অপ্রতুল নাগরিক সুবিধা, অপরিকল্পিত আবাসন, অসহনীয় যানজট, দূষণ, অব্যবস্থাপনাসহ নানা কারণেই বিশ্বের অন্যতম বসবাস-অযোগ্য শহরের তালিকার প্রথম সারিতে ঢাকা। আর এ নগরীর প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিল ও দিলকুশা। দিনের বেলায় কোলাহল আর রাতে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্রের এ বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্রকে ঘিরে নেয়া হয়নি তেমন পরিকল্পনা। ভূমি ব্যবহারে পরিবর্তন আনা হলেও এলাকাটির সবকিছুই চলছে ৪৮ বছরের পুরনো মাস্টারপ্ল্যানে। মতিঝিল নিয়ে সর্বশেষ পরিকল্পনা হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। সময়ের আবর্তে এ অঞ্চলে অবকাঠামো নির্মাণ কয়েক গুণ বাড়লেও সে অনুযায়ী হালনাগাদ করা হয়নি মাস্টারপ্ল্যান।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য বলছে, মোগল আমলে গড়ে ওঠা ঢাকার একটি ঐতিহাসিক স্থান মতিঝিল। মীর্জা মোহাম্মদ মুকিমের মহল থাকায় এলাকাটির পরিচিতিও ছিল বেশ। মহলের ভেতর ছিল একটি বড় দীঘি বা পুকুর, যার নাম ছিল সুকাকু মহলের পুকুর। পরবর্তী সময়ে সুকাকু পুকুরটিই মতিঝিল নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ আমলে মানুক নামে একজন আর্মেনীয় ব্যবসায়ীরও বাসস্থান ছিল মতিঝিলে। ঢাকার নওয়াব খাজা আবদুল গণি সেই জায়গাটি তার কাছ থেকে কিনে নেন। পরবর্তী সময়ে নওয়াবদের বাগান ও বাগানবাড়ি নির্মাণ করা হয় সেখানে।
মতিঝিলের সঙ্গে দিলকুশা নামটি জড়িত। নবাব স্যার সলিমুল্লাহর ভগ্নিপতি নবাব আজিম মতিঝিল এলাকায় ‘দিলকুশা’ নামের একটি মনোরম প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন। ইংরেজ আমলে মতিঝিল ও দিলকুশার মাঝ বরাবর একটি রাস্তাই কেবল স্থান দুটিকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর দিলকুশা প্রাসাদের নামানুসারে এলাকাটির নাম করা হয়। এর মধ্যে ১৯৭৪ সালের ২৬ আগস্ট তত্কালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) মতিঝিল ও দিলকুশা এলাকাকে শতভাগ বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের জন্য লে আউট প্রণয়ন করে। এরপর দীর্ঘ ৪৫ বছর পেরিয়ে গেলেও চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কোনো মাস্টারপ্ল্যানই করেনি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। সেই সুযোগে তৈরি হয়েছে বিশাল বিশাল সব ভবন। বেশির ভাগ অবকাঠামোই গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। আশপাশে নেই সবুজের কোনো সমারোহ। পুকুর ঘিরে এলাকাটি গড়ে উঠলেও বর্তমানে কোনো জলাধারই অবশিষ্ট নেই। ফলে গরমকালে এসব সুউচ্চ ভবনের কারণে ভয়াবহ উত্তাপ সহ্য করতে হয় এ অঞ্চলের নাগরিকদের। আবার বাণিজ্যিক এলাকা হওয়ায় নাগরিক সুবিধাও অপ্রতুল। যেখানে সেখানে পার্কিং বাড়িয়েছে অসহনীয় যানজট। এলাকায় নেই স্বাস্থ্য অবকাঠামো কিংবা মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিশুদের খেলাধুলার জন্য নেই কোনো মাঠ কিংবা হাঁটার জন্য পার্ক। এছাড়া মতিঝিল ও দিলকুশা এলাকায় প্রতিদিন লাখ লাখ লোক বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য নিয়মিত আসা-যাওয়া করলেও তাদের বিশ্রাম নেয়ার কোনো স্থান নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীতে প্রচুর অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে। বড় ধরনের বাজেট হচ্ছে। কিন্তু শহরের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কোনো ধরনের উদ্যোগ নেই। শহরকে ঘিরে পরিবহন-সংক্রান্ত পরিকল্পনার মৌলিক প্রস্তাবগুলোর