বুড়িগঙ্গায় ২০২০ সালের ২৯ জুন মর্নিং বার্ড লঞ্চডুবির ঘটনায় দায়ী ময়ূর-২ লঞ্চ নৌপথে চলাচল শুরু করেছে। বর্তমানে লঞ্চটি পূর্ব শিডিউল অনুযায়ী ঢাকা-চাঁদপুর রুটে চলাচল করছে। লঞ্চটির দুই মাস্টার এখনো কারাগারে থাকলেও মালিক জামিনে রয়েছেন।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্রে জানা গেছে, ময়ূর-২ লঞ্চটি ঢাকা-চাঁদপুর রুটে নিয়মিত চলাচল করছে। বিআইডব্লিউটিএর নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ময়ূর-২ লঞ্চটির মাস্টাররা এখনো কারাগারে আছেন। তবে মালিক জামিনে বেরিয়েছেন। তিনি আদালতে আবেদন করলে আদালত লঞ্চটি তার জিম্মায় রাখার অনুমতি দেন।

এর আগে বুড়িগঙ্গা নদীতে মোটর লঞ্চ মর্নিং বার্ডডুবিতে প্রাণহানির মামলায় ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক মোসাদ্দেক হামিদ ছোয়াদসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদরঘাট নৌ থানার এসআই শাহিদুল আলম গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে এ অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

মালিক মোসাদ্দেক হামিদ ছোয়াদ ছাড়াও অভিযোগপত্রভুক্ত অন্য আসামিরা হলেন ময়ূর-২ লঞ্চের মাস্টার আবুল বাশার মোল্লা, সহকারী মাস্টার জাকির হোসেন, চালক শিপন হাওলাদার, শাকিল হোসেন সিপাই, সুকানি নাসির মৃধা, মো. হূদয় হাওলাদার, সুপারভাইজার আব্দুস সালাম, সেলিম হোসেন হিরা, আবু সাঈদ ও দেলোয়ার হোসেন সরকার।

২০২০ সালের ২৯ জুন ঢাকার শ্যামবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চডুবিতে ৩৪ জনের মৃত্যুর ওই ঘটনা সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এমএল মর্নিং বার্ড নামের লঞ্চটি মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে যাত্রী নিয়ে সদরঘাটের দিকে আসছিল। সকাল সোয়া ৯টার দিকে শ্যামবাজারের কাছে নদীতে ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় সেটি ডুবে যায়। ঘটনাটি ওই সময় সদরঘাটের একটি সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। ভিডিওটি দেখে নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী সে সময় বলেছিলেন, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, হত্যাকাণ্ড।

‘অবহেলাজনিত মৃত্যু’ ঘটানোর অভিযোগ এনে ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক, মাস্টারসহ সাতজনের বিরুদ্ধে ওইদিনই মামলা করেছিলেন নৌ-পুলিশ সদরঘাট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ শামসুল। তদন্তে নেমে পুলিশ মোসাদ্দেক হামিদ ছোয়াদসহ আটজনকে গ্রেফতার করে। পরে তাদের কয়েকজন জামিনও পান।

ওই ঘটনায় নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি প্রাণহানির পেছনে নয়টি কারণ চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে ২০ দফা সুপারিশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় মর্নিং বার্ড ডুবে গেছে এটা ‘নিশ্চিত’। তবে যেহেতু এ ঘটনায় মামলা হয়েছে, তাই দায়ী কে তা তদন্ত করে বের করা হবে।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে করা সুপারিশে সদরঘাট থেকে ভাটিতে সাত-আট কিলোমিটার এবং উজানে তিন-চার কিলোমিটার অংশে বার্থিং উঠিয়ে দেয়ার কথা বলা হয়। এ অংশে পন্টুন ছাড়া কোথাও নৌযান নোঙর করে রাখা যাবে না বলে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে সদরঘাট টার্মিনালের আশপাশে কোনো খেয়াঘাট রাখা যাবে না উল্লেখ করে বলা হয়, ওয়াইজঘাটের উজানে খেয়াঘাট স্থানান্তর করা যেতে পারে।


লঞ্চের সামনে, পেছনে, মাস্টার ব্রিজ, ইঞ্জিন রুম ও ডেকে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর সুপারিশ করে তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, মাস্টারের দেখার সুবিধার জন্য ব্যাক ক্যামেরার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া লঞ্চে পর্যায়ক্রমে ওয়াকিটকি ব্যবহার চালু করতে হবে।

সুপারিশে ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচল বন্ধ ও প্রত্যেক লঞ্চে পর্যাপ্ত জীবন রক্ষাকারী লাইফ জ্যাকেট ও লাইফ বয়া রাখার কথা বলা হয়। সব নদীপথে বিভিন্ন নৌযানের গতিসীমা নির্ধারণ করে দেয়ার পাশাপাশি ঢাকা সদরঘাটে নৌযানের গতি নিয়ন্ত্রণের জন্য টাওয়ার ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে বলে এতে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া নৌযানে যাত্রীদের বিশেষ করে শিশু, নারী, বয়স্ক যাত্রীদের ওঠা-নামার সুবিধার্থে গ্যাংওয়ে বা ব্রিজ স্থাপন বাধ্যতামূলক করতে বলা হয়েছে সুপারিশে।

লঞ্চে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত টিকিট বিক্রি বন্ধের সুপারিশ করে তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে আরো বলা হয়, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের সুযোগ বন্ধের জন্য কেবিন ও ডেকের যাত্রীর সংখ্যা নির্ধারণ করে সব টিকিট অনলাইনে বিক্রির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

নৌ আইন অমান্যকারীদের শাস্তির মেয়াদ ও জরিমানার পরিমাণ যুগোপযোগী করে আইন সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি নৌকর্মীদের প্রশিক্ষণ ফলপ্রসূ করার জন্য বিআইডব্লিউটিএর কার্যকর ভূমিকার ওপর জোর দেয়া হয় সুপারিশে। সর্বোপরি নৌযানের ফিটনেস ও নৌকর্মীদের যোগ্যতা সনদ দেয়ার ক্ষেত্রে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের আরো কঠোর ভূমিকা নেয়া প্রয়োজন বলে এতে উল্লেখ করা হয়।