প্রকৌশল বিদ্যায় উচ্চশিক্ষা নিয়েছিলেন রাসেল শাহরিয়ার। পরবর্তী সময়ে তিনি ব্যাংক খাতে ক্যারিয়ার গড়তে মনোযোগী হয়ে ওঠেন। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ প্রতিষ্ঠানে তার মাসিক বেতন ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা। একাধিক আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গিয়ে তার সঙ্গে সখ্য হয় আর্থিক খাতের আলোচিত প্রশান্ত কুমার (পিকে) হালদারের সঙ্গে। এক পর্যায়ে তারই সংস্পর্শে এসে রাসেল হয়ে ওঠেন আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠান লুটপাটের কারিগর।
গতকাল আদালতে দেয়া এক জবানবন্দিতে এসব তথ্য উল্লেখ করেছেন রাসেল শাহরিয়ার। তিনি জানান, পিকে হালদারের নির্দেশনায় তারই আত্মীয়-বন্ধু ও স্বার্থসংশ্লিষ্টদের অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই ব্যাংকঋণ অনুমোদন করেছেন। আর পিকের প্রচ্ছন্ন সহযোগিতার মাধ্যমেই লুট করা হয় এফএএস ফাইন্যান্স।
আদালতে দেয়া জবানবন্দির তথ্য অনুযায়ী, রাসেল শাহরিয়ার ১৯৮৯ সালে খিলগাঁও হাইস্কুল থেকে এসএসসি, ১৯৯১ সালে তেজগাঁও সরকারি বিজ্ঞান কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ১৯৯৪ সালে বুয়েটে ভর্তি হন। ১৯৯৮ সালে বুয়েট থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে ১৯৯৯ সালে বেসিক ব্যাংকে যোগ দেন। এরপর ২০০৫ সালে ইউনাইটেড লিজিংয়ে ও ২০০৬ সালে আইআইডিএফসিতে যোগ দেন তিনি। ২০০৮-১০ সাল পর্যন্ত আইআইডিএফসিতে সিএফও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালে রাসেল আইআইডিএফসিতে ইভিপি হিসেবে পদোন্নতি পান। ২০১৪ সালের জুনে মাইডাস ফাইন্যান্সে ডিএমডি হিসেবে যোগ দেন। এর মধ্যে ২০১২-১৪ সাল পর্যন্ত রিলায়েন্স ফাইন্যান্সে পিকে হালদারের উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেন তিনি।
রাসেল যখন আইআইডিএফসিতে যোগ দেন, তখন সেখানে অপারেশন হেড হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন পিকে হালদার। ২০০৮ সালে পিকে হালদার রিলায়েন্স লিজিংয়ে এমডি হিসেবে যোগ দেন। সেখানেই উপদেষ্টা হিসেবে দুই বছরের জন্য কাজ করেন রাসেল। সব মিলিয়ে তাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়।
জবানবন্দিতে রাসেল জানান, ২০১৪ সালের নভেম্বরে তাকে এফএএস ফাইন্যান্সে এমডি হিসেবে যোগ দেয়ার প্রস্তাব দেন পিকে হালদার ও উজ্জ্বল কুমার নন্দী। তাদের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে এফএএস ফাইন্যান্সের এমডি হিসেবে কাজ শুরু করেন রাসেল। সে সময় তার বেতন ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা। রাসেলের স্ত্রী রাজধানীর একটি হাসপাতালে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত, তাদের স্কুলপড়ুয়া একটি সন্তান রয়েছে।
রাসেল শাহরিয়ার জবানবন্দিতে বলেন, ‘এফএএস ফাইন্যান্সে যোগদানের সময় চেয়ারম্যান হিসেবে এ হাফিজ, পরিচালক হিসেবে ছিলেন জাহাঙ্গীর আলম, উজ্জ্বল কুমার নন্দী ও সিদ্দিকুর রহমান। এ তিনজনই এফএএস ফাইন্যান্সের বোর্ডে খুব প্রভাব বিস্তার করতেন। উজ্জ্বল কুমার নন্দী ছিলেন পিকে হালদারের ডান হাত। তিনি ও নাহিদা রুনাই ফোন করে পিকে হালদারের ফাইল দ্রুত বোর্ডে তুলতে তাগিদ দিতেন। বোর্ড সভায় উজ্জ্বল কুমার নন্দী, সিদ্দিকুর রহমান ও জাহাঙ্গীর আলম প্রায়ই বলতেন, এগুলো বোর্ডের ফাইল। এগুলো নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই। এগুলোর দায়িত্ব বোর্ডের। আপনি নির্ভয়ে কাজ করেন। ক্রেডিট হেড হিসেবে প্রাণ গৌরাঙ্গ দে যোগদান করার পর উজ্জ্বল কুমার নন্দী ও নাহিদা রুনাই গৌরাঙ্গকে ফোন করে ফাইল বোর্ডে নিতে বলতেন। করপোরেট হেড হিসেবে আহসান রাকিব যোগদান করার পর তারাই সরাসরি পিকে হালদারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফাইল নিয়ে আসতেন এবং পিকে হালদারের নির্দেশমতো বোর্ডে ফাইল উপস্থাপনের জন্য নোট তৈরি করে তাতে স্বাক্ষর করতেন। আমাকে বোর্ডে উপস্থাপনের জন্য বলতেন।’
