ঢাকাকে বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য নতুন করে ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপের গেজেট প্রকাশ হয় গত বছরের ২৩ আগস্ট। ২০২২-৩৫ মেয়াদের এ পরিকল্পনাকে পরিবেশবাদীরা সাধুবাদ জানালেও সমালোচনার মুখে পড়ে বিভিন্ন দিক। নতুন ড্যাপ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে। বড় ধরনের আপত্তি জানায় বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট (আইইবি)। এলাকাভিত্তিক ফ্লোর এরিয়া রেশিওকে (এফএআর) বৈষম্যমূলক দাবি করে তা পুনর্বিবেচনার সুপারিশ জানায় স্থপতিদের এ সংগঠন। ভবনের উচ্চতা পুনর্বিবেচনায় তাই অনেকটা চাপের মুখেই কারিগরি কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। একটি মাত্র সংগঠনের সুপারিশে এ কমিটি গঠন প্রক্রিয়াটি অবশ্য বিতর্কের জন্ম দিয়েছে বলে মনে করছেন নগর বিশেষজ্ঞরা।

রাজউক সূত্রে জানা গেছে, ড্যাপ রিভিউর জন্য গত ১৭ জানুয়ারি এক অফিস আদেশের মাধ্যমে কারিগরি কমিটি গঠন করে সংস্থাটি। সেই অফিস আদেশে বলা হয়, ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রণীত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (২০২২-৩৫) গত ২৩ আগস্ট গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার কতিপয় বিষয় পুনর্বিবেচনার জন্য বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সুপারিশমালার ওপর আলোচনাপূর্বক ড্যাপ রিভিউ সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি বরাবর উপস্থাপনের জন্য ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হলো।’ ড্যাপ রিভিউর জন্য গঠিত ওয়ার্কিং কমিটিতে মতামত দেয়ার জন্য ১১ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউ অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) দুজন প্রতিনিধি, আইইবির দুজন প্রতিনিধি, ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইইবি) দুজন প্রতিনিধি থাকবেন। এছাড়া রাজউক থেকে চেয়ারম্যান, পরিকল্পনা সদস্য, উন্নয়ন সদস্য, উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ সদস্য, নগর স্থপতি, উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-১ সদস্য ও দুজন নগর পরিকল্পনাবিদকেও কমিটিতে রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক ও রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তিন বছর পরপর ড্যাপ রিভিউর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ড্যাপে বলা আছে, কোনো বিশেষ কারণে বা বাস্তবতা দেখা দিলে এর আগেও রিভিউ করা যাবে। সে নির্দেশনার আলোকেই ড্যাপ রিভিউর জন্য কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে।’

জানা গেছে, স্থপতি ইনস্টিটিউটের বড় আপত্তি ছিল ড্যাপের এফএআর নিয়ে। বিশেষ করে রাজউকের আওতাধীন অনেক এলাকায় ভবনের উচ্চতা কম দেয়া হয়েছে। ফলে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে শুরু থেকেই সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাড্ডার মতো অনুন্নত এলাকায় ভবনের উচ্চতা ছিল আগে ছয়তলা পর্যন্ত। কিন্তু বর্তমান ড্যাপে সেখানে ভবনের উচ্চতা দেয়া হয়েছে চারতলা। অন্যদিকে ঠিকই গুলশান-বারিধারার মতো এলাকায় ভবনের উচ্চতাসীমা ছয়-আটতলা দেয়া হয়েছে। ড্যাপ গেজেট হওয়ার আগে যারা বাড্ডার মতো এলাকায় ছয়তলা ভবন নির্মাণ করেছে, এখন তার পাশের জমির মালিককে ভবন বানাতে হবে চারতলা করে। এতে জমির মালিককে ঠকানো হচ্ছে। সুতরাং ড্যাপ সংশোধন করে এ বৈষম্য দূর করা জরুরি। এছাড়া ড্যাপে বর্ণিত জল বিনোদন কেন্দ্রের স্থান সুর্নিদিষ্ট করার সুপারিশ করা হলেও সেটা সুনির্ধারিত নয়। এগুলোও স্পষ্ট করার সুপারিশ ছিল আইইবির পক্ষ থেকে।

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে আইইবি সভাপতি অধ্যাপক ড. খন্দকার সাব্বির আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শুরুর দিকে এফএআর বড় বিষয় হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছিল। এখন আমরা ড্যাপের অন্য যেসব অসংগতি আছে সেগুলো সংশোধনের বিষয়েও জোর দিচ্ছি। অনেক এলাকা আছে যেখানে এফএআর বাড়ানোর সুযোগ আছে। আবার যেসব এলাকাকে অনুন্নত বলে এফএআর কম দেয়া আছে, সেখানে নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়ে কী করণীয় সে বিষয়েও আমাদের জানানো হোক। অনুন্নত এলাকা বলে কোনো এলাকাকে তো নাগরিক সুবিধা থেকে দূরে রাখার সুযোগ নেই। অংশীজন সবাইকে নিয়ে আমরা আরো গভীরভাবে ড্যাপ পর্যালোচনা করছি, তারপর একটি প্রতিবেদন পেশ করব। আমাদের লক্ষ্য থাকবে ড্যাপের মাধ্যমে বৃহৎ জনগোষ্ঠী যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, পাশাপাশি ঢাকাকে আরো বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলা।’

