রাজস্ব সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমদানি পণ্য দ্রুত খালাসে কাস্টমস হাউজ ও স্টেশনগুলোকে ১২ দফা জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

আজ রোববার জারি করা এনবিআরের কাস্টমস নীতি ও আইসিটি-সংক্রান্ত শাখার চিঠিতে এ নির্দেশনা দেয়া হয়।

নির্দেশনায় অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল বন্ধ, ইলেকট্রনিকভাবে জমা দেয়া নথি পুনরায় ম্যানুয়ালি দাখিল না করা, ঝুঁকিভিত্তিক পণ্যচালান নির্বাচন এবং অপ্রয়োজনীয় কায়িক পরীক্ষা এড়িয়ে চলার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে শুল্কায়ন ও পণ্যছাড়ের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় ধাপ ও কার্যক্রম বাদ দেয়া, দীর্ঘদিন ধরে খালাস না হওয়া পণ্যচালান দ্রুত ছাড়ের উদ্যোগ নেয়া এবং প্রয়োজনে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকে নোটিশ দিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নিলাম কার্যক্রমও দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে।

চিঠির বিষয়বস্তুতে বলা হয়েছে, ‘রাজস্ব সুরক্ষা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করে আমদানি পণ্যছাড় দ্রুত খালাসের লক্ষ্যে’ কাস্টমস হাউজ ও স্টেশনগুলোকে এসব নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এনবিআরের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পণ্য ঘোষণা, শুল্কায়ন ও পুনঃশুল্কায়ন বিধিমালা, ২০২৪-এ ঘোষিত প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট বা দলিলাদি ছাড়া অন্য কোনো নথি আমদানিকারকের কাছ থেকে নেয়া যাবে না। অর্থাৎ বিধিমালায় নির্ধারিত নয় এমন অতিরিক্ত কাগজপত্র চেয়ে পণ্যছাড় প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করা থেকে কাস্টমস কর্মকর্তাদের বিরত থাকতে হবে।

এছাড়া যেসব ডকুমেন্ট বা দলিল ইলেকট্রনিকভাবে দাখিল করা হবে, সেগুলো পুনরায় ম্যানুয়ালি দাখিল করতে হবে না। আমদানি পণ্য ছাড়ের ক্ষেত্রে একই তথ্য বা নথি একাধিক মাধ্যমে জমা দেয়ার যে প্রক্রিয়া রয়েছে, নতুন নির্দেশনার মাধ্যমে তা বন্ধের কথা বলা হয়েছে।

ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আরো কার্যকর করার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে এনবিআর। এ জন্য অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের সিলেক্টিভিটি ক্রায়টেরিয়া নিয়মিত হালনাগাদ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যচালান শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি কম ঝুঁকির চালান দ্রুত ছাড় করার পথ তৈরি করতে চায় রাজস্ব বোর্ড।

কাস্টমসের দাফতরিক প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় রেজিস্টার সংরক্ষণ এবং তথ্য ম্যানুয়ালি লিপিবদ্ধ করার প্রবণতা থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে। এতে একই তথ্য বারবার নথিভুক্ত করার কারণে সৃষ্ট সময়ক্ষেপণ কমবে বলে মনে করছে এনবিআর।

নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছে, যেসব পণ্যচালান ঝুঁকিপূর্ণ নয় এবং এসব চালান নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কোনো বিশেষ নির্দেশনা নেই, সেসব পণ্যচালানের নথি অপ্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন বন্ধ করতে হবে। অর্থাৎ ঝুঁকিহীন চালানের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রশাসনিক যাচাই-বাছাই না করে দ্রুত ছাড়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

একই চালানের বারবার কায়িক পরীক্ষাও বন্ধ করতে বলেছে এনবিআর। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শুল্ক ফাঁকির বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য না থাকলে একই পণ্যচালান একাধিকবার কায়িক পরীক্ষা করা পরিহার করতে হবে। এতে আমদানিকারকের সময় ও ব্যয় কমার পাশাপাশি বন্দরের ইয়ার্ড ও কাস্টমসের জনবল ব্যবস্থাপনার ওপরও চাপ কমবে।

বন্দর, স্থলবন্দর ও বিমানবন্দরের গেট ভেরিফিকেশন কার্যক্রমেও নিয়মিত নজরদারির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আনস্টাফিং কার্যক্রম এবং এসব গেট ভেরিফিকেশন কার্যক্রমের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়মিত মনিটরিং করতে বলা হয়েছে।