পিকে হালদার মাঝে মাঝে এফএএস ফাইন্যান্সের বোর্ড মিটিংয়ে উপস্থিত থাকতেন বলেও জানান রাসেল। তিনি বলেন, ‘পিকে হালদার আমার চেম্বারেও তিনবার এসেছিলেন। বোর্ডে ফাইল গেলে বলা হতো এটি পিকে হালদারের ফাইল। পিকে হালদারের ফাইল বলার সঙ্গে সঙ্গেই সবাই একবাক্যে তা যাচাই-বাছাই ছাড়াই অনুমোদন করে দিত।’
আরিয়ার কেমিক্যাল লিমিটেড, মীম ট্রেডিং করপোরেশন, কণিকা এন্টারপ্রাইজ, মুন এন্টারপ্রাইজ, এন্ডবি ট্রেডিং, আরবি এন্টারপ্রাইজ, জিঅ্যান্ডজি এন্টারপ্রাইজ, বর্ণ, উইনটেল করপোরেশন লিমিটেড, সন্দীপ করপোরেশন, সুখাদা প্রপার্টিজ লিমিটেড, হাল ইন্টারন্যাশনাল, আনান কেমিক্যাল লিমিটেড, নিউট্রিক্যাল লিমিটেড, নিউটেক এন্টারপ্রাইজ, ন্যাচার এন্টারপ্রাইজ, এসএ এন্টারপ্রাইজ এসব পিকে হালদারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পত্তির মালিকানার বিষয়ে পিকে হালদারের আত্মীয় ও সহযোগীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং লেনদেন রয়েছে। এমএসটি ফার্মা অ্যান্ড হেলথ কেয়ার লিমিটেড, এমার এন্টারপ্রাইজ, মেরিন এন্টারপ্রাইজ, এমটিবি মেরিন লিমিটেড, জিঅ্যান্ডজি এন্টারপ্রাইজ, মেরিন ট্রাস্ট লিমিটেড হলো নওশেরুল আলম এবং বাসুদের ব্যানার্জীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, যারা পিকে হালদারের ব্যবসায়িক পার্টনার। জেডএ ট্রেডিং হাউজ, দ্রিনান অ্যাপারেলস লিমিটেড হলো জাহাঙ্গীর আলমের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। নওশের, বাসুদেব, জাহাঙ্গীর, সিদ্দিকুর রহমান, উজ্জ্বল কুমার নন্দী ছিলেন পিকে হালদারের বিশ্বস্ত সহযোগী। এ সিন্ডিকেটই মূলত এফএএস ফাইন্যান্স লুট করেছে।
রাসেল শাহরিয়ার বলেন, ‘পিকে হালদার, উজ্জ্বল কুমার নন্দী, সিদ্দিকুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলমের চাপেই মূলত কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই অনেক ক্ষেত্রে কোনো মর্টগেজ না নিয়ে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে একক স্বাক্ষরে কিছু ফাইল বোর্ডে উপস্থাপন করি। বোর্ডে সেগুলোর অনুমোদন হলে পিকে হালদার ও উজ্জ্বল কুমার নন্দীর কথামতো অনুমোদিত ঋণ হিসেবে টাকা বিতরণ না করে পিকে হালদারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট হিসাবে ঋণের টাকা স্থানান্তরের নোট অনুমোদন দিই। ফলে ঋণের টাকা পিকে হালদারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট হিসাবে স্থানান্তরিত হয়েছে। ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক তাদের নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাব থেকে সরাসরি ঋণগ্রহীতাদের অনুকূলে চেক প্রদান করার রীতিনীতি থাকলেও পিকে হালদারের নির্দেশে অর্থের গতিপথ আড়াল করার লক্ষ্যে বিভিন্ন অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের চেক ব্যবহার করে অন্য প্রতিষ্ঠানে অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে।’
জবানবন্দিতে রাসেল আরো জানান, আরিয়ান কেমিক্যাল, মীম ট্রেডিং, কণিকা এন্টারপ্রাইজ, মেরিনট্রাস্ট মুন এন্টারপ্রাইজ, এমার এন্টারপ্রাইজ, আরবি এন্টারপ্রাইজ, জিঅ্যান্ডজি এন্টারপ্রাইজ, বর্ণ, সুখাদা প্রপার্টিজ, আনান কেমিক্যাল, দিয়া শিপিংয়ের নামে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের চেক ব্যবহার করা হয়। নিউটেক এন্টারপ্রাইজ, ন্যাচার এন্টারপ্রাইজ, দিয়া শিপিং, এমটিবি মেরিন, এমার এন্টারপ্রাইজ, জিঅ্যান্ডজি এন্টারপ্রাইজ, মেরিন ট্রাস্ট, এমএসটি ফার্ম অ্যান্ড হেলথ কেয়ারের ঠিকানা একই, যা অস্তিত্বহীন। এ আটটি প্রতিষ্ঠানের নামে ৩৩১ কোটি ১৯ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়। আবার বর্ণ, আরবি এন্টারপ্রাইজ, এসএ এন্টারপ্রাইজ, উইনটেল ইন্টারন্যাশনাল, হাল ইন্টারন্যাশনাল লি., সন্দীপ করপোরেশন নামের এ ছয়টি প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা একই। এসব প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ২৮৫ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। মূলত পিকে হালদারের নির্দেশে এসব অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ দেয়া হয়।