কেবল একটি সংগঠনের সুপারিশমালা আমলে নিয়ে কেন রাজউক কমিটি গঠন করল—এ বিষয়ে জানতে চাইলে বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের এ অধ্যাপক বলেন, ‘ড্যাপের বিষয়ে কেবল স্থপতি ইনস্টিটিউটেরই সুনির্দিষ্ট কিছু আপত্তি ছিল। অন্যরা সবাই তো মেনে নিয়েছে। ফলে যার আপত্তি আছে সে-ই তো সুপারিশ করবে। আর কমিটিতে তো অংশীজনদের রাখা হয়েছে। আমাদের এ পদক্ষেপকে ভুল বোঝার কোনো সুযোগ নেই।’

নগর গবেষকরা অবশ্য বলছেন, কেবল স্থপতি ইনস্টিটিউটের সুপারিশমালা আমলে নিয়ে ওয়ার্কিং কমিটি করা রাজউকের উচিত হয়নি। তাদের উচিত ছিল সবার আপত্তি ও সুপারিশমালা বিবেচনায় নিয়ে একটা কমিটি করা। তাহলে কোনো প্রশ্ন উঠত না, বিতর্ক হতো না। ভবনের উচ্চতা ও আবাসিক এলাকায় নাগরিক সুবিধাদি নিশ্চিত করার বিষয়ে রাজউক বারবার একটি গোষ্ঠীর কাছে নতি স্বীকার করেছে বলে অভিযোগ করেছেন ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘শুরুর দিকে ড্যাপে এলাকাভিত্তিক উচ্চতা জোনিংয়ের প্রস্তাব ছিল। পরবর্তী সময়ে একটি গোষ্ঠীর আপত্তির কাছে নতি স্বীকার করে এফএআরে ফিরে আসে রাজউক। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ড্যাপে এলাকাভিত্তিক এফএআর নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু ড্যাপ গেজেট হওয়ার পর তারাই এখন আবার সে সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বলছে, এটির মান বাড়াতে হবে। তাই আমরা মনে করি, রাজউকের মতো একটা প্রতিষ্ঠানকে শহরের টেকসই উন্নয়ন ও বৃহত্তর জনস্বার্থের কথা না ভেবে স্বার্থান্বেষী মহলের চাপের কাছে নতি স্বীকার দুঃখজনক। শুধু ড্যাপ নয়, ঢাকাকে সুন্দরভাবে সাজানোর জন্য যতগুলো পরিকল্পনা সরকার নিয়েছে সবগুলোতেই শেষ পর্যন্ত আবাসন ব্যবসায়ীসহ স্বার্থান্বেষী মহলের ইচ্ছার প্রতিফল ঘটেছে।’

এ নগর পরিকল্পনাবিদ আরো বলেন, ‘নাগরিক সুবিধা ছাড়া বড় বড় অট্টালিকা নির্মাণ করা একটা বাসযোগ্য শহরের মানদণ্ড নয়। বিশ্বের সব শহরে কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক এলাকায় উঁচু ভবন থাকে। আবাসিক এলাকায় ভবনের আকার-আয়তনের নিয়ন্ত্রণ থাকে। এই যে তুরস্কে ভূমিকম্প হলো, এখন নগরে বসবাসের ঝুঁকিসংক্রান্ত আলোচনা চলমান থাকায় ভবনের এফএআর মান বাড়ানোর ব্যাপারে তত্পর মহল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আপাতত শান্ত আছে। কিছুদিন পর যখন সবাই ভূমিকম্প, অগ্নিঝুঁকির কথা ভুলে যাবে তখন আবার তারা উঁচু ভবন তৈরির অধিকার আদায়ে উচ্চকিত হবে। আমরা বারবারই বলেছি, আবাসিক এলাকায় উঁচু ভবন নগর এলাকার অগ্নিঝুঁকি, ভূমিকম্পের ঝুঁকি, সূর্যের আলো ও বাতাসের প্রবাহে বাধা প্রভূত সমস্যার কারণ। সুতরাং রাজউককে অবশ্যই বুঝেশুনে বৃহত্তর জনকল্যাণ, জননিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

ড্যাপ রিভিউ ও ভবনের উচ্চতা বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে ড্যাপের সভাপতি ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফ্লোর এরিয়া রেশিও বা ভবনের উচ্চতা বাড়ানোর কোনো জায়গা যদি থাকে তাহলে ভাবব। আমার কাছে যারা এফএআর বাড়ানোর দাবি নিয়ে এসেছেন সবাইকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়েছি এবং বলেছি, যদি আপনারা দেখাতে পারেন এখানে এই কারণে বা এ যৌক্তিকতায় এফএআর বাড়ানোর প্রয়োজন আছে, তাহলে বাড়িয়ে দেব। আপনাদের দাবি যদি যৌক্তিক হয় তাহলে আমরা কেবিনেট মিটিং করে বিষয়টি উপস্থাপন করব। কেবিনেট মিটিং যদি রাজি হয় তাহলে আমরা করব। আর যদি এফএআর বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা না থাকে তাহলে তো আমি করতে পারব না।’