পণ্য ছাড়ের সময়ও ঝুঁকিভিত্তিক ব্যবস্থাপনাকে প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে। এনবিআরের নির্দেশনায় বলা হয়, রাজস্ব ঝুঁকির ভিত্তিতে পণ্যচালান নির্বাচন করতে হবে। একই সঙ্গে কায়িক পরীক্ষার ফলাফল মূল্যায়নের ভিত্তিতেও পরবর্তী চালান নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।

গোপন তথ্যের ভিত্তিতে কোনো পণ্যচালানের কায়িক পরীক্ষা করা হলে অপ্রয়োজনে পুনঃপরীক্ষা না করার নির্দেশও দেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কাস্টমস স্টেশনের গোয়েন্দা ইউনিট, কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর এবং সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় রাখার কথা বলা হয়েছে।

এনবিআর মনে করছে, একই চালান নিয়ে একাধিক সংস্থা বা ইউনিটের পৃথক পৃথক পরীক্ষার কারণে যাতে আমদানি পণ্য ছাড়ে অযথা বিলম্ব না হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন।

নতুন নির্দেশনায় শুল্কায়ন ও পণ্যছাড়ের পুরো প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় ধাপ ও কার্যক্রম পরিহারের ওপরও জোর দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ কোনো চালান ছাড়ের জন্য বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়ার বাইরে অতিরিক্ত ধাপ যুক্ত না করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে খালাস না হওয়া পণ্যচালান দ্রুত ছাড়ের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে এসব পণ্যচালানের আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকে নোটিশ দেয়াসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এর মাধ্যমে কাস্টমসের ইয়ার্ড ও গুদামে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা পণ্যচালানের জট কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

সবশেষে নিলাম কার্যক্রম দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে এনবিআর। দীর্ঘদিন পড়ে থাকা এবং আইন অনুযায়ী নিলামযোগ্য পণ্য দ্রুত নিলামের আওতায় আনার মাধ্যমে কাস্টমসের জায়গা ব্যবস্থাপনা এবং রাজস্ব আদায় উভয় ক্ষেত্রেই গতি আনার লক্ষ্য রয়েছে নির্দেশনায়।

কাস্টমস কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেয়া এ নির্দেশনায় মূলত দুটি বিষয়কে একসঙ্গে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। একদিকে ঝুঁকিপূর্ণ চালানে রাজস্ব সুরক্ষা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে কম ঝুঁকির চালানে দ্রুত পণ্যছাড়ের মাধ্যমে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। এর জন্য কাগজপত্রের পুনরাবৃত্তি, ম্যানুয়াল প্রক্রিয়া, অপ্রয়োজনীয় কায়িক পরীক্ষা ও প্রশাসনিক ধাপ কমিয়ে ঝুঁকিভিত্তিক কাস্টমস ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়েছে রাজস্ব বোর্ড।

বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা বলছেন, আধুনিক কাস্টমস ব্যবস্থার মূল ভিত্তিই হচ্ছে ঝুঁকিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা। যে চালানে ঝুঁকি আছে, সেটি যথাযথভাবে পরীক্ষা ও যাচাই হবে। কিন্তু ঝুঁকি নেই এমন চালানকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে আটকে রেখে কিংবা একই চালান বারবার পরীক্ষা করে ব্যবসার সময় ও ব্যয় বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। এ ক্ষেত্রে এনবিআরের নির্দেশনায় যে ঝুঁকিভিত্তিক সিলেক্টিভিটি ও পরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, আধুনিক কাস্টমস ব্যবস্থার মূল ভিত্তিই হচ্ছে ঝুঁকিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা। যে চালানে ঝুঁকি আছে, সেটি যথাযথভাবে পরীক্ষা ও যাচাই হবে। কিন্তু ঝুঁকি নেই এমন চালানকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে আটকে রেখে কিংবা একই চালান বারবার পরীক্ষা করে ব্যবসার সময় ও ব্যয় বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। এ ক্ষেত্রে এনবিআরের নির্দেশনায় যে ঝুঁকিভিত্তিক সিলেক্টিভিটি ও পরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।

তিনি আরো বলেন, নির্দেশনা জারি করাই যথেষ্ট নয়, মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়নই মূল বিষয়।