দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের ৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থীই চলমান পাঠদান পদ্ধতি নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। এমনকি খোদ শিক্ষকদের ২৯ শতাংশও বর্তমান পাঠদান পদ্ধতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

শ্রেণীকক্ষের পাঠদানে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ করার সুযোগ কেমন? শিখন-শেখানো প্রক্রিয়ায় একজন শিক্ষার্থীর নিজের মতো করে চিন্তা বা প্রশ্ন করার সুযোগই বা কতটুকু?—এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ছোট পরিসরে ওই গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে নায়েম। গবেষণা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কয়েকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাক্ষাত্কার নেয়া হয়। আয়োজন করা হয় দলগত আলোচনার। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ সাক্ষাত্কারও নিয়েছে গবেষক দল।

গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীরা শিক্ষক কিংবা সহায়ক বইয়ের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের চিন্তার ভিত্তিতে শিখতে পারলে সেটি বেশি ইতিবাচক বা ফলপ্রসূ হয়। যদিও খুব কমসংখ্যক শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের নিজেদের মতো চিন্তা করতে উৎসাহিত করেন। বিভিন্ন ধরনের মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও শিক্ষক নির্ধারিত নিয়ম বা সহায়ক বই অনুসারেই শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর লিখতে হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গবেষক দলের সদস্য ও নায়েমের প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ শেখ মোহাম্মদ আলী বণিক বার্তাকে বলেন, দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো অনেকটাই মুখস্থনির্ভর। সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হওয়ার পর এ বিষয়ে কিছুটা সচেতনতা তৈরি হলেও প্রয়োগের ক্ষেত্রে চিত্র অনেকটা আগের মতো। অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের নতুন নতুন উপায়ে শেখানোর চেষ্টা করছেন। বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগের মতোই মুখস্থনির্ভর পাঠদান চলছে। এ প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে আসতে সবার আগে শিক্ষকদের প্রশিক্ষিত ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। সম্মানজনক বেতন-ভাতা প্রদানের মাধ্যমে মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় নিয়ে আসতে হবে। দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও শিক্ষকতাকে উপভোগ করেন, এমন শিক্ষক ছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।

ক্রিটিক্যাল থিংকিং (সিটি) বা সৃষ্টিশীল ও চিন্তার বৈচিত্র্য বিষয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কেমন ধারণা রয়েছে, সেটিও দেখার চেষ্টা করেছে গবেষক দল। শিক্ষকদের মধ্যে ৭১ দশমিক ৪২ শতাংশ সূক্ষ্ম বা বিশ্লেষণাত্মক চিন্তা বিষয়ে অবগত। অর্থাৎ শিক্ষকদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সূক্ষ্ম চিন্তা বিষয়ে অবগত নন। আবার অবগত থাকা শিক্ষকরাও শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ করেন না বলে গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

আর বিশ্লেষণাত্মক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ চিন্তার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে শিক্ষার্থীরা। গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, সূক্ষ্ম চিন্তা, চিন্তার বৈচিত্র্য ও সৃষ্টিশীলতা, বৃত্তের বাইরে চিন্তা, যৌক্তিকতা—এসব বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা রাখে ৮৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ শিক্ষার্থী। গবেষণাপত্রে একজন শিক্ষার্থীর উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে এভাবে—‘আমরা সাধারণত পরীক্ষায় কীভাবে ভালো নম্বর পাওয়া যায়, সেখানে গুরুত্ব দিই। আমাদের পরিবার, শিক্ষক ও অন্যদেরও একই জায়গায় নজর থাকে। অন্য আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় চিন্তার দক্ষতা বা যোগ্যতাকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। এজন্য আমরাও এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেয়ার উৎসাহ পাই না।’

শ্রেণীকক্ষে ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ প্রক্রিয়া প্রয়োগের বিভিন্ন বাধার কথা তুলে ধরা হয়েছে নায়েমের ওই গবেষণা প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, শিক্ষকদের বেশির ভাগই মনে করেন, মানসিকতা ও যোগ্যতার অভাব, শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহ, সময়স্বল্পতা, মুখস্থনির্ভর পাঠ উপকরণ, অতিরিক্তসংখ্যক পরীক্ষা, বড় আকারের শ্রেণীকক্ষ ও সঠিক পরিকল্পনার অভাবেই শ্রেণীকক্ষে সৃষ্টিশীলতা কিংবা অংশগ্রহণমূলক পাঠদান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

একজন শিক্ষকের উদ্ধৃতি উল্লেখ করে গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ‘শিক্ষকদের ওপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিলেবাস শেষ করা এবং শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় ভালো নম্বর নিশ্চিত করার একটি বড় চাপ থাকে। সুতরাং আমাদের সবারই লক্ষ্য থাকে পরীক্ষা ও নম্বর। যেহেতু প্রচলিত মূল্যায়ন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের ক্রিটিক্যাল থিংকিং অ্যাবিলিটির জন্য আলাদা কোনো মূল্যায়ন পদ্ধতি নেই।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক এসএম হাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমান শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যক্রমে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার সুযোগ নেই, এটি বলা ঠিক হবে না। মূল সমস্যা হলো, শিক্ষাক্রম বিষয়েই অনেক শিক্ষকের স্বচ্ছ ধারণা নেই। কোন প্রক্রিয়ায় পাঠদান দিতে হবে, কতক্ষণ পড়াতে হবে—এগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু শিক্ষকদের এসব বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা ও প্রশিক্ষণ না থাকায় শ্রেণীকক্ষের পাঠদানে এর বাস্তবায়ন ঘটছে না।