বন্দর নগরী চট্টগ্রামের অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপোগুলোর (আইসিডি) বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। আর এ অভিযোগ এসেছে দেশের মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি অর্জন করা তৈরি পোশাক খাতের পক্ষ থেকে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইসিডি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে নানা অজুহাতে বিভিন্ন ধরনের চার্জ বাড়ানো হয়। এতে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাচ্ছে রফতানি খাত। এসব সমস্যা সমাধানে সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি লিখেছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি ফারুক হাসান।
এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের সার্বিক রফতানির স্বার্থে আইসিডির সঙ্গে আমাদের কাজ করতে হয়। ভবিষ্যতেও করতে হবে। তবে এ-সংক্রান্ত কোনো চার্জ বাড়ানোর প্রয়োজন হলে আমরা চাই সেটা যেন বন্দর কর্তৃপক্ষের নীতিমালা অনুযায়ী হয়। মূলত সে বিষয়টি নিশ্চিত করার অনুরোধই আমরা জানিয়েছি।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণ দেখিয়ে চট্টগ্রামের ১৯টি বেসরকারি আইসিডিতে ২৩ শতাংশ চার্জ বাড়ানো হয়েছে উল্লেখ করে এ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, কাজটি যৌক্তিক হয়নি। কারণ তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে আইসিডির চার্জ বাড়ার তেমন সম্পর্ক নেই। এছাড়া অনেক চার্জ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারের কাছ থেকে নেয়ার কথা থাকলেও রফতানিকারকদের কাছ থেকে নেয়া হয়। চিঠিতে এসব বিষয়ে একটি নিয়ম নির্দিষ্ট করে দেয়া ও তা বাস্তবায়নের অনুরোধ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) বলছে, আইসিডিগুলোর মূল কাজ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার বা মেইন লাইন অপারেটরদের (এমএলও) সঙ্গে। ক্রেতা মনোনীত ফরওয়ার্ডার আইসিডি নিয়োগ দিয়ে সেখানে কনটেইনারগুলো রাখার ব্যবস্থা করে। ফরওয়ার্ডার যে আইসিডিতে রফতানি চালান নিয়ে যাওয়ার জন্য শিপিং অর্ডার দেয়, রফতানিকারকদের সেই আইসিডিতে চালান নিয়ে যেতে হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশে আইসিডি কর্তৃপক্ষ ফরওয়ার্ডারের কাছ থেকে যাবতীয় পাওনা আদায় করে। চট্টগ্রাম বন্দরের সার্কুলার অনুযায়ীও কনটেইনারের সব চার্জ ভাড়ার সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে এ ক্ষেত্রে প্রায় সব ধরনের চার্জ রফতানিকারকদের কাছ থেকে নেয়া হয়।
আইসিডির সঙ্গে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারের কাজের বিষয়ে আইসিডি নীতিমালা ২০১৬-এর ৮.৫.৫ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে ট্রাক থেকে মালামাল নামানোসহ খালি কনটেইনার স্থাপন থেকে স্টাফিংয়ের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করে কোনো ট্রলারে ওঠানো পর্যন্তকে কনটেইনার স্টাফিং সাইকেল বলা হয়। এই স্টাফিং সাইকেলের জন্য একটি থোক মূল্য বরাদ্দ থাকবে, যা ট্যারিফ কমিটি নির্ধারণ করে দেবে। এখানে পৃথকভাবে রফতানিকারকদের থেকে টাকা নেয়ার কোনো সুযোগ নেই বলেও জানিয়েছে বিজিএমইএ।
অন্যদিকে বিধান অনুযায়ী কনটেইনার জাহাজীকরণে ভিজিএম সনদ লাগে। ওশান বিল অব লেডিংয়ের শিপার হয় ফরওয়ার্ডার। তাই ফরওয়ার্ডারকেই ভিজিএম সনদ গ্রহণ করে জাহাজে দিতে হয়।