মানোন্নয়ন হয়নি। গণপরিবহনের উন্নতি হয়নি, বাসরুটগুলোকে শৃঙ্খলায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হলেও বাস্তবায়ন হয়নি। ফুটপাতের মানোন্নয়নের উদ্যোগ নেয়া হলেও ফাইলেই বন্দি। এমন প্রেক্ষাপটে ভূমি ব্যবহার ও যানবাহন পরিকল্পনা উভয়ের মধ্যেই সমন্বয় প্রয়োজন। যদিও পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর মধ্যেও সমন্বয়হীনতার অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী সভাপতি নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, মতিঝিল এলাকায় ১৯৭৪ সালের বাস্তবতা আর এখনকার প্রেক্ষাপট পুরোপুরিই ভিন্ন। ৪৮ বছর আগের সেই প্ল্যান দিয়ে এখনকার সময়ে এলাকাটির বাসযোগ্যতা ধরে রাখা এক অর্থে অসম্ভব। ওই সময় যে পরিমাণ ভবন বা সক্রিয়তা ছিল তার থেকে এখন অনেক গুণ বেশি। মতিঝিলকেন্দ্রিক অবকাঠামোর বাণিজ্যিক ব্যবহার আগের তুলনায় বেড়েছে কয়েকশ গুণ। ফলে এলাকাটিতে গাড়ির চাপ, পথচারীদের চাপ, হকার—সবই বেড়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের এ অধ্যাপক আরো বলেন, মতিঝিলের প্রবেশগম্যতা ও বাসযোগ্যতা বাড়াতে এলাকাটির মাস্টারপ্ল্যান রিভিউ করা দরকার। এখনো সুযোগ আছে পরিকল্পিত পরিকল্পনা নিয়ে মতিঝিল এলাকায় বসবাসের পরিস্থিতি উন্নত করার। সেজন্য পথচারীদের প্রাধান্য দিয়ে রাস্তার ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে হবে। রাস্তায় পার্কিং বা হকার বসার বিষয়টিও নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। পৃথিবীর কোনো শহরেই রাস্তায় সারা দিনে গাড়ি পার্কিং এত সুলভে মিলবে না, কিন্তু ঢাকার রাস্তায় সে সুযোগ আছে। নীতি-কৌশলের মাধ্যমে রাস্তায় বা যেখানে সেখানে পার্কিং এমন কঠিন করতে হবে, যাতে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ওইসব এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
মতিঝিল এলাকা ঘিরে নতুন মাস্টারপ্ল্যান তৈরির সুপারিশ উঠে আসে একাদশ জাতীয় সংসদের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ বিষয়ে অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরা হয়। তাতে বলা হয়, মতিঝিল ও দিলকুশাকে ঘিরে একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি এবং তাতে শিশুদের পার্ক অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে কাজ চলছে। বর্তমানে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের কাজ চলছে। বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে খোঁজা হচ্ছে খালি স্থান।
জানতে চাইলে রাজউকের ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, মতিঝিল এলাকার মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের জন্য বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যেমন ওখানে কতগুলো প্লট ছিল, কতগুলো বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কোনো প্লট ফাঁকা আছে নাকি, সেটিও খুঁজে দেখা হচ্ছে। আবার বরাদ্দকৃত প্লটে কী ধরনের অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে, সে বিষয়েও তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। মতিঝিলে রাজউকের কিছু জায়গা বেদখল হয়ে আছে।
সেগুলো উদ্ধার করে সাইকেল ট্র্যাকসহ ওয়াটার বেজড একটি পার্ক তৈরির পরিকল্পনা আছে আমাদের। এছাড়া পকেট কোনো জায়গা যদি খুঁজে পাওয়া যায় তাহলে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের পেছনের একটি খালি জায়গা পাওয়া গিয়েছে, সেখানে রাজউকের উদ্যোগে একটি পার্ক করার চিন্তাভাবনা চলছে।










