অনেক দিন থেকেই বাংলাদেশের ধনিক শ্রেণীর অবকাশযাপনের অন্যতম প্রধান গন্তব্য দুবাই। ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি প্রশান্তির খোঁজে দুবাই ছুটছেন দেশের ব্যবসায়ীরাও। গত কয়েক বছরে এ তালিকায় পদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিনোদন অঙ্গনের তারকারাও যুক্ত হয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে দুবাইয়ে ভ্রমণে যাওয়া প্রভাবশালীদের আতিথেয়তার দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ মাহতাবুর রহমান নাসির। ১৯৮১ সাল থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সবচেয়ে বড় এ শহরে বসবাস করছেন তিনি। বাংলাদেশী এ ব্যবসায়ী দুবাইভিত্তিক আল-হারামাইন নামের একটি পারফিউম কোম্পানির স্বত্বাধিকারী। বর্তমানে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের দুবাইয়ে পুনর্বাসনের দায়িত্বও পালন করছেন মাহতাবুর রহমান।
গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তা কিংবা প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা দুবাই গিয়ে মাহতাবুর রহমানের আতিথেয়তায় থাকছেন। অতিথিদের থাকা-খাওয়ার পাশাপাশি বিনোদনের ব্যবস্থাও করছেন তিনি। নিজের বিলাসবহুল ‘রোলস রয়েস’ গাড়ি অতিথিদের চালাতে দিচ্ছেন অবলীলায়। পাশাপাশি আরব শেখদের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগও মিলছে তার কল্যাণে। দুবাইয়ে মাহতাবুর রহমানের আতিথেয়তা গ্রহণ করা বেশ কয়েকজন বাংলাদেশী ব্যবসায়ী, ব্যাংকার ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গত এক দশকে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের প্রভাবশালীদের সঙ্গে মাহতাবুর রহমান নাসিরের সখ্য বেড়েছে। এর মধ্যে যেমন আছেন আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারণী ভূমিকায় থাকা কর্তাব্যক্তিরা, তেমনি আছেন প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় যুক্ত প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তারাও। সম্প্রতি এ তালিকায় দেশ-বিদেশের বিনোদন ও মডেলিং জগতের তারকারাও যুক্ত হয়েছেন। চাহিদা অনুযায়ী প্রত্যেকের কাজের সুরাহা করে দিচ্ছেন এ ব্যবসায়ী। এমনকি দুবাই থেকেই বাংলাদেশের অনেক করপোরেট বিরোধ মীমাংসার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও রাখছেন মাহতাবুর রহমান। বিবদমান দুই পক্ষই দুবাইয়ে গিয়ে এ ব্যবসায়ীর আতিথেয়তা থেকে সমঝোতায় পৌঁছাচ্ছে বলে জানা গেছে।
দীর্ঘদিন বসবাসের সুবাদে দুবাইয়ের সব গলিপথ চেনাজানা মাহতাবুর রহমানের। তাই বাংলাদেশী প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা দুবাইয়ে গিয়ে তার দ্বারস্থ হচ্ছেন। ব্যবসার উদ্দেশ্যে যেসব বাংলাদেশী দুবাই যাচ্ছেন, তাদের অর্থসংস্থানের পথ দেখানো, কাগজপত্র জোগাড় করে দেয়া থেকে শুরু করে সব কাজেই ভরসা হয়ে উঠেছেন মাহতাবুর রহমান। তার ঘনিষ্ঠজনরা বলছেন, মাহতাবুর রহমান দুবাইয়ে বাংলাদেশী ‘বিজনেস শোফার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
মাহতাবুর রহমান নিজেও স্বীকার করছেন দুবাইগামী বাংলাদেশীদের সহযোগিতা ও আতিথেয়তার কথা। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, কেউ সাহায্য-সহযোগিতা চাইলে তা করতে ভালো লাগে। দুবাই এখন বিশ্বের অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এজন্য বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের অনেকেই এখন দুবাই আসছেন। তাদের কেউ পরামর্শ ও সহযোগিতা চাইলে তা করছি। এতে দোষের কিছু তো দেখছি না।