কিন্তু আইসিডিগুলো রফতানিকারকদের কাছ থেকে ভিজিএম চার্জ আদায় করছে। এছাড়া আইসিডিগুলো কার্টন নামানোর চার্জ ও আইসিডি নীতিমালা-বহির্ভূত ল্যান্ডিং চার্জ নামে বেআইনি অর্থ আদায় করে রফতানির খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাচ্ছে বাংলাদেশ।
বিজিএমইএর কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলে আরো জানা যায়, আইসিডিগুলোতে জাহাজের হুক থেকে কনটেইনার নামানোর কোনো কাজ করা হয় না। তার পরও আইসিডিগুলো কনটেইনার কার্গোর জন্য অযৌক্তিকভাবে ল্যান্ডিং চার্জ নামে বেআইনি অর্থ আদায় করে। যেহেতু প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থা নেই তাই কিছু আইসিডি সম্প্রতি রফতানিকারকদের কাছ থেকে কনটেইনার স্টাফিং চার্জও আদায় শুরু করেছে। এ চার্জগুলো ফরওয়ার্ডারের কাছ থেকে নেয়াই যৌক্তিক। কিন্তু হয়তো ব্যবসা পাওয়ার প্রতিয়োগিতায় ফরওয়ার্ডারের কাছ থেকে টাকা না নিয়ে রফতানিকারকদের থেকে আদায় করা হচ্ছে। ফলে এক ধরনের জিম্মি অবস্থার মধ্য দিয়ে রফতানিকারকরা রফতানি কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
এ ধরনের বেআইনি অর্থ আদায় ও নিয়মবহির্ভূতভাবে চার্জ বৃদ্ধি বন্ধে আইসিডি নীতিমালা ২০১৬-এর ৮.৫.৫ ধারা বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে অনুরোধ জানিছে বিজিএমইএ। একই সঙ্গে ল্যান্ডিং চার্জ নামে বেআইনি অর্থ আদায় বন্ধের পাশাপাশি ট্যারিফ কমিটির অনুমোদন ছাড়া বর্ধিত চার্জ আদায়ে ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের সার্কুলার স্থগিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতেও অনুরোধ জানানো হয়।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব মো. রুহুল আমিন সিকদার বিপ্লব বণিক বার্তাকে বলেন, ২০১৬ সালের আইসিডি নীতিমালায় ট্যারিফ কমিটির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তার পর থেকে এখন পর্যন্ত কমিটি কোনো ট্যারিফ নির্ধারণ করে দেয়নি। নতুন করে চার্জ বাড়ানোর আগেও যে চার্জ নেয়া হতো সেটাও বিকডা নির্ধারিত। গত ছয় বছর কমিটি কোনো কাজ করেনি, তাই প্রয়োজনের তাগিদেই তারা চার্জ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারের পরিবর্তে রফতানিকারকদের কাছ থেকে চার্জ নেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, বন্দর কর্তৃপক্ষের নীতিমালা অনুযায়ীই তারা চার্জ গ্রহণ করেন।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণ দেখিয়ে গত ৯ নভেম্বর এক ভার্চুয়াল সভায় চট্টগ্রামের ১৯টি বেসরকারি আইসিডিতে (ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো) ২৩ শতাংশ চার্জ বাড়িয়েছে আইসিডি মালিকদের সংগঠন বিকডা। আমদানি পণ্য খালাস, রফতানি পণ্য কনটেইনার বোঝাই, ডিপো ও চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার পরিবহন, কনটেইনার ওঠানো-নামানো ও ওজন মাপার ক্ষেত্রে এ চার্জ বাড়ানো হয়।
সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, বিজিএমইএ এ ধরনের একটি চিঠি সম্প্রতি তাদের কাছে পাঠিয়েছে। চিঠিতে বেশকিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। বন্দরের সংশ্লিষ্ট বিভাগ তাদের দাবিগুলো বিশ্লেষণ করে দেখছে। তাদের নিজস্ব বিশ্লেষণ শেষ হলে সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে দাবিগুলো নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।










