২০১৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টা। গাজীপুর জেলার শ্রীপুর থানার বাসিন্দা হাফেজ মো. শহিদুল্লাহ দেড় লাখ টাকা ট্রান্সফার করেন ঢাকার গেন্ডারিয়ার বাসিন্দা আলহাজ মো. আবুল হাসনাত মাসুমের অ্যাকাউন্টে। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মাওনা শাখায় এ টাকা লেনদেন হয়। এরপর ৮ মার্চ ৫০ হাজার, ১৮ মার্চ আরো ৫০ হাজার, ৩০ মার্চ ৯০ হাজার, ৬ এপ্রিল ১ লাখ, ৫ জুলাই ৪ লাখ—এভাবে ১৬ কিস্তিতে মোট ২৪ লাখ টাকা ট্রান্সফার হয় মাসুমের অ্যাকাউন্টে।
আটজন হাজিকে হজে পাঠানো হবে—এ শর্তে মাসুমকে টাকা দেন শহিদুল্লাহ। পরে টাকা নেয়ার কথা অস্বীকার করলে মাসুমকে আসামি করে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন শহিদুল্লাহ।
নরসিংদীর রায়পুরা থানার বাসিন্দা মো. আলফাজ উদ্দিন ২০১৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৫ সালের মে মাস পর্যন্ত সৌদিতে শ্রমিক পাঠানোর জন্য বিভিন্ন কিস্তিতে মোট ৪৫ লাখ টাকা দেন অভিযুক্ত মাসুমকে। পরে টাকা দিতে অস্বীকার করলে ২০২০ সালের মার্চে কলাবাগান থানায় অভিযুক্তকে আসামি করে মামলা করেন ভুক্তভোগী।
জানা গেছে, ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত হজ ও বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর নামে প্রায় ১০০ ভুক্তভোগীর কাছ থেকে অন্তত ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন মাসুম। ভুক্তভোগীদের অনেকেই সৌদি প্রবাসী। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও চকবাজার থানায় দায়ের করা একাধিক মামলার রায়ে অভিযুক্ত মাসুমকে অপরাধী সাব্যস্ত করে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা, সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশের পরও আইনের আওতায় আসেনি আসামি।
এক ভুক্তভোগী জানান, যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের করা একটি মামলায় আসামির সম্পত্তি ক্রোকসহ গ্রেফতারের নির্দেশ দেন আদালত। রায়ের কপি নিয়ে দীর্ঘদিন থানায় ঘোরাঘুরির পর ২০২০ সালের জানুয়ারিতে পুলিশের একটি দলের নেতৃত্বে মাসুমের ধানমন্ডির বাসায় রেইড দেয়। সেদিন মাসুম বাসায় থাকা সত্ত্বেও রহস্যহজনক কারণে সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে গ্রেফতার না করেই চলে আসে পুলিশ। এছাড়া চকবাজার, কলাবাগানসহ রাজধানীর অন্তত ১০টি থানায় মাসুমের নামে ভুক্তভোগীরা মামলা করেন। অনেক মামলায় সাজা ও গ্রেফতারের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও এখনো গ্রেফতার হয়নি আসামি।
ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, প্রতারক এম হাসনাত মাসুম মার্ক এয়ার ট্রাভেলসের মাধ্যমে হাজি ও বিদেশে শ্রমিক নেয়ার কথা বলে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেয়। এক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতা করেছে মার্ক এয়ার ট্রাভেলসের আরেক স্বত্বাধিকারী মোস্তাফিজুর রহমান। ভুক্তভোগীরা বলেন, অর্থ আত্মসাতের পর মাসুম লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার পর মার্ক এয়ার ট্রাভেলসের দ্বিতীয় মালিক মোস্তাফিজের কাছে গেলে তিনি এর দায় নিতে অস্বীকার করে বলেন, মাসুম ট্রাভেলসের লাইসেন্স বিক্রি করে চলে গেছে।
ভুক্তভোগীদের করা এজাহার সূত্রে এবং তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, মাসুমের প্রতারণার জাল সৌদি আরবের বাংলাদেশী প্রবাসীদের মধ্যেও বিস্তৃত। হজ উপলক্ষে সৌদি আরব গিয়ে বাংলাদেশী প্রবাসীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন মাসুম। একপর্যায়ে ব্যবসার প্রস্তাব দেন। ব্যবসার জন্য স্ট্যাম্পে চুক্তিও করেন। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী টাকা দেয়ার পর সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেন তিনি।
দুজন সৌদি প্রবাসী বণিক বার্তাকে জানান, ব্যবসার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কিস্তিতে মাসুম ৫ কোটি টাকা নেন তাদের কাছ থেকে। দীর্ঘদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর মাসুমের সঙ্গে কথা বললে লেনদেনের বিষয়টি অস্বীকার করেন। হুমকি দিয়ে মাসুম আরো বলেন, এসব বিষয় নিয়ে যদি কোনো বাড়াবাড়ি করা হয় তাহলে দেশে তো আসতেই পারবে না, সৌদি আরবেই জানে মেরে ফেলা হবে।
হজ ও শ্রমিক পাঠানো ছাড়াও ব্যবসার নাম করে শতকোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আছে মাসুমের বিরুদ্ধে। ব্যবসায়িক প্রতারণার জন্য এমএম ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ও ইউনিকর্ন আইটি লিমিটেডের নাম ও লাইসেন্স ব্যবহার করেন অভিযুক্ত মাসুম।
হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশসন অব বাংলাদেশের (হাব) সভাপতি এম শাহাদাত হোসাইন তসলিম এ নিয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, কোনো এজেন্সি হাজিদের সঙ্গে প্রতারণা করলে ও সে অভিযোগ যদি ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে থাকে তাহলে ওই এজেন্সি মালিকানা বদলাতে পারবে না।
সার্বিক বিষয়ে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান বণিক বার্তাকে বলেন, ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ করলে আমরা তদন্তসাপেক্ষে অভিযুক্ত এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। লিখিত অভিযোগ ছাড়া আমরা কোনো কিছু করতে পারব না।










