বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির পাঁচ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। বহুল আলোচিত এ ঘটনায় দেশী-বিদেশী অপরাধীদের শনাক্ত করা গেলেও এখনো চার্জশিট জমা দিতে পারেনি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। যদিও এ-সংক্রান্ত তদন্তের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে বলে দাবি করছে সংস্থাটি। সিআইডি বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে এ নিয়ে মামলা করার পরই দেশের আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে। সেখানে তিন ক্যাটাগরিতে আসামি করা হবে অন্তত ২৩ জনকে।

২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যাংক অব নিউইয়র্কে গচ্ছিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির প্রয়াস চালায় দুর্বৃত্তরা। এর মধ্যে বানান বিভ্রাটের কারণে রাউটিং ব্যাংকের সন্দেহ হলে দুর্বৃত্তরা শ্রীলংকামুখী ২ কোটি ডলার হাতিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়। বাকি ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ম্যানিলাভিত্তিক রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিসি) হয়ে প্রবেশ করে ফিলিপাইনের বিভিন্ন ক্যাসিনোয়। এখন পর্যন্ত চুরি যাওয়া এ অর্থের মধ্যে ফেরত আনা গিয়েছে ১ কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার ডলার। বাকি ৬ কোটি ৬৪ লাখ ডলারের এখনো কোনো হদিস নেই।

রাজধানীর মতিঝিল থানায় ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ মুদ্রা পাচার প্রতিরোধ ও তথ্যপ্রযুক্তি আইনে এ নিয়ে একটি মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। আদালতের নির্দেশে মামলার তদন্তভার পেয়ে কাজ শুরু করে সিআইডি। পরে আলামত ও ফরেনসিক পরীক্ষায় পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে চুরির সঙ্গে দুই ডজন বিদেশীর সম্পৃক্ততা পায় সংস্থাটি। রিজার্ভের অর্থ চুরির সঙ্গে বিদেশী অপরাধীদের পাশাপাশি দেশী অপরাধীদেরও যোগসাজশের তথ্য উঠে আসে তদন্তে। পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন শাখার ১২০ জন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য এবং প্রাথমিক আলামত বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের আট কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা খুঁজে পান তদন্তসংশ্লিষ্টরা। ওইসব কর্মকর্তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞাও জারি করা হয়।

অন্যদিকে সন্দেহভাজন বিদেশীদের স্থায়ী ঠিকানা চেয়ে তাদের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়। এর মধ্যে ফিলিপাইন ও ভারত তাদের দেশের অপরাধীদের তথ্য পাঠিয়েছে। তবে চীন, জাপান ও শ্রীলংকা তাদের দেশের নাগরিকদের কোনো তথ্য পাঠায়নি। কয়েক দফায় চিঠি পাঠানো হলেও ওই তিন দেশ অপরাধীদের তথ্য সরবরাহ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না বলে দাবি তদন্ত কর্মকর্তাদের।

সিআইডির মুখপাত্র ও অর্গানাইজড ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার (ইকোনমিক ক্রাইম) মোস্তফা কামাল এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, রিজার্ভ চুরির মামলায় আন্তঃদেশীয় অপরাধীদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাদের তথ্য চেয়ে বারবার আবেদন করা সত্ত্বেও কিছু দেশ তা প্রদান করছে না। তবে ওই তথ্যের জন্য আর অপেক্ষা নয়। তদন্তের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হবে। ওই মামলা দায়েরের পর পরই আদালতে অভিযোগপত্র দেয়া হবে। সেখানে দেশী ও বিদেশী অপরাধীদের নাম অন্তর্ভুক্ত থাকছে।

প্রায় সাড়ে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সিআইডি। পাশাপাশি সেখান থেকে জব্দ করা হয় ৫০টি কম্পিউটার। ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়েছে। সুইফটের সঙ্গে ইন্টারনেট লিংক স্থাপন ও রাউটারের ত্রুটিসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হয়। সিআইডির জব্দ করা ইন্টারনেট সংযোগসহ কম্পিউটার ও কম্পিউটারের ভেতরের আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা করে অপরাধের ক্লু বের করা হয়।

তদন্তে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে সিআইডির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও দেশের বাইরের বিশেষ করে ফিলিপাইন, শ্রীলংকা ও চীনের বেশকিছু নাগরিকের জড়িত থাকার তথ্য মিলেছে। রিজার্ভ চুরির এ ঘটনায় আরবিসির ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফিলিপাইনের আদালতে সে দেশের অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং কাউন্সিল একটি মামলা করে। ওই মামলায় আরসিবিসির সাবেক কর্মকর্তা মায়া সান্তোস দেগিতোকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেন দেশটির একটি আদালত।

অন্যদিকে রিজার্ভের অর্থ চুরির প্রক্রিয়ায় এ পর্যন্ত পাঁচ বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা মিলেছে। সেগুলো হচ্ছে ফিলিপাইনের আরবিসিসি, ক্যাসিনো ইস্টার্ন হাওয়াই লেইজার কোম্পানি, অর্থ বহনের কাজে ব্যবহূত মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান ফিলরেম মানি সার্ভিস লিমিটেড, ব্লুবেরি অ্যান্ড হোটেল ও শ্রীলংকার বেসরকারি সংস্থা শালিকা ফাউন্ডেশন। এছাড়া চীনের ২৩ জুয়াড়ি কমিশনের বিনিময়ে কারো না কারোর হয়ে টাকা পাচারের কাজ করেছে বলেও জানতে পেরেছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।