পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী দেশে নদ-নদীর সংখ্যা এখন ১ হাজার ২৯৪। এর আগে গত ডিসেম্বরে জেলা প্রশাসকদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে সারা দেশের নদ-নদীর একটি খসড়া তালিকা করেছিল সরকার। তাতে ১ হাজার ১৫৬টির কথা জানানো হয়েছিল। সে হিসাবে গত তিন মাস গভীর অনুসন্ধানের পর নদীর সংখ্যা বেড়েছে ১৩৮টি। যদিও নদী নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা বিশেষজ্ঞদের দাবি, দেশে নদ-নদী রয়েছে দুই হাজারেরও বেশি। সরকারি হিসাবে সুন্দরবন, বরেন্দ্র অঞ্চল, পার্বত্য তিন জেলার নদীর তালিকা যুক্ত হয়নি। ফলে বিদ্যমান খসড়া তালিকায় বাদ পড়েছে পাঁচ শতাধিক নদ-নদী।

নদীমাতৃক বাংলাদেশ। জালের মতো ছড়িয়ে আছে অসংখ্য নদ-নদী। অবশ্য গত কয়েক দশকে ভুল নগরায়ন আর অবকাঠামোর চাপে অনেক নদীই হারিয়ে গেছে মানচিত্র থেকে। আবার বেশকিছু বেদখলও হয়েছে।

দেশের নদ-নদীর সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক চলছে বছরের পর বছর। নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের গণনার সঙ্গে মেলে না জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের (এনআরসিসি) হিসাব। আবার এ দুই সংস্থার সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সংখ্যারও ছিল গরমিল। অবশেষে নদ-নদীর তালিকা তৈরিতে সব সংস্থা একজোট হয়। সবার সমন্বয়ে তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গত বৃহস্পতিবার ১ হাজার ২৯৪টি নদ-নদীর খসড়া তালিকা প্রকাশ করে সরকার। সে তালিকায় কোনো সংযোজন-বিয়োজনের প্রয়োজন আছে কিনা এ বিষয়ে নদী বিশেষজ্ঞসহ দেশের সব মানুষকে মতামতের আহ্বান জানানো হয়েছে। এরপর আগামী ১৪ এপ্রিল প্রকাশ করা হবে চূড়ান্ত তালিকা।

বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, নদ-নদীর সংখ্যা নির্ণয়ে সরকার বেশ তাড়াহুড়ো করছে। এতে অনেক নদীই হিসাবের বাইরে থেকে যাবে, যার সুযোগ নেবে দখলদাররা।

নদী ও প্রকৃতি গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী নদ-নদীর সংখ্যা চূড়ান্ত করার কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রাজশাহীর ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘‌হেরিটেজ রাজশাহী’র এ সভাপতি বলেন, ‘জেলা প্রশাসন কিংবা সরকারের যারা নদীর সংখ্যা নির্ণয়ের কাজ করছেন তাদের অনেকে নদীর সংজ্ঞাই জানেন না। আমাদের রাজশাহীতে এমন অনেক নদী আছে যেগুলো নদীর চেয়ে ছোট, খালের চেয়ে বড়। এগুলোকে আঞ্চলিক ভাষায় খাড়ি বলা হয়। যেহেতু প্রবহমান থাকে তাই এগুলোকে নদীর তালিকায় রাখতে হবে। কিন্তু প্রশাসন সেটা রাখতে চাচ্ছে না। বরেন্দ্র অঞ্চলের এ রকম ৫০টি খাড়ি বাদ পড়েছে নদীর তালিকা থেকে। একইভাবে কিছু নদী আছে, বছরের বেশির ভাগ সময় প্রবাহ বন্ধ থাকে। সেগুলোও তালিকায় রাখতে ইচ্ছুক না জেলা প্রশাসনসংশ্লিষ্টরা। এ রকম নদীর সংখ্যা হবে আরো দুইশর মতো। সুন্দরবনের ভেতরে প্রবাহিত ২২৭টি নদীর নাম সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যুক্ত করেননি। এর কারণ হিসেবে তারা জানিয়েছেন, এত গভীর বনে এতসংখ্যক নদী সরজমিনে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। তাই তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে না। একইভাবে পার্বত্য তিন জেলার অন্তত ২০০ প্রবাহিত নদীর নামও বাদ পড়েছে।’

বাংলাদেশে প্রবহমান নদীর সংখ্যা দুই-আড়াই হাজার ছাড়িয়ে যাবে উল্লেখ করে মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ‘আমি ৩০ বছর ধরে নদী নিয়ে কাজ করছি। অনুসন্ধানে আমরা দেশে ১ হাজার ৯০৮টি নদ-নদী পেয়েছি। পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনটি জেলা আছে। সেগুলোর নদীর সংখ্যা নিয়ে এখনো সঠিকভাবে জরিপ হয়নি। এ তিন জেলার তালিকা পেলে তা দুই হাজার ছাড়িয়ে যাবে।’

