বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া, চুরি ও সিস্টেম লস কমাতে প্রি-পেইড মিটার বসানোর উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। এ পরিকল্পনার এক দশক পেরিয়েছে। তবে সাড়ে ৮ শতাংশের বেশি বাস্তবায়ন করা যায়নি। দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের গ্রাহক চার কোটির কিছু বেশি। এর মধ্যে প্রি-পেইড মিটারে বিদ্যুেসবা নিচ্ছে মাত্র ৩৫ লাখের কিছু বেশি গ্রাহক। ৯০ শতাংশের বেশি গ্রাহক এখনো প্রি-পেইড মিটার সেবার বাইরে। ২০২৫ সাল নাগাদ সরকার বিদ্যুতের সব গ্রাহককে প্রি-পেইড সেবা দেয়ার কথা বলছে। কিন্তু এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর আর্থিক উন্নয়ন ও গ্রাহককে সাশ্রয়ী করতে প্রি-পেইড মিটারের কোনো বিকল্প নেই। তবে গত এক দশকে প্রি-পেইড মিটার নিয়ে বিতরণ কোম্পানি ও সরকারের নানামুখী সিদ্ধান্ত এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বিলম্বিত করেছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র বলছে, বিদ্যুতের প্রি-পেইড মিটার চালু করার সিদ্ধান্ত হয় মূলত ২০১০ সালে। এরপর ২০১৬ সালের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২১ সালের মধ্যে অন্তত দেড় কোটি গ্রাহককে প্রি-পেইড মিটার সুবিধা দেয়ার কথা। আর ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের সব বিদ্যুতের গ্রাহককে প্রি-পেইড মিটার সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা। কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত দেখা গেছে ছয়টি বিতরণ কোম্পানির আওতায় ৩৫ লাখের কিছু বেশি গ্রাহক এ সুবিধায় বিদ্যুেসবা পাচ্ছে।

বিতরণ কোম্পানিগুলো বলছে, প্রি-পেইড মিটার বসানোর কারিগরি জটিলতা, মিটার রিডারদের বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে স্মার্ট প্রি-পেইড মিটারের কারিগরি স্পেসিফিকেশনসহ নানা কারণে এ কাজ বিলম্ব হয়। তবে এখন কাজে গতি এসেছে।

দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়তে শুরু করলে ২০১৪ সাল থেকে প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের কাজে তোড়জোড় শুরু হয়। বাংলাদেশ বিদ্যুতায়ন বোর্ড শুরুতেই প্রি-পেইড মিটার বসানো শুরু করে। এরপর পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা আরো পাঁচটি কোম্পানি প্রি-পেইড মিটার বসানো শুরু করে। তবে গত সাত বছরে সরকারের প্রি-পেইড মিটার বসানোর পরিকল্পনা খুব বেশি এগোয়নি।

জানা গেছে, দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের গ্রাহক সংখ্যা ৪ কোটি ১ লাখ। ছয়টি বিতরণ কোম্পানির মোট ৩৫ লাখের বেশি গ্রাহক প্রি-পেইড/স্মার্ট প্রি-পেইড মিটার সুবিধার আওতায় এসেছে। এখনো ৩ কোটি ৬৬ লাখ গ্রাহক এ সুবিধার বাইরে। সুবিধা থাকলেও সিংহভাগ গ্রাহক এ সুযোগের বাইরে রয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের সিনিয়র এক কর্মকর্তা এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারের লক্ষ্যমাত্রা আগামী ২০২৫ সাল নাগাদ বিদ্যুতের সব গ্রাহককে স্মার্ট প্রি-পেইড মিটার সুবিধার আওতায় আনা। কিন্তু শুরুতেই এ ধরনের একটি প্রযুক্তি বাস্তবায়নে বেশ সময় লেগে যায়। তবে স্মার্ট প্রি-পেইড মিটার বসাতে বিতরণ কোম্পানিগুলো এখন তাদের নিজস্ব অর্থায়নে কাজ শুরু করেছে।

বিতরণ কোম্পানিগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রি-পেইড মিটার বাস্তবায়নে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। সংস্থাটির ৩ কোটি ১৮ লাখ গ্রাহকের মধ্যে প্রি-পেইড মিটার পেয়েছে মাত্র ১১ লাখ গ্রাহক, যা মোট গ্রাহকের মাত্র ৩ শতাংশ। অথচ পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২১ সালের মধ্যে সংস্থাটির অন্তত এক কোটি গ্রাহক প্রি-পেইড মিটারের আওতায় আসার কথা ছিল।

ঢাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে নিয়োজিত ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) বর্তমান গ্রাহক সংখ্যা সাড়ে ১৪ লাখ। সংস্থাটির গ্রাহকদের মধ্যে মাত্র পাঁচ লাখ গ্রাহক স্মার্ট প্রি-পেইড মিটার সেবার আওতায় এসেছে। এছাড়া ঢাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে নিয়োজিত আরেক কোম্পানি ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) গ্রাহক সংখ্যা ১০ লাখ। সংস্থাটির মোট গ্রাহকের মধ্যে ৩ লাখ ২১ হাজার গ্রাহক প্রি-পেইড মিটার সেবা পাচ্ছে।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণে নিয়োজিত রয়েছে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো)। সংস্থাটির ১২ লাখ গ্রাহকের মধ্যে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১ লাখ ৪৮ হাজার গ্রাহক স্মার্ট প্রি-পেইড মিটার পেয়েছে। এছাড়া প্রি-পেইড মিটার পেয়েছে ৭৩ হাজার গ্রাহক, যা সংস্থাটির মোট গ্রাহকের ১৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

