উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে দুই মাস ধরে আন্দোলন করে আসছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশ। প্রথমে জীববৈচিত্র্য (প্রাণ-প্রকৃতি) রক্ষার দাবিতে আন্দোলন শুরু হলেও একটি জাতীয় দৈনিকে উন্নয়ন প্রকল্পের দুই কোটি টাকা ছাত্রলীগকে দেয়ার খবর প্রকাশিত হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন তারা। দুর্নীতি তদন্তে কমিটি গঠন করার দাবি প্রশাসন কর্তৃক অগ্রাহ্য হলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনের স্বার্থে ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট, ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদসহ শিক্ষকদের একাংশ।

এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচটি নতুন আবাসিক হলের নির্মাণকাজ শুরু হয়। এতে মোট ৪৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। বরাদ্দের সেই টাকা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগকে ১ কোটি এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগকে ১ কোটিসহ মোট ২ কোটি টাকা দেয়ার অভিযোগ ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন না করার জেরে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবি ওঠে। গত ১ অক্টোবর পর্যন্ত তাকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের জন্য সময় বেঁধে দিয়েছিলেন আন্দোলনকারীরা। কিন্তু তিনি নির্দিষ্ট সময়ে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করায় এখন তার অপসারণ দাবিতে আন্দোলন চলছে।

গত ২৮ অক্টোবর থেকে চলছে সর্বাত্মক ধর্মঘট কর্মসূচি। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে বিশৃঙ্খলা। প্রশাসনিক ভবন বন্ধ থাকায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

এ ব্যাপারে ইংরেজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. গোলাম রাব্বি বণিক বার্তাকে বলেন, চলমান আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কথা কেউ মাথায় রাখছে না। এক পক্ষ দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে এলেও অন্য পক্ষ তাতে ভ্রূক্ষেপ করছে না। আজ প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ঠিকমতো ক্লাস-পরীক্ষা হচ্ছে না। প্রশাসনিক ভবন বন্ধ থাকায় অনেকেই ফরম ফিলআপসহ প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারেনি। এভাবে একটা বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারে না। যেভাবেই হোক অনতিবিলম্বে আমরা এ সংকটের সমাধান চাই।

তদন্ত ছাড়া উপাচার্যের পদত্যাগ চাওয়া কতটুকু যৌক্তিক জানতে চাইলে আন্দোলনকারী শিক্ষক নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মির্জা তাসলিমা সুলতানা বলেন, আমরা তো শুরুতে উপাচার্যের পদত্যাগ চাইনি। আমরা প্রথমে দুর্নীতির তদন্ত দাবি করেছিলাম। কিন্তু উপাচার্য তদন্ত করেননি। বলেছেন, তিনি নিজের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারেন না। সেটা তো আমরাও জানি। কিন্তু তিনি উপাচার্যের পদাধিকারবলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট সমাধানে সরকারের কাছে তদন্তের আবেদন করতে পারতেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদ এবং ছাত্রলীগ নেতাদের স্বীকারোক্তির পরও কোনো রকম তদন্ত না হওয়া তো কাম্য হতে পারে না।

এই অচলাবস্থার সমাধান কীভাবে হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেহেতু উপাচার্য সমস্যা সমাধানে আন্তরিক নন, তাই এ সমস্যার সমাধান এখন কেবল আচার্যই (রাষ্ট্রপতি) করতে পারেন। আমরা তাকে সবকিছু জানিয়েছি। এখন যত দ্রুত তিনি কার্যকর পদক্ষেপ নেন, ততই মঙ্গল।

চলমান আন্দোলনে ‘বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদ’ সংগঠনের ব্যানারে উপাচার্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন শিক্ষকদের একাংশ। এরই মধ্যে তারা মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন উপাচার্যকে নির্দোষ দাবি করে। প্রকাশিত খবর এবং ছাত্রলীগ নেতাদের স্বীকারোক্তির পরও উপাচার্য কীভাবে নির্দোষ থাকতে পারেন জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক বশির আহমেদ বলেন, উপাচার্যের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি কোনো প্রকার অর্থ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত নন। ছাত্রলীগের যেসব কর্মী স্বীকারোক্তি দিয়েছেন তা ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে উপাচার্যকে বিতর্কিত করার উদ্দেশ্যে দিয়েছে। কারণ তারা মনে করেছেন শোভন-রাব্বানী পদ হারিয়েছে উপাচার্যের বক্তব্যের কারণে।

তাহলে তাদের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এতদিন উপাচার্য তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেননি, কারণ আন্দোলন চলাকালীন তিনি আইনি ঝামেলায় জড়াতে চাননি। তবে এখন তিনি পদক্ষেপ নেবেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পরিকল্পনা চলছে।

জাবির সংকট সমাধানে সরকারের ভূমিকা কী হওয়া উচিত জানতে চাইলে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, এখন মূল ভূমিকা সরকারকেই পালন করতে হবে। সরকারের নিয়োগকৃত একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে এর তদন্ত করতে। এতে গড়িমসি করলে সরকারের ইমেজ ক্ষুণ্ন হবে এবং সংকট আরো দীর্ঘায়িত হবে। এ পরিস্থিতি উত্তরণে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের হস্তক্ষেপের বিকল্প নেই।

এদিকে ৩০ অক্টোবর ধর্মঘট কর্মসূচি চলাকালে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সহকারী প্রক্টর মহিবুর রউফ শৈবালের ধস্তাধস্তির ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ৪০-৪৫ জনের বিরুদ্ধে হত্যা চেষ্টা মামলা দায়ের করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর প্রতিক্রিয়ায় আন্দোলনকারীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।