নিশ্চিত রিটার্নের জন্য পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়ে থাকেন বিশ্লেষকরা। যদিও দেশের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদের তুলনায় স্বল্পমেয়াদে মুনাফা করার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। পরিসংখ্যান বলছে তালিকাভুক্ত ভালো কোম্পানিতে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগই লাভজনক। এক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধি ও শেয়ারে রিটার্ন হার প্রায় কাছাকাছি থাকে।

দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে গত এক দশকে গড়ে সবচেয়ে বেশি নিট মুনাফা প্রবৃদ্ধি এসেছে এমন ১২টি কোম্পানির তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ সময়ে তাদের শেয়ার থেকে উল্লেখযোগ্য হারে রিটার্ন এসেছে। এক্ষেত্রে নিট মুনাফা প্রবৃদ্ধি ও শেয়ারে রিটার্নের গড় হারের মধ্যে ব্যবধানও খুব বেশি নয়। পুঁজিবাজারের সূচকে এ ১২ কোম্পানির অবদান ৩০ শতাংশ। স্বল্পমেয়াদে এসব কোম্পানির রিটার্ন কোনো কোনো ক্ষেত্রে আকর্ষণীয় নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানিগুলোর শেয়ারে ভালো রিটার্ন পেয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।

গত ১০ বছরে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিসিএল) নিট মুনাফায় গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ। এর মধ্যে ২০১০-১১ হিসাব বছরে কোম্পানিটির নিট মুনাফা ছিল ২২ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যা ২০২০-২১ হিসাব বছরে এসে ১৯০ কোটি ৭০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারে গড়ে রিটার্ন এসেছে ১৯ দশমিক ২ শতাংশ। এক্ষেত্রে কোম্পানিটির নিট মুনাফা প্রবৃদ্ধির তুলনায় শেয়ারে ৫ শতাংশ কম রিটার্ন এসেছে।

দেশের বিস্কুট উৎপাদনকারী অন্যতম প্রতিষ্ঠান অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নিট মুনাফা ২০১০-১১ হিসাব বছরে ছিল ২৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ২০২০-২১ হিসাব বছরে কোম্পানিটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২০৩ কোটি ৭০ লাখ টাকায়। গত ১০ বছরে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের নিট মুনাফার গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ২৩ শতাংশ। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারে গড়ে রিটার্ন এসেছে ২১ দশমিক ১ শতাংশ। এক্ষেত্রে কোম্পানিটির নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধি শেয়ারে রিটার্নের তুলনায় ২ শতাংশ বেশি ছিল।

ওষুধ খাতের কোম্পানি দি ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের নিট মুনাফায় গত ১০ বছরে গড়ে ২২ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর মধ্যে ২০১০-১১ হিসাব বছরে কোম্পানিটির নিট মুনাফা ছিল ৬ কোটি টাকা, যা গত ২০২০-২১ হিসাব বছরে ৪৮ কোটি ৯০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারে রিটার্নের গড় ছিল ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ। এক্ষেত্রে কোম্পানিটির নিট মুনাফা প্রবৃদ্ধির তুলনায় শেয়ারে ২ শতাংশ কম রিটার্ন এসেছে।

এফএমসিজি খাতের বহুজাতিক কোম্পানি রেকিট বেনকিজার বাংলাদেশ লিমিটেডের নিট মুনাফা ২০১০ হিসাব বছরে ছিল ১২ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা গত ২০২০ হিসাব বছরে এসে ৭৩ কোটি ৯০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। গত ১০ বছরে কোম্পানিটির নিট মুনাফার গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারে গড়ে রিটার্ন এসেছে ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ। এক্ষেত্রে কোম্পানিটির নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধির তুলনায় শেয়ারে ৫ শতাংশ বেশি রিটার্ন এসেছে।

ওষুধ খাতের কোম্পানি রেনাটা লিমিটেডের নিট মুনাফায় গত ১০ বছরে গড়ে ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এসেছে। এর মধ্যে ২০১০-১১ হিসাব বছরে কোম্পানিটির নিট মুনাফা ছিল ৯৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যা গত ২০২০-২১ হিসাব বছরে ৫০৬ কোটি ২০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারে রিটার্নের গড় ছিল ২০ দশমিক ৯ শতাংশ। এক্ষেত্রে কোম্পানিটির নিট মুনাফা প্রবৃদ্ধির তুলনায় শেয়ারে ৪ শতাংশ বেশি রিটার্ন এসেছে।

ওষুধ খাতের কোম্পানি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের নিট মুনাফা ২০১০-১১ হিসাব বছরে ছিল ৩২৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০২০-২১ হিসাব বছরে এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৯৪ কোটি ৭০ লাখ টাকায়। গত ১০ বছরে কোম্পানিটির নিট মুনাফার গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারে গড়ে রিটার্ন এসেছে ১৭ দশমিক ২ শতাংশ। এক্ষেত্রে কোম্পানিটির নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধির তুলনায় শেয়ারে কিছুটা বেশি রিটার্ন এসেছে।