মাহতাবুর রহমান বলেন, আগে এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল সিঙ্গাপুর। বর্তমানে সিঙ্গাপুরের স্থান দুবাই দখলে নিয়েছে। দুবাইয়ে বড় অংকের অর্থ বিনিয়োগ করে কোনো লাভ নেই। তবে এখানে বসে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে ব্যবসা করা সম্ভব। বাংলাদেশীদের অনেকেই এখন দুবাইয়ে অফিস খুলছে।
গত কয়েক বছরে দুবাইয়ে বড় মাপের ব্যবসা শুরু করেছে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বৃহৎ শিল্প গ্রুপ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এজন্য বাংলাদেশ থেকে বিপুল অংকের অর্থ অবৈধ পন্থায় দুবাইয়ে স্থানান্তর করতে হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ করা নিষিদ্ধ। দুবাইয়ে বিনিয়োগকারী অন্তত দুজন ব্যবসায়ী বণিক বার্তাকে বলেছেন, দুবাইয়ে ব্যবসা স্থাপনের ক্ষেত্রে মাহতাবুর রহমানের সহযোগিতা পেয়েছেন।
মাহতাবুর রহমানের জন্ম সিলেটের বিয়ানীবাজারের চারখাই ইউনিয়নের আদিনাবাদ গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে। তার পিতা আব্দুল হক ছিলেন গ্রাম্য মৌলভি। ছয় ছেলে ও চার মেয়ের জনক আব্দুল হকের পরিবারে ছিল সীমাহীন অভাব-অনটন। অভাবের তাড়না থেকেই সত্তরের দশকের শুরুতে আব্দুল হক সৌদি আরবে পাড়ি জমান। এরপর একে একে ছেলেদেরও সৌদি আরবে নিয়ে যান তিনি। পিতার দ্বিতীয় সন্তান মাহতাবুর রহমান সৌদি আরবে অভিবাসী হন সত্তরের দশকে। এরপর ১৯৮১ সালে দুবাইয়ে স্থানান্তর হন তিনি। সেখানে ট্রেডিং ব্যবসায় যুক্ত হয়ে ক্রমান্বয়ে বাণিজ্যের পরিধি বড় করেছেন মাহতাবুর রহমান। ১৯৯০-পরবর্তী সময়ে আগর গাছের ব্যবসায় যুক্ত হয়ে আল-হারামাইন নামের একটি পারফিউম কোম্পানি গড়ে তোলেন তিনি। দুবাইয়ে এখন মাহতাবুর রহমানের একমাত্র পারফিউমের এ ব্যবসাই সচল আছে।
তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, দুবাইয়ে মাহতাবুর রহমানের কেবল পারফিউমের ব্যবসা দৃশ্যমান হলেও তার অর্থের মূল উৎস ভিন্ন। মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশী অভিবাসী শ্রমিকপ্রধান দেশগুলোতে তার অবৈধ হুন্ডির ব্যবসা রয়েছে। বর্তমানে এ ব্যবসা ইউরোপ-আমেরিকায়ও বিস্তৃত হয়েছে। হুন্ডি ব্যবসার আড়ালে অর্থ পাচারের মধ্যস্থতা করাই মাহতাবুর রহমানের বিত্তবৈভবের প্রধান উৎস।
দুবাইয়ে মাহতাবুর রহমানের পারফিউমের ব্যবসায় অভূত সাফল্য ধরা দিলেও বাংলাদেশে তার বিপরীত হয়েছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের চেয়ারম্যান ও পরিচালক ছিলেন মাহতাবুর রহমান। কিন্তু দেউলিয়া হয়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান পদ ছেড়েছেন তিনি। পাঁচ বছর ধরে মাহতাবুর রহমান এনআরবি ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন। ২০১৩ সালে কার্যক্রম শুরু করা এ ব্যাংকের অবস্থাও বর্তমানে নাজুক। ব্যবসায়িক সাফল্য আনতে ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ও এনআরবি ব্যাংকের অন্য উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বিরোধেও জড়িয়েছেন মাহতাবুর রহমান।
বর্তমানে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের ব্যাংকঋণ, সিভিল এভিয়েশনের পাওনাসহ অন্যান্য দেনার পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। দেউলিয়া হয়ে যাওয়া এ প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে ইসলামী ব্যাংক ও স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার। উচ্চ আদালতে এ নিয়ে মামলা চলছে। এসব মামলায় মাহতাবুর রহমানকেও বিবাদী করা হয়েছে। পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে মাহতাবুর রহমানের ব্যর্থতার কারণেই ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ শেষ হয়ে গেছে বলে এর আগে বণিক বার্তার কাছে ক্যাপ্টেন তাসবিরুল আহমেদ চৌধুরী অভিযোগ করেছিলেন। ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের পর্ষদ ভেঙে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দেয়। নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয় কাজী ওয়াহিদুল আলমকে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, পরিচালন ব্যর্থতার কারণেই ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চেয়ারম্যান হিসেবে আমি প্রতিষ্ঠানটিকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করব, যাতে পুঁজিবাজারের ১ লাখ ৬০ হাজার বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত না হন।
২০১২ সালে লাইসেন্স পাওয়া নয়টি ব্যাংকের অন্যতম এনআরবি ব্যাংক লিমিটেড। ব্যাংকটির ৪৬ জন প্রবাসী উদ্যোক্তার একজন হলেন মাহতাবুর রহমান। এনআরবি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী ব্যবসায়ী ইকবাল আহমেদ (ওবিই)। ২০১৬ সালে এ ব্যাংকের দ্বিতীয় চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন মাহতাবুর রহমান। এর পর থেকে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদ ধরে রেখেছেন তিনি। যদিও চেয়ারম্যান পদ ধরে রাখা নিয়ে বিরোধ তুঙ্গে উঠেছে এনআরবি ব্যাংক পর্ষদের। পরিচালকদের বিরোধ আদালত পর্যন্তও গড়িয়েছে।
চেয়ারম্যান মাহতাবুর রহমানের বিরুদ্ধে গত বছর ব্যাংকটিরই সাত উদ্যোক্তা পরিচালক লিখিতভাবে গভর্নর ফজলে কবিরের কাছে অভিযোগ জানান। ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইকবাল আহমেদ, নির্বাহী কমিটির (ইসি) চেয়ারম্যান এম বদিউজ্জামান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান ড. নাসের আহমেদ চৌধুরী, ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান কামাল আহমেদ, অডিট কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান নাভেদ রশিদ খান অভিযোগকারীদের মধ্যে ছিলেন। ১১ দফা অভিযোগ তুলে এ পরিচালকরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। লিখিত আবেদনে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৫ ও ৪৯ ধারা অনুযায়ী এনআরবি ব্যাংকে হস্তক্ষেপের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অনুরোধ করা হয়েছিল। এ দুটি ধারায় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে পুনর্গঠন, অনিয়ম উদ্ঘাটনে বিশেষ পরিদর্শন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি হিসেবে পর্যবেক্ষক নিয়োগের বিধান রয়েছে।
গভর্নরের কাছে অভিযোগকারী পরিচালকরা বণিক বার্তাকে বলেছেন, মাহতাবুর রহমান এনআরবি ব্যাংককে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে নিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে অন্য উদ্যোক্তাদের হটিয়ে ব্যাংকটিতে নিজের পরিবারের কর্তৃত্ব স্থাপন করেছেন। স্ত্রী, সন্তান, ভাই, ভাতিজা, ভাতিজার স্ত্রীসহ মাহতাবুর রহমান তার পরিবারের সদস্যদের নামে ব্যাংকের অন্তত ২০ শতাংশ শেয়ার নিয়ে নিয়েছেন। বর্তমানে এনআরবি ব্যাংকের পর্ষদে তার পরিবারের পাঁচ সদস্য পরিচালক হিসেবে আছেন। অথচ ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠালগ্নে কেবল মাহতাবুর রহমান উদ্যোক্তা ছিলেন।










