিক আবু সায়েম জানান, বর্তমানে আধুনিক একটি ইটভাটা তৈরি করতে অনেক টাকা খরচ হয়। তাই বাংলা পদ্ধতিতে কয়েক বছর ব্যবহার করে ধীরে ধীরে আধুনিক ভাটা নির্মাণ করব।

উপজেলার নুরাবাদ ইউনিয়নের বাংলাবাজার এলাকায় রয়েছে আমান ব্রিকস। ভাটামালিক স্থানীয় সরকার দলীয় এক প্রভাশালী নেতা। দীর্ঘদিন বাংলা চুল্লি ব্যবহার করে ভাটাটি পরিচালিত হয়ে এলেও ওই ভাটায় প্রশাসনের কারো পা পড়েনি বলে জানান স্থানীয়রা।

বাংলাবাজার এলাকার বাসিন্দা কৃষক জামাল হোসেন বলেন, অনেক বছর অবৈধভাবে চলছে এ ইটভাটা। প্রতি মৌসুমেই কয়েক হাজার মণ লাকড়ি পোড়ানো হয় এ ভাটায়। কিন্তু আজ পর্যন্ত প্রশাসনের কাউকে এসে এ ভাটায় কোনো ধরনের অভিযান চালাতে দেখা যায়নি। কৃষক লতিফ মিয়া বলেন, অবৈধ ইটভাটার কারণে আমার ছয় একর জমিতে কোনো ফসল ফলাতে পারি না।

অন্যদিকে কলমী ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের চর-মঙ্গল মৌজায় প্রায় পাঁচ একর সরকারি জমি সাধারণ মানুষ বন্দোবস্ত নিয়ে বসবাস করে আসছে। মানুষের ভোগদখলীয় ফসলি জমি নষ্ট করে আবাসিক এলাকায় ড্রামশিট চিমনি দ্বারা লাকড়ি পুড়িয়ে পরিচালিত হচ্ছে রিফাত ব্রিকস নামের একটি ভাটা। গেল বছর এ ভাটা হাজার হেক্টর জমির ফসলি খেত, বনজ ও ফলদ বাগান নষ্ট করে দিয়েছে। ভাটার আশপাশে রয়েছে শতাধিক বসতবাড়ি। ভাটার কালো ধোঁয়ায় কয়েক বছর ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছেন এসব বাড়ির বাসিন্দা। তারা জানান, গত বছর প্রশাসন অভিযান চালিয়ে এ ভাটা ভেঙে দিলেও এ বছর তা আবার তৈরি করেছে প্রভাবশালী মহল।

একইভাবে চরকলমী সেতুসংলগ্ন মাওয়া ব্রিকস নামক অবৈধ ইটভাটায়ও দেখা যায় বাংলা চিমনি ব্যবহার করে চলছে ইট পোড়ানোর কাজ। গেল বছর পরিবেশ অধিদপ্তরের টিম এসে এ ভাটায় অভিযান চালিয়ে পুরো ভাটাকে গুঁড়িয়ে দিলেও চলতি মৌসুমে একইভাবে পুনরায় চালু হয়েছে। বর্তমানে ভাটার চারপাশজুড়ে পড়ে আছে হাজার হাজার মণ গাছের গুঁড়ি। যা ইট পোড়ানোর কাজে ব্যবহার করা হবে।

লাকড়ি দিয়ে ইট পোড়ানোর ব্যাপারে ভাটামালিক মামুন পণ্ডিতের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ভাটার বয়স মাত্র কয়েক বছর হয়েছে। সামনের দিকে আধুনিক পদ্ধতিতে ভাটা তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকদের ম্যানেজ করে যতদিন চালাতে পারি ততটুকুই লাভ।

দক্ষিণ আইচার মানিকা ইউনিয়নের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা বলেন, প্রত্যন্ত এলাকায় আখন ব্রিকস ও রাত্রি ব্রিকস, সালীমা ব্রিকসসহ আরো অনেক ইটভাটার সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের অনুমোদন ও ছাড়পত্র নেই। গত বছর অভিযান চালিয়ে ভেঙে দেয়ার পরও পুনরায় এসব অবৈধ ভাটা চালু করায় উপজেলা প্রশাসন ও ভোলা পরিবেশ অধিদপ্তরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে জনমনে।

ভোলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আবদুল মালেক বলেন, ড্রামশিট চিমনি ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। আমরা সম্প্রতি শানিমা-২, মাইশা-২ ও ফরাজী ব্রিকসে অভিযান চালিয়ে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করেছি। তাছাড়া লোকবল সংকটের কারণে অধিকাংশ সময়ই অবৈধ এসব ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে অনেকটা বেগ পেতে হয়। তবে ভেঙে ফেলা যে ভাটাগুলো পুনরায় নির্মাণ করা হয়েছে সেগুলোর কোনো অনুমোদন নেই। ওইসব ভাটার বিরুদ্ধে আবার অভিযান পরিচালনা করা হবে।