নতুন সরকারের এক মাসের কর্মকাণ্ড তুলে ধরতে গতকাল সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিকের করা প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
এক-এগারোর সময়ের আলোচিত সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীরকে মঙ্গলবার শুনানি শেষে হাজতখানায় নেয়া হয়। এ সময় তার ওপর ময়লা পানি নিক্ষেপ করে উত্তেজিত জনতা। এ ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক জানতে চান, ‘মবকে’ প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে কিনা। জবাবে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মব সম্পর্কে আমাদের সরকার, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য খুবই আলোচিত। সবাই আপনারা জানেন, আমাদের পজিশনটা কী। তবে আমাদের পক্ষ থেকে সবার মাথায় রাখতে হবে, আমরা যখন একটি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব নিয়েছি, তখন দীর্ঘদিনের একটা বেআইনি প্রেক্ষাপটের ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের দায়িত্বটা পালন করতে হচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আশা করছি, দীর্ঘদিনের যে জঞ্জাল, দীর্ঘদিনের যে অপসংস্কৃতি আমাদের মাথার মধ্যে কাজ করছে, সেখান থেকে আমরা খুব দ্রুতই আইনের জায়গায় চলে আসতে পারব। আমাদের সরকার মব সংস্কৃতিকে দমন করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ’।
সংবাদ সম্মেলনে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান ও তথ্য ও সম্প্রচার সচিব মাহবুবা ফারজানা উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জানান, জুলাই যোদ্ধাদের সর্বসম্মতভাবে দায়মুক্তি দেয়া হবে জানিয়ে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, আগামী সংসদ অধিবেশনে এ-সংক্রান্ত আইন পাস হবে।
ফ্যামিলি কার্ডসহ বর্তমান সরকারের এক মাসে নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে তথ্যমন্ত্রী জানান, সবশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী দেশে ৪ কোটি ১০ লাখ পরিবার রয়েছে। প্রতিটি পরিবারের প্রধান নারী সদস্যকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে পাইলট প্রকল্পের আওতায় ৩৭ হাজারেরও বেশি পরিবারের মধ্যে এ কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। এসব পরিবার প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ অর্থ সহায়তা পাবে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব পরিবারকে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।
ধর্মীয় সেবকদের কল্যাণে গৃহীত পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘ইমাম, মুয়াজ্জিন ও অন্য ধর্মীয় সেবকদের জন্য সম্মানী ভাতা চালু করা হয়েছে। এরই মধ্যে ৪ হাজার ৯০৮ ইমাম, ৯৯০ জন পুরোহিত, ১৪৪ জন বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ ও ৩৯৬ জন গির্জার যাজক এ ভাতার আওতায় এসেছেন। আগামী চার অর্থবছরে দেশের সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।’
তথ্যমন্ত্রী আরো বলেন, ‘ঈদ উপলক্ষে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে শাড়ি, থ্রি-পিস, লুঙ্গি ও নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি যাকাত ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’
কৃষি খাতের অগ্রগতি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘সরকার এরই মধ্যে ‘কৃষক কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী পহেলা বৈশাখ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে আট বিভাগের ১১ উপজেলায় ২১ হাজার ১৪ কৃষকের মধ্যে এ কার্ড বিতরণ করা হবে।’
তিনি আরো জানান, সরকার সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে এরই মধ্যে ৫৪টি জেলায় কাজ শুরু হয়েছে। প্রথম ১৮০ দিনের মধ্যে ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারের মিতব্যয়িতা ও ভিআইপি সংস্কৃতি ত্যাগের উদাহরণ দিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সংসদ সদস্যরা ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি ও প্লট সুবিধা না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সঙ্গে ভিআইপি প্রটোকল কমানোর পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ে মিতব্যয়িতা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’
জ্বালানি পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক পরিস্থিতির চাপ থাকলেও সরকার এখন পর্যন্ত জ্বালানির দাম বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।’ গুজব রোধ ও ‘প্যানিক বায়িং’ থেকে বিরত থাকতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
শ্রমিক অসন্তোষ রোধে সরকারের পদক্ষেপের কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘ঈদের আগে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও বোনাস পরিশোধ নিশ্চিতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ফলে শিল্পাঞ্চলে কোনো অস্থিরতা সৃষ্টি হয়নি।’
স্বাস্থ্য খাতের অগ্রগতি তুলে ধরে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ই-হেলথ কার্ড চালু ও এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যার ৮০ শতাংশই হবে নারী। এছাড়াও ডেঙ্গু প্রতিরোধে আগাম ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’
আইন-শৃঙ্খলা ও সামাজিক নিরাপত্তা বিষয়ে মন্ত্রী জানান, চাঁদাবাজি দমন ও নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। নারী যাত্রীদের যাতায়াত সহজ করতে ‘পিঙ্ক বাস’ চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ‘খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রাথমিক স্তর থেকে ক্রীড়া শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং প্রতিটি উপজেলায় ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।’
এছাড়া ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ঋণ মওকুফ, প্রবাসী কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন প্রণয়ন এবং বিমানবন্দরে ফ্রি ওয়াইফাই চালুর বিষয়ে সরকারের উদ্যোগের কথাও ব্রিফিংয়ে উল্লেখ করেন জহির উদ্দিন স্বপন।
তথ্যমন্ত্রী আরো বলেন, ‘সরকার ল্যাংগুয়েজ স্টুডেন্ট ভিসায় জাপানে গমনেচ্ছুদের জন্য প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদানের শর্তাদি শিথিল করেছে।’
তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যাংক সলভেন্সি বা আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে।
তথ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকার দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিতে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। জনগণের সক্রিয় সহযোগিতায় এসব উদ্যোগ সফল হবে।’