উত্তরাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণে নিয়োজিত রয়েছে নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (নেসকো)। সংস্থাটির গ্রাহক সংখ্যা ১৭ লাখ। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১ লাখ গ্রাহক প্রি-পেইড/স্মার্ট প্রি-পেইড সুবিধার আওতায় এসেছে।

নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকিউল ইসলাম এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, প্রি-পেইড মিটার নিয়ে আমরা অনেক আগ থেকেই কাজ শুরু করেছি। কিন্তু সেটি ছোট পরিসরে। তবে এখন বড় আকারে কাজ শুরু করতে যাচ্ছি। এরই মধ্যে পাঁচ লাখ প্রি-পেইড মিটার বসাতে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। রাজশাহী, দিনাজপুর ও নীলফামারী অঞ্চলে এসব মিটার বসবে।

প্রি-পেইড মিটার বসাতে সরকারের পরিকল্পনায় নানামুখী সংকট তৈরি হয় বলে জানান বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা। তারা বলেন, টেন্ডারের মাধ্যমে প্রি-পেইড মিটার আমদানিতে দু-তিনটি বিতরণ কোম্পানির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী দেশে প্রি-পেইড মিটার তৈরির কারখানা স্থাপন ও বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে মিটার আমদানির অনুমতি দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু মিটারের স্পেসিফিকেশন নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়াসহ নানা কারণে এসব উদ্যোগ বিলম্বিত হয়।

দেশে বিদ্যুতের প্রি-পেইড/স্মার্ট প্রি-পেইড মিটার তৈরিতে কাজ করছে বাংলাদেশ স্মার্ট ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (বেসিকো)। ওজোপাডিকো ও চীনা কোম্পানি হেক্সিং ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড যৌথভাবে কোম্পানি গঠন করে এ কাজ করছে। তবে বেসিকো প্রি-পেইড মিটার উৎপাদন ক্ষমতা কম হওয়ায় দেশীয় বিতরণ কোম্পানিগুলো বেসিকোর কাছ থেকে খুব বেশি সুবিধা নিতে পারছে না। বার্ষিক দেড় লাখ মিটার উৎপাদন ক্ষমতা থাকায় খুব বেশি সুযোগ কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

বেসিকোর কর্মকর্তা ও ওজোপাডিকোর কোম্পানি সচিব আবদুল মোতালেব বণিক বার্তাকে বলেন, বেসিকোর মূলত যে কারখানা, সেখানে উৎপাদন ক্ষমতা কম। গত দেড় বছরে ১ লাখ ৮০ হাজারের মতো মিটার তৈরি করেছে, যা ওজোপাডিকো বিতরণ অঞ্চল খুলনা ও আশপাশের বেশকিছু এলাকায় ইনস্টল করছে। তবে বৃহৎ পরিসরে মিটার তৈরি করার কথা জানালেও চাহিদা তৈরি না হওয়ায় তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না বলে স্বীকার করেন তিনি।

প্রি-পেইড মিটার কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে আছে বিদ্যুৎ বিভাগের নীতি-গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেল। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুতের লাইফলাইন গ্রাহকদের (যারা ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন) প্রি-পেইড মিটার লাগবে না। এমন গ্রাহক আছে এক কোটি। বাকি তিন কোটি গ্রাহককে প্রি-পেইড মিটারের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে।

পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, প্রি-পেইড মিটার কার্যক্রম পরিচালনায় প্রযুক্তিগত কাঠামো উন্নয়নে সময় লেগেছে। তাই শুরুতে মিটার স্থাপনে গতি কম দেখা গেছে। এখন সব বিতরণ কোম্পানি প্রি-পেইড মিটারের প্রকল্প গ্রহণ করছে। বিতরণ কোম্পানিগুলোর নিজস্ব অর্থায়ন, বিদেশী দাতা সংস্থার অর্থায়নে এ কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

বিদ্যুতের প্রি-পেইড মিটার বিতরণ সংস্থার পক্ষ থেকে সরবরাহ করা হলেও গ্রাহকের কাছ থেকে মূল্য কিস্তিতে আদায় করা হয়। প্রতি মাসে মিটারের জন্য ৪০ টাকা পরিশোধ করতে হয় গ্রাহককে। এছাড়া গ্রাহক চাইলে নিজেও মিটার কিনতে পারেন। বেসরকারি তিনটি কোম্পানিকে খোলাবাজারে মিটার বিক্রির অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন প্রযুক্তি হিসেবে বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগলেও কাজে গতি থাকা উচিত। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, যেকোনো নতুন প্রযুক্তি বাস্তবায়নে শুরুতে সময় লাগাটাই স্বাভাবিক। তবে গত কয়েক বছরে অন্তত সন্তোষজনক অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গ্রাহক বিবেচনা এবং বিতরণ কোম্পানিগুলোর আর্থিক কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে এটি দ্রুতই এগিয়ে নেয়ার কথা সরকারের।