সংসদ ভবনে গতকাল কমিটির বৈঠক শেষে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী দাবি করেছে, সরকারি দল বিএনপির আপত্তির কারণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে জারি করা গণভোট অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া যায়নি।
অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশে কিছু সংশোধনী আনার প্রস্তাবে আপত্তি আছে বিরোধী দলের।
বিশেষ কমিটির সভাপতি সরকারি দলের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন অবশ্য বলেছেন, তারা গণভোট অধ্যাদেশ রহিতের প্রস্তাব করেননি, রাখার প্রস্তাবও করেননি। তারা বলেছেন, এটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। যেহেতু বিরোধী দল উত্থাপন করেছে, সংবিধানের আলোকে এগুলো আলোচনা করতে হবে। কারণ সংবিধান সবার ঊর্ধ্বে, সংসদ সংবিধান মোতাবেক চলবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এগুলো যাচাই-বাছাই করছে সংসদের বিশেষ কমিটি। গতকাল ছিল কমিটির দ্বিতীয় দিনের বৈঠক। এখন পর্যন্ত ১১৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে বিশেষ কমিটি একমত হয়েছে বলে জানা গেছে। এগুলোর মধ্যে কিছু হুবহু রাখা হবে, কিছু সংশোধিত আকারে রাখা হবে আর কিছু বাদ যাবে। তবে কতটি রাখা হবে আর কতটি বাদ যাবে, তা সুনির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি।
জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বিশেষ কমিটির মুলতবি বৈঠকে এগুলো নিয়ে আলোচনা হলেও সিদ্ধান্ত হয়নি। ২০টি বিষয় নিয়ে আগামী রোববার আবার আলোচনা হবে। যেসব বিষয়ে কমিটিতে ঐকমত্য হবে না, সেগুলো বিল আকারে সংসদে তোলা হবে বলে কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বৈঠকের বিষয়ে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অধ্যাদেশগুলোর বিষয়ে সরকার আন্তরিক। এরই মধ্যে জুলাই যোদ্ধা ও তামাকসহ অনেকগুলো অধ্যাদেশের বিষয়ে আমরা কাজ করেছি। আগামী বৈঠকে এগুলো নিয়ে আবারো আলোচনা হবে। তখন কেউ যদি এখানে কন্ট্রিবিউট করতে চান, তা করতে পারবেন। আমাদের লক্ষ্য হলো অধ্যাদেশগুলোর বিষয়ে এমনভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো, যাতে করে কোনো পক্ষই ক্ষতির মুখে না পড়ে। সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে ৩১ মার্চের মধ্যে আমরা একটি অবস্থানে পৌঁছাব। এর পরই সংসদে উত্থাপন করা হবে। পরবর্তী সময়ে এগুলোর বিষয়ে যা যা করা দরকার সবকিছুই করা হবে।’
কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অংশ নেন কমিটির সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, সংসদ সদস্য ওসমান ফারুক, এএম মাহবুব উদ্দিন, নওশাদ জমির, মুজিবুর রহমান, রফিকুল ইসলাম খান ও গাজী নজরুল ইসলাম।
অধ্যাদেশগুলোর ব্যাপারে দুদিনের আলোচনায় অধিকাংশ বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন।
বৈঠক শেষে জয়নুল আবেদীন সাংবাদিকদের বলেন, ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে মোট ২০টির বিষয়ে ব্যাখ্যা দরকার। এজন্য ২৯ মার্চ রাত সাড়ে ৮টায় আবার বৈঠক হবে। কোন অধ্যাদেশগুলো বাতিল হবে, কোনগুলো গ্রহণ করা হবে সবকিছু নির্ভর করে সংসদের ওপর—এমন মন্তব্য করে কমিটির সভাপতি বলেন, ‘আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছালে আমরা এটা উপস্থাপন করব। অন্যথায় এটা বিল আকারে আনার জন্য আইন রয়েছে, সেই আইন মোতাবেক ব্যবস্থা নেব।’
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান মিয়া বৈঠক শেষে বলেন, ‘১২০টির অধিক বিষয়ে করা বা না করার বিষয়ে একমত হয়েছি। ২৯ মার্চ সব বিষয়ের ওপর আমাদের পর্যালোচনা শেষ হবে বলে আশা করি। এর পরই প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে। একই সঙ্গে এগুলোকে আইনে রূপান্তর করা বা না করার দিকে আমরা এগিয়ে যাব।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘অধ্যাদেশ পাস করতে গেলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সেই বিলগুলো আবার আনবে। সেভাবেই পাস হবে। কিছু অধ্যাদেশের বিষয়ে বিল উত্থাপিত হবে। সেগুলো সংশোধনীসহ পাস হবে। আর যেগুলোয় একমত হবে না সেগুলো এ সেশনে ল্যাপস হয়ে যাবে। প্রয়োজন হলে বিল আকারে পরবর্তী সেশনে উত্থাপন করা যাবে।’
অধ্যাদেশগুলোর অগ্রগতির প্রসঙ্গে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বেশকিছু বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি। আর যেগুলোর বিষয়ে হইনি সেগুলোর বিষয়ে একমত হওয়ার জন্য আমরা আবার বসব। আগামী ২৯ মার্চ পরবর্তী বৈঠকে বসব। ২ এপ্রিলে প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা। সেদিনই আমরা দেব।’
এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, পুলিশ কমিশন ও মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত কিছু বিষয়ে আপত্তি আছে বলে জানান বিরোধী দলের সদস্যরা। বৈঠক শেষে বিশেষ কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুদক এবং গণভোটের বিষয়ে আমরা একমত হইনি। পরে আলোচনা হবে বলে ওনারা জানিয়েছেন। দুই-তৃতীয়াংশের কথা বলে শুধু জুলাই চেতনা নয়, অনেক বিষয়—যেগুলো জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী এগুলোতে আমরা একমত হব না।’
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশনেই এ বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। সেদিন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করেন। পরে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম বরিশাল-৩ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। আগামী ২ এপ্রিলের মধ্যে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছে সংসদ।