এফএমসিজি খাতের বহুজাতিক ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেডের নিট মুনাফায় গত ১০ বছরে গড়ে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর মধ্যে ২০১১ হিসাব বছরে কোম্পানিটির নিট মুনাফা ছিল ৭৭ কোটি ১০ লাখ টাকা, যা ২০২১ হিসাব বছরে ৩১০ কোটি ৯০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারে রিটার্নের গড় ছিল ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ। এক্ষেত্রে কোম্পানিটির নিট মুনাফা প্রবৃদ্ধির তুলনায় শেয়ারে ৯ শতাংশ বেশি রিটার্ন এসেছে।

ওষুধ খাতের কোম্পানি বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের নিট মুনাফা ২০১০-১১ হিসাব বছরে ছিল ১১৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা, যা ২০২০-২১ হিসাব বছরে এসে ৫১২ কোটি ৮০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। গত ১০ বছরে কোম্পানিটির নিট মুনাফার গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারে গড়ে রিটার্ন এসেছে ১৫ দশমিক ১ শতাংশ। এক্ষেত্রে কোম্পানিটির নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধির তুলনায় শেয়ারে কিছুটা বেশি রিটার্ন এসেছে।

তামাক খাতের বহুজাতিক জায়ান্ট ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেডের (বিএটিবিসি) নিট মুনাফায় গত ১০ বছরে গড়ে ১৪ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর মধ্যে ২০১০ হিসাব বছরে কোম্পানিটির নিট মুনাফা ছিল ২৮৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যা ২০২০ হিসাব বছরে ১ হাজার ৮৮ কোটি ৭০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারে রিটার্নের গড় ছিল ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এক্ষেত্রে কোম্পানিটির নিট মুনাফা প্রবৃদ্ধির তুলনায় শেয়ারে ১৯ শতাংশ বেশি রিটার্ন এসেছে।

ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেডের নিট মুনাফা ২০১০ হিসাব বছরে ছিল ১২১ কোটি টাকা, যা ২০২০ হিসাব বছরে এসে ৪৪২ কোটি ১০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। গত ১০ বছরে কোম্পানিটির নিট মুনাফার গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারে গড়ে রিটার্ন এসেছে ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ। এক্ষেত্রে কোম্পানিটির নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধির তুলনায় শেয়ারে ৪ শতাংশ বেশি রিটার্ন এসেছে।

গ্রামীণফোন লিমিটেডের নিট মুনাফায় গত ১০ বছরে গড়ে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর মধ্যে ২০১০ হিসাব বছরে কোম্পানিটির নিট মুনাফা ছিল ১ হাজার ৫৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা, যা ২০২০ হিসাব বছরে এসে ৩ হাজার ৭১৮ কোটি ৭০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারে রিটার্নের গড় ছিল ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ। এক্ষেত্রে কোম্পানিটির নিট মুনাফা প্রবৃদ্ধির তুলনায় শেয়ারে ১ শতাংশ বেশি রিটার্ন এসেছে।

বহুজাতিক রঙ উৎপাদক বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের নিট মুনাফা ২০১১ হিসাব বছরে ছিল ৭২ কোটি ১০ লাখ টাকা, যা গত ২০২১ হিসাব বছরে এসে ২৫৪ কোটি ৯০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। গত ১০ বছরে কোম্পানিটির নিট মুনাফার গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ১ শতাংশ। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারে গড়ে রিটার্ন এসেছে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। এক্ষেত্রে কোম্পানিটির নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধির তুলনায় শেয়ারে ৯ শতাংশ বেশি রিটার্ন এসেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পুঁজিবাজারে শেয়ারের রিটার্ন ও কোম্পানির নিট মুনাফার মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। কোম্পানির মুনাফা বাড়লে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে বাজারে। ২০১০ ও ২০১৭ সালে পুঁজিবাজারের উত্থানের সময় দেখা গিয়েছে কোম্পানির নিট মুনাফার প্রবৃদ্ধির তুলনায় শেয়ারে বেশি রিটার্ন এসেছে। অবশ্য এর পরের দুই বছরে এ রিটার্নের পরিমাণ কমেছে। কোম্পানির মুনাফা প্রবৃদ্ধি না হলে কিংবা সামান্য প্রবৃদ্ধি হলে সেসব শেয়ারের প্রতি বিমুখ হয়ে পড়েন বিনিয়োগকারীরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানির মুনাফার প্রবৃদ্ধির সঙ্গে শেয়ারে রিটার্নের সম্পর্ক রয়েছে। এক্ষেত্রে বলা যায়, যে পরিমাণ মুনাফা প্রবৃদ্ধি হবে শেয়ারে রিটার্নের পরিমাণ এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে যদি কোম্পানি মুনাফা করতে সমর্থ হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে শেয়ারে বিনিয়োগ করে বিনিয়োগকারীরাও লাভবান হয়ে থাকেন।