নদীর সংখ্যা নির্ধারণে সরকার বেশ তাড়াহুড়ো করছে উল্লেখ করে এ গবেষক বলেন, ‘‌নদীর প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করতে হলে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। এত অল্প সময়ে নদীর সংখ্যা ঘোষণা করে এ সরকার মূলত বাহবা কুড়াতে চায়। কিন্তু এতে বাহবার বদলে চরম দুর্নাম হবে, আর এটা তারা বুঝতে পারছে না।’

দেশে নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণে ২০১৯ সালে তালিকা প্রণয়ন শুরু করেছিল নদী রক্ষা কমিশন। প্রায় চার বছর কাজ শেষে ২০২৩ সালের আগস্টে সংস্থাটির ওয়েবসাইটে ৯০৭টি নদ-নদীর খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হয়। সে সময়ই নদী গবেষকরা এ নিয়ে আপত্তি জানান। সরকারি-বেসরকারি অন্যান্য সংস্থার প্রকাশিত নদ-নদীর তথ্যের সঙ্গেও এনআরসিসির খসড়া তথ্যের মিল ছিল না বলে দাবি ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নদ-নদীর তালিকার ওপর মতামত ও আপত্তি আহ্বান করে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও দেয় কমিশন। ওইসব মতামত ও আপত্তি নিষ্পত্তি করে ১ হাজার ৮টি নদীর তালিকা প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু তা নিয়েও আপত্তি ওঠে বিশেষজ্ঞ মহলে। তবে এসব আপত্তির মুখেই এনআরসিসি সেই তালিকা চূড়ান্ত করে।

জেলা প্রশাসকরা ইচ্ছা করেই অনেক নদীর নাম তালিকায় যুক্ত করছেন না বলে অভিযোগ নদী গবেষক ও সংগঠক তুহিন ওয়াদুদের। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে (গতকাল বিকাল) আমি রংপুর থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে একটি নদীর পাশে দাঁড়িয়ে আছি। নদীর নাম শালিমার। একটি কবিতায় আমি এ নদীর খোঁজ পাই। এসে দেখি এর তিন ভাগই জেলা প্রশাসক লিজ দিয়ে মানুষকে মালিক বানিয়ে দিয়েছে। এখন সরকারি হিসেবে এটিকে খাল দেখানো হচ্ছে। আমি বলেছি এটা নদীর তালিকায় যুক্ত করার জন্য। কিন্তু জেলা প্রশাসন থেকে বলা হচ্ছে, মানুষ তো এটার মালিক হয়ে গেছে। এটা এখন কীভাবে নদীর তালিকায় রাখ যায়? আসলে মানচিত্র কেউ বদলাতে পারবে না। তাতে সব নদীর অবস্থান পরিষ্কার বলে দেয়া আছে। কিন্তু যারা নদীর সংখ্যা নিয়ে কাজ করছেন তারা সরজমিনে কাজ করতে আগ্রহী না। আমার রংপুরে এখন নদীর সংখ্যা তিনশর বেশি। সরকারি তালিকায় এসেছে ২৭৮টি। বাকিগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।’

নদী গবেষকরা বছলছেন, সরকার নদীর তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকদের ওপর ভরসা করছে বেশি। কিন্তু জেলা প্রশসকরা ইচ্ছা করে নদীর সংখ্যা কম দেখান। কেননা নদীর সংখ্যা বাড়লে এগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও বাড়বে। কোথাও আবার লিজ দিয়ে তা মেরে ফেলা হয়েছে।

সঠিক তালিকা তৈরি না হলে নদী ব্যবস্থাপনা কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেছেন রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌এমনিতেই বেশির ভাগ নদী দখল-দূষণে মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। কতগুলো পরিণত হয়েছে ভাগাড়ে। আর কতগুলো যে পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। এখন দখল-দূষণে থাকা নদীগুলো পুনরুদ্ধার করতে হলেও প্রকৃত সংখ্যা জানা প্রয়োজন। এজন্য সরজমিনে নদীর উৎপত্তি ও পতিতস্থল দেখা দরকার। সেই সঙ্গে নদীর গতিপথ নিরূপণ করতে হবে। এতে নদীগুলোর নাব্য সংকটের স্বরূপ জানাও সহজ হবে।’

একসময় অনেক জেলায় যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ। কিন্তু নাব্য সংকটে সে পথের অনেকগুলোই চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। নদীর সংখ্যা জানলে বন্ধ হয়ে যাওয়া জলপথে পানিপ্রবাহ ফেরানোর উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হতে পারে বলেও জানান গবেষকরা।

নদীর সংখ্যা নিরূপণে এবারই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতির অনুসরণ করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব নাজমুল আহসান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌আমরা জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশারদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জেলায় যারা নদী কর্মী তাদেরও যুক্ত করেছি। তাদের সুপারিশেরে ভিত্তিতে নদীর সংখ্যা নিরূপণ করা হচ্ছে। এখন ওয়েবসাইটে যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, সেটি খসড়া। কারো কোনো মতামত থাকলে যাচাই-বাছাই করে সেটিও অন্তর্ভুক্ত করতে পারব। তাছাড়া নদীর তালিকা একটা চলমান প্রক্রিয়া। পরবর্তী সময়েও নদীর নাম ও তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ থাকবে।’