উজানের পানির সঙ্গে আসা বিপুল পরিমাণ বালি ও পলিতে ভরাট হচ্ছে তিস্তার তলদেশ। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দশকে নদীটির তলদেশ ভরাট হয়েছে দুই থেকে আড়াই মিটার। তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানির প্রবাহ একটু বাড়লেই উপচে পড়ছে নদীর দুই তীর। সৃষ্টি হচ্ছে বন্যা পরিস্থিতি। ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ছে কৃষিজমি, ঘরবাড়িসহ নদীতীরবর্তীদের জীবন-জীবিকা। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ হারিয়ে প্রায় শুকিয়ে যাচ্ছে নদী। তিস্তার পানিপ্রবাহের সংকট সমাধানের পাশাপাশি যথাযথ নদী ব্যবস্থাপনা ছাড়া এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নিয়মিত ড্রেজিংসহ যথাযথ নদী ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতি বছরই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত দেশের অন্যান্য স্থানের মতো তিস্তা অববাহিকায়ও বন্যা-খরাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা বাড়িয়েছে।
তলদেশ ভরাট হয়ে পড়ায় বাধ্য হয়ে তিস্তার বন্যাকালীন পানিপ্রবাহের বিপত্সীমার মাত্রা বাড়িয়েছে পাউবো। লালমনিরহাটে তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে নিয়োজিত পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আসফাউদ দৌলা বণিক বার্তাকে বলেন, ১৯৯০ সালে তিস্তা সেচ প্রকল্প চালু করা হয়। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৩২ বছরে তিস্তার তলদেশ ভরাট হয়ে কোথাও কোথাও দুই মিটার আবার আড়াই মিটার উঁচু হয়েছে। ফলে উজানি ঢলে বা সামান্য বৃষ্টিপাতেই প্রবল বন্যা দেখা দিচ্ছে। নদীর বুকে পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় এখানে বন্যার পানিপ্রবাহের বিপত্সীমা নির্দেশক ৫২ দশমিক ৪০ থেকে বাড়িয়ে ৫২ দশমিক ৬০ সেন্টিমিটার করা হয়েছে। এতেই বোঝা যায় নদীটির তলদেশ কী পরিমাণ ভরাট হয়েছে। এখন তো আরো বেশি ভরাট হচ্ছে। প্রবাহ একটু বাড়লেই দুই তীর উপচে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ে। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত বন্যা দেখা দেয়। এতে কৃষক ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়াসহ অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
বর্ষাকালে প্রতিবেশী দেশ ভারতে তিস্তা বাঁধের স্লুইস গেটগুলো খুলে দেয়া হলে শুষ্ক এ নদীই প্রমত্তা হয়ে ওঠে। তীব্র স্রোতে তলদেশ ভরাট হয়ে পড়া নদীর দুই কূলে বন্যার পাশাপাশি দেখা দেয় মারাত্মক ভাঙন। এরই মধ্যে নদীভাঙনে তীরবর্তী অনেক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছে। তিস্তার অব্যাহত ভাঙনে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলাভুক্ত দহগ্রাম ইউনিয়নের মানচিত্র ছোট হয়ে আসছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান। জরুরি ভিত্তিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া এ অবস্থা থেকে উত্তরণের আর কোনো পথ নেই বলে মনে করছেন তিনি।
স্থানীয়দের বিপরীত বিড়ম্বনা দেখা দেয় শুষ্ক মৌসুমে। এ সময় প্রতিবেশী দেশের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে পানিপ্রবাহ হারিয়ে প্রায় শুকিয়ে যায় তিস্তা। কোনো কোনো স্থানে নদীর প্রশস্ততা নেমে আসে ৩০-৪০ গজেরও নিচে। নদী ভরাট ও পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় তিস্তার বুকে স্থানে স্থানে জেগে ওঠে চর।
তিস্তার ভাঙনে বাস্তুচ্যুত শত শত পরিবার এখন এসব চরে বসতি গড়ে তুলেছে। চরে সবজির পাশাপাশি এখন ধান, ভুট্টা, গম, সরিষা, বাদাম, রসুন, পেঁয়াজ, মরিচের আবাদ হচ্ছে। তবে এসব কৃষিপণ্যের আবাদ, উৎপাদন ও মূল্য নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান এখনো পাওয়া যায়নি।
গত কয়েক দশকে হাতীবান্ধা উপজেলার ডাউয়াবাড়ী ইউনিয়নে তিস্তার বুকে অনেক চর জেগে উঠেছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মশিউর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, তিস্তা নদীর যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। উজান থেকে পলি-বালি এসে নদীটির তলদেশ ভরাট হয়ে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টিপাতেই এখন বন্যার প্রাদুর্ভাব হচ্ছে। ফসলহানি ঘটছে কৃষকের। ভেঙে পড়ছে যোগাযোগ অবকাঠামো। এগুলো মেরামত ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা করতে গিয়ে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
একই কথা বললেন হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা সেচ প্রকল্প এলাকার ইউপি চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আবু বক্কর সিদ্দিক শ্যামল। তিনি বলেন, আমার ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ প্রতি বছর বন্যার সময় সীমাহীন ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। আবার জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত ও ভারতের একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহারের কারণে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদী শুকিয়ে গিয়ে এ অঞ্চল প্রায় মরুভূমিতে পরিণত হয়। তিস্তাপারের দুই তীরের মানুষ এখন কঠিন দুর্যোগ মোকাবেলা করে জীবনযাপন করছে।
তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ১১৫ কিলোমিটার। এ অংশে নদীটির বিস্তৃত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুজ্জীবনে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এজন্য ‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিস্টোরেশন’ শীর্ষক একটি প্রকল্পও হাতে নেয়া হয়েছে। নদীতীরবর্তী মানুষের দুর্দশা দূর করতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা তথা প্রকল্পটি বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ এখন জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় কৃষি বিভাগও মনে করছে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে এ অঞ্চলের কৃষিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। এ বিষয়ে লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. হামিদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, যদি দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলার পাশাপাশি কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও রংপুর জেলার মানুষও সুফল পাবে। নদীর দুই তীরে হাজার হাজার একর আবাদি জমি উদ্ধার করা সম্ভব হবে। মৎস্য চাষের পাশাপাশি এখানে স্বল্প খরচে সেচ সুবিধা পাওয়া যাবে। বন্যা থেকে কৃষি ও কৃষক রেহাই পাবেন। সব মিলিয়ে ব্যাপক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটবে, জীবনমান বদলে যাবে।
নদী প্রশস্তকরণ, দুই তীরে বাঁধ নির্মাণ, ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে গভীরতা বৃদ্ধি ও ভূমি পুনরুদ্ধারকে কেন্দ্র করে তিস্তা মহাপরিকল্পনাটি সাজানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও পাউবো কর্তৃপক্ষ বলছে, এখনো তিস্তা মহাপরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
রিভারাইন পিপলের পরিচালক এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বণিক বার্তাকে বলেন, প্রতি বছর বন্যা, ভাঙন বা শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে তিস্তা নদী অববাহিকায় ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে যে পরিমাণ ব্যয় হবে, অর্থনৈতিকভাবে তার চেয়ে অনেক বেশি সাশ্রয় হবে।










