সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছিলেন, ‘রান্না না জানলে বেশি করে ঝাল দিয়ে দিন। যিনি খাবেন “একটু ঝাল বেশি হয়েছে” ছাড়া আর কোনো বদনাম করতে পারবেন না।’
বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত কিশোয়ার চৌধুরীর বিভিন্ন পদের বাঙালি রান্না খেয়ে বিদেশী বিচারকরা কিন্তু ঝালে বিহ্বল হয়ে পড়েননি, বরং প্রশংসায় ভেসেছেন বাঙালি কুইজিনের।
মুরগি ভুনার ওপর ছোট ছোট আনার দানা ছড়ানো। এ রান্নার নাম রুবি চিকেন কারি। মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার ১৩তম আসরে কিশোয়ার এ রান্না দিয়েই মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন। সে মুগ্ধতা যেন আরো বেশি মাত্রিকতা পেয়েছিল মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার ফাইনালে। কিশোয়ার বিচারকদের সামনে হাজির করলেন আলু সেদ্ধ-পান্তা ভাত আর মাছ ভাজা। পর্বটি যারা দেখেছেন তারা যেমন বিমুগ্ধ-বিস্মিত হয়েছেন, তেমনি বাংলাদেশের ঐতিহ্য তুলে ধরে বিচারকদের মন ছুঁয়ে দিয়েছেন কিশোয়ার।
গতকাল বাংলাদেশ সময় বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ফেসবুকে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাঙালিরা যে যার মোবাইল ফোন, ট্যাব কিংবা ভিন্ন ডিভাইস থেকে ফেসবুকে একটি অনুষ্ঠান লাইভ করেছেন। অনুষ্ঠানটির নাম মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া। ঘ্রাণ শুঁকেই যারা রান্না কেমন হয়েছে বলে দিতে পারেন, তেমন ভোজনরসিক বাঙালিসহ সে অনুষ্ঠানের দর্শক তালিকায় ছিলেন রান্না নিয়ে খুব একটা পারদর্শিতা নেই এমন মানুষও। সবার তুমুল উত্তেজনা, আগ্রহ, বিশ্বাস। কারণ মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার গ্র্যান্ড ফিনালের সেরা তিনে আছেন কিশোয়ার চোধুরী, যিনি বিশ্বমঞ্চে একে একে বাঙালি রান্না দিয়ে চমকে দিচ্ছেন।
মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার ১৩তম আসরে সেরা চারে উঠে এসে কিশোয়ার রেঁধেছিলেন জাউ ভাত। অন্য অনুষঙ্গ হিসেবে জুড়ে দিয়েছিলেন লাউ-চিংড়ির স্যুপ ও সামুদ্রিক মাছের একটি পদ। বিদেশে বেড়ে ওঠা কিশোয়ার যেন মাস্টারশেফের মঞ্চে একটু বাঙালিয়ানার স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি। তার হাতের ওই জাউ ভাত কিন্তু চেটেপুটে খেয়েছেন বিচারকেরা।
এ প্রতিযোগিতায় নাম লিখিয়ে শুরু থেকেই কিশোয়ার বিদেশের মাটিতে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন প্রচলিত বাঙালি কুইজিনের সঙ্গে। তুমুল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তুলে ধরেছেন তার দেশের প্রচলিত সব খাবার। তার হাতের খাবার খেয়ে একবার এক বিচারক তো বলেই বসলেন, কিশোয়ার, ‘খাবারগুলো সত্যি অনেক সুস্বাদু আর তোমার মসলা মেশানোর কৌশল খুবই অসাধারণ।’
৩৮ বছর বয়সী কিশোয়ার একের পর এক বাঙালি ঘরোয়া রান্না হিসেবে কখনো খিচুড়ি ও বেগুন ভর্তা নিয়ে এসেছেন তেমনি কখনো আমের টক, খাসির রেজালা রান্না করে প্রশংসায় ভেসেছেন। আর ফুচকা, চটপটি, সমুচার রেসিপি তো ছিলই তার, যা দিয়ে কিশোয়ার রীতিমতো মাত করে দিয়েছিলেন সবাইকে।
বলে রাখি, মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার বিচারকদের পাশাপাশি গোটা বিশ্বের ভোজনরসিকদের মন জয় করে নিয়েছেন যেন। কিশোয়ারের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে ‘গো কিশোয়ার’ হ্যাশট্যাগ ঝড়। মাস্টারশেফ আস্ট্রেলিয়ার সেরার মুকুট না জিতলেও তার অর্জন কোনোভাবেই কম নয়। বাঙালি-অবাঙালি অনেকেই এখন মোহমুগ্ধ কিশোয়ারে। তৃতীয় স্থান অধিকার করেছেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত কিশোয়ার চৌধুরী। জাস্টিন, পিট ও কিশোয়ার তিন প্রতিযোগীর মধ্যে প্রথম হয়েছেন জাস্টিন। বিশ্বের রান্নাবিষয়ক টেলিভিশন রিয়ালিটি শোর মধ্যে মাস্টারশেফ অন্যতম। বিশ্বে মাস্টারশেফ অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে ‘মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া’ জনপ্রিয়তার দিক থেকে রয়েছে তালিকার শীর্ষে। এটি প্রতিযোগিতামূলক রান্নার গেম শো।
কিশোয়ার চৌধুরীর বাবা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, বাড়ি বিক্রমপুরে। মায়ের বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে। অর্ধশতাব্দী আগে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান এ দম্পতি। সেখানেই জন্ম হয় কিশোয়ারের। বিদেশে বসবাস করলেও নিজ দেশের ভাষা, সংস্কৃতিকে কতটা নিবিড়ভাবে অনুভব করেন তা তিনি প্রমাণ করেছেন। কিশোয়ারের চাওয়া ছিল তার মা যেন তাকে নিয়ে গর্ব করেন। কিশোয়ারকে নিয়ে আজ গর্ব সব বাংলাদেশীর-বাঙালির।
মেলবোর্নের বাসিন্দা কিশোয়ার পেশায় একজন ‘বিজনেস ডেভেলপার’ এবং পারিবারিক প্রিন্টিং ব্যবসার সঙ্গে জড়িত দীর্ঘদিন ধরে। আর রান্নায় হাতেখড়ি ছোটবেলাতেই, মা-বাবার হাত ধরে।
মাস্টারশেফের মঞ্চে গিয়ে কিশোয়ার বলেছিলেন, ‘আমাদের বাসার ভেতরে শুধু রান্না নয়, বাজারটা কোত্থেকে আসে, কোন উপকরণ কোত্থেকে কিনি, সেগুলোও সবসময় দেখানো হয়েছে আমাদের। বাগানের হার্বস থেকে শুরু করে শাকসবজি মরিচ-লাউ সবকিছুই আমরা নিজেরা উৎপাদন করি। ছোটবেলা থেকে আমাদের মা-বাবা এসব কাজে আমাদের সম্পৃক্ত করেছেন।’
কিশোয়ারের স্বপ্ন তিনি তার রান্নাবিষয়ক একটি বই বের করবেন